জি, আমি নিজের জীবন বাঁচাতে এই সেমিস্টারে একাডেমিক প্রতারণা করব

৩৪৩ পঠিত ... ১৩:১৭, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

লেখা: বাতেন মোহাম্মদ

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সেন্সেটিভ দুইটা বিষয় পড়াই—নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান।

অবধারিতভাবেই আমার পড়ানোর টপিকের মাঝে আছে রিলিজিয়ন অ্যান্ড কালচার;  লিমিনালটি, স্পিরিচুয়ালিটি অ্যান্ড বিলিফ; জেন্ডার, সেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস; এথনিসিটি অ্যান্ড রেইস, হিউম্যান এভুল্যুশন অ্যান্ড বায়োলজিকাল অ্যান্থ্রোপলজি; ফ্যামিলি, কিনশিপ অ্যান্ড এভুল্যুশন অব পারসোনাল রিলেশনশিপ।

এই টপিকগুলোতে কী কী বিষয় আসতে পারে সেটা আপনারা অনুমান করতে পারেন। যথেষ্ঠ পরিমাণ ইনকুইসিটিভ মাইন্ডসেট, ইনস্টিটিউশনাল কালচার ও প্রটেকশন অব রাইটস অব একাডেমিক ফ্রিডম না থাকলে এইসব টপিকের কন্টেম্পোরারি নলেজের ৯০% অংশই আপনি পড়াতে পারবেন না।

দুইটা ছোট উদাহরণ দেই—আপনি কিম্বার্লি ক্রেনশ, জুডিথ বাটলার, সিমোন দ্য বেভোয়ার না পড়িয়ে কন্টেম্পোরারি একাডেমিক ডিসকাশন অন জেন্ডার অ্যান্ড সেক্সুয়ালিটি পড়াতে পারবেন না। তাহলে সেফেস্ট অপশন হচ্ছে পড়ানো বাদ দেওয়া।

আমি যখন পাওয়ার অ্যান্ড ডিস্কোর্স পড়াব তখন দ্য মোস্ট সাইটেড পার্সন—মিশেল ফ্যুকো। এমনকি আমাদের দেশে একশ্রেণির কাছে সেলিব্রেটেড বুদ্ধিজীবিরাও নিজেদের ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার জন্য হারহামেশাই ফ্যুকোকে পারশিয়ালি রেফার করে। এখন ফ্যুকো ছিলেন একজন গে। শুধু ডিক্লায়ার্ড গে না, সে এলজিবিটিকিউ রাইটসের জন্য একজন অ্যাক্টিভিস্ট ছিল। এখন আমি এক লেকচারে ফ্যুকোকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে পাওয়ারফুল তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবিদের একজন হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেব, আবার নিজের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে সে ‘গে’ হওয়ায় এইধরনের ব্যক্তিদের শয়তান ও কতলের পক্ষে যুক্তি দেব—এরথেকে বড় ভণ্ডামী আর কী হতে পারে? সেফেস্ট অপশন—ফ্যুকো পড়ানো বন্ধ করে দেব, জেন্ডার সেক্স্যুয়ালটি টপিক পড়ানোর দরকার নাই। জাস্ট কয়েকটা ডেফিনেশন উইকিপিডিয়া থেকে পড়ে আসতে বলে নিজের দায়িত্ব সেরে নেব।

জি, আমি এই সেমিস্টারে এই টপিকগুলো পড়াব না। আমার সিলেবাসে এই টপিকগুলো থাকবে কিন্ত ক্লাসরুমে আমি আলোচনা করব ফুল-পাতা-পাখি নিয়ে। আমি বায়োলজিকাল অ্যান্থ্রপলজিতে আলোচনা করব কীভাবে ডারউইনকে চার্চের কাছে ক্ষমা চাইতে হইছে সেই গল্প। কিন্ত থিউরি অব এভুল্যুশন কী সেটা আলোচনা করব না।

আপনি বলতে পারেন, আমি শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করছি। জি করছি, কারণ আমাকে জান বাঁচাতে হবে, রুটি-রুজির উৎস চাকরিটা বাঁচাতে হবে। আমি এইক্ষত্রে স্বার্থপর।  

কারণ সংখ্যাগরিষ্টের অনুভুতিই এখন ‘জ্ঞান’। এখানে জ্ঞান উৎপাদন যুক্তি-তর্ক দিয়ে হয় না, এখানে জ্ঞান ও জ্ঞানী উৎপাদন হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভুতি কী শুনতে চায় সেটা বলতে পারায়।

আমি সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব দিয়ে কী পড়াব সেটার ভ্যালিডেশন আসতে হবে ধর্মশিক্ষার শিক্ষকের কাছ থেকে। আমি এভুল্যুশনে কী পড়াব সেটার অথরিটি থাকবে ফার্সি, দারওয়া,  ইসলামিক স্টাডিজের ডিসিপ্লিন থেকে। এখন আপনি যদি এইসব ভ্যালিডেশন ও অথরিটি মেনে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান পড়াতে পারেন তাহলে ওকে। না পড়াতে পারলে ট্যাগ খাবেন, জব হারাবেন, মবের শিকার হবেন—আর আপনি তো অবশ্যই  ‘বালডা জানেন’ টাইপের শিক্ষক হবেন। এবং আপনি যে ‘বালডা জানেন টাইপের শিক্ষক’ এই ভ্যালিডেশন আসবে সমাজের যে অংশ থেকে তাদের পক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠরা থাকবে। আরেকটা ভালো অপশন হচ্ছে—এই টপিকগুলো পড়ানো বাদ দেওয়া নয়তো সিলেবাসে থাকল কিন্তু পড়াবেন অন্য গল্প। ব্যস আপনি সেইফে থাকলেন।

আমার মতো দুই পয়সার মাস্টারের জন্য চাকরিটা ম্যাটারস। জ্ঞানচর্চার জন্য জীবন দেওয়ার মতো সাহসী আমি না। আমি ব্রুনো না। আমি অতি সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা উপার্জনক্ষম বড় ছেলে। পরিবারের দায়িত্ব, আমার সন্তানদের দায়িত্ব আমার কাঁধে।

এইসব পড়াতে গিয়ে কারও না কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগলে (আমি ১০০% শিওর আঘাত লাগবেই। মাখনের মতো নরম অনুভূতিসম্পন্ন জাতি আমরা তৈরি করেছি দশকের পর দশক ধরে) আমার বিরুদ্ধে মব হবে। রাষ্ট্র আমাকে নিরাপত্তা দেবে না। আমার বিশ্ববিদ্যালয় নিজের ইমেজ বাঁচাতে আমাকে চাকুরীচ্যুত করবে এবং কেউ কেউ মিউ মিউ করে আমার পাশে দাঁড়ালেও সেই ভয়েজ কখনোই অনুভুতিতে আঘাতপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের ভয়েজ থেকে শক্তিশালী হবে না।

জি, আমি নিজের জীবন বাঁচাতে এই সেমিস্টারে একাডেমিক প্রতারণা করব। আমি এইসব টপিক পড়াবো না ঠিকমত। আমি একজন ঘোষিত প্রতারক। দেশে হুট করে এত ঈমানদারের ভীড়ে, মোরাল পুলিশের ভীড়ে আমার মতো দুয়েকজন একাডেমিক প্রতারক ইঁদুরের মতো বেঁচে থাকলে কারও কোনো সমস্যা হবে না। কিন্ত আমার পরিবার, বউ,  বাচ্চা বাবা-মা দুইবেলা ভাত-ডাল খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।

৩৪৩ পঠিত ... ১৩:১৭, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top