মানুষ কেন সিরিয়াল কিলার হয়?

৪২৪ পঠিত ... ১৭:৪৯, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

সম্প্রতি সাভারে একজন সিরিয়াল কিলার ধরা পড়েছে, যে ভবঘুরের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াত। গত ৭ মাসে সে ছয়টি খুন করেছে আর এটা সে স্বীকারও করেছে। স্বভাবতই এগুলো শুনে আমরা শিউরে উঠছি আর ভাবছি সে এটি কীভাবে করেছে? সাথে সাথে উঠে আসছে সেই প্রশ্নটি—মানুষ কেন সিরিয়াল কিলার হয়?

সিরিয়াল কিলিং কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সিরিয়াল কিলিং নিয়ে সারাবিশ্বের নামকরা মনোবিজ্ঞানী, ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্টরা বছরের পর বছর গবেষণা করে যাচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত এই গবেষণাগুলো সম্পন্ন হয়নি। মানুষের মন সবচেয়ে বিচিত্র বিষয়, তাই এর তল খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবুও নানা গবেষণায় সিরিয়াল কিলারদের মাঝে কিছু ‘কমন প্যাটার্ন’ দেখা যায়।

১৯৮০-এর দশকে কার্যকরী মস্তিষ্ক স্ক্যানিংয়ের আবিষ্কার আমাদের মাথার ভেতরে কী চলছে তা বোঝার ক্ষেত্রে বিপ্লব এনে দেয়। খুনিদের উপর প্রথম স্ক্যানিং গবেষণাটি ক্যালিফোর্নিয়ায় ব্রিটিশ স্নায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান রেইন ও তার দল করেছিলেন। বহু বছর ধরে রাইন এবং তার দল অসংখ্য খুনির মস্তিষ্ক স্ক্যান করেছে এবং প্রায় সকলের মস্তিষ্কের একই রকম পরিবর্তন দেখা গেছে। মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারীতা হ্রাস পেয়েছে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং অ্যামিগডালার অতিরিক্ত সক্রিয়তা, যা আমাদের আবেগ তৈরি করে। ফলে খুনিদের এমন মস্তিষ্ক থাকে যা তাদের রাগ এবং ক্রোধ বাড়িয়ে দেয়, একই সাথে তাদের নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষমতা কমে যায়।

এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে কি সিরিয়াল কিলার জন্মই হয় এভাবে? আসলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই যে সিরিয়াল কিলার তৈরী করবে সবসময় এমন নয়। রেইনের গবেষণায় দেখা গেছে যে এর একটি কারণ শৈশবের নির্যাতন, প্রতিবন্ধক পরিবেশ, পারিবারিক ঝামেলা ইত্যাদি হতে পারে যার ফলে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে। ফলে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়ে সিরিয়াল কিলার সৃষ্টি করতে পারে।

তাহলে প্রশ্ন আসে শৈশবে নির্যাতিত সবাই কী সিরিয়াল কিলার হয়? উত্তর হচ্ছে, না। ৫-১০% এর মাঝে সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠতে দেখা যায়। ১৯৯৩ সালে নেদারল্যান্ডসের একটি পরিবারের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, তাদের প্রায় সব পুরুষ সদস্যের মধ্যেই সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। দীর্ঘ গবেষণায় জানা যায়, সবার মধ্যেই MAOA জিনের অভাব বা কম কার্যকরী ছিল। এই জিনটি আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী নিউরোট্রান্সমিটার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। MAOA কম সক্রিয় হলে সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়ে, এজন্য একে ‘যোদ্ধা জিন’ বলা হয়। যদিও প্রায় ৩০% পুরুষের মধ্যে এই জিন পাওয়া যায়, তবে এটি সক্রিয় হবে কিনা তা নির্ভর করে শৈশবের অভিজ্ঞতার ওপর।

শুধু শৈশবে নির্যাতন বা পরিবেশ যে সিরিয়াল কিলিং ট্রিগার করবে তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে কোনো কারণে সামাজিক বাধ্যবাধকতার জন্যও সিরিয়াল কিলিং-এর ঘটনা ঘটতে পারে। এর প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায় বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমকামী সিরিয়াল কিলিং কেসগুলোর ক্ষেত্রে। যখন সমকামীতা অপরাধ হিসেবে আইন ছিল সেসময় বেশ কিছু হাই প্রোফাইল সমকামী সিরিয়াল কিলিং এর কেস দেখা গিয়েছে। অর্থ্যাৎ একটি অপরাধ ঢাকতেও অনেক সময় সিরিয়াল কিলিং হয়ে থাকে।

একজন সাইকোপ্যাথের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সহানুভূতির অভাব। অন্যগুলো হলো মিথ্যা বলার প্রবণতা, রোমাঞ্চের প্রয়োজনীয়তা, খুব দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়া এবং আত্মকেন্দ্রিকতা। কিন্তু সহানুভূতির অভাব হল সবচেয়ে বড় সমস্যা। তারা মনে করে তারা যা করেছে সেটি ঠিক। ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। সাধারণভাবে বলা যায়, সাইকোপ্যাথরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শৈশব, কৈশোরে গভীর মানসিক আঘাতের মুখোমুখি হয়। এর ফলে তারা আবেগ চাপ্পিয়ে রাখতে শেখে। ফলে স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া ও সহানুভূতি গড়ে ওঠে না। তারা প্রকৃত অনুভূতি না বুঝেই বড় হয়। আর সমাজে মানিয়ে নিতে আবেগের অভিনয় করতে শেখে। অনেকটা ‘মুখোশ’ পরে থাকার মতো।

চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, প্রতি পাঁচ থেকে ছয়জন সিরিয়াল কিলারের মধ্যে একজন নারী। তাদের মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পুরুষ সিরিয়াল কিলারদের থেকে আলাদা। মহিলা সিরিয়াল কিলারদের মাঝে মৃতদেহ রেখে যাওয়ার প্রবণতা কম থাকে। কম প্রমাণ রেখে হত্যাকাণ্ড চালানোর কারণে নারী সিরিয়াল কিলারদের শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন। তারা সাধারণত নীরবে কাজ করে এবং অনেক বেশি সময় ধরে এই হত্যাকাণ্ড চালাতে পারে।

এই গবেষণাগুলো আমাদের পুরোপুরি জানায় না কেন মানুষ সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠে, তবে তাদের প্রাথমিক লক্ষণগুলো বুঝতে সাহায্য করে। তাই একটু খেয়াল করলেই অনেক ক্ষেত্রেই আগেভাগে সতর্ক হওয়া সম্ভব।

তথ্যসূত্র: BBC, The Guardian, phychologytoday

৪২৪ পঠিত ... ১৭:৪৯, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top