এসো ব্যালট ইঞ্জিনিয়ারিং শিখি

২৬৮ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
লেখা: জিয়া হাসান (লেখক ও গবেষক) 
10

ছবি দুইটা খেয়াল করেন।
 
ছবি দুইটি পোস্টাল ব্যালটের।
 
এই ব্যালট পেপারের দুইটি পাতায় কলাম ও সারির সংখ্যা বা কয়পাতা ব্যালটি পেপার হবে সেইটা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যেন দাড়ি পাল্লা ও শাপলা কলি উভয়টি দুই পাতারই একেবারে উপরের সারিতে থাকে।
 
এইটা কোন কাকতালিয় ঘটনা নয়।।
 
এইটা করা হয়েছে বাংলা ভাষায় এ্যাসেন্ডং অর্ডারও বাম থেকে ডানে যাওয়ার কথা সেইটার বদলে উপর থেকে নীচে করার মাধ্যমে ও সুনির্দিষ্ট পাবে কোন পাতায় কত গুলো রো ও কলাম থাকবে ও কত গুলো পেজে কত গুলো প্রতিক থাকবে সেই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
 
এখানে জামাত ও এনসিপিকে দুইটি পাতার উপরের দিকে রাখতে খুবই বহুল আলোচিত একটি প্রবণতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে যাকে বলা হয় ব্যালট অর্ডার ইফেক্ট।
ব্যালট অর্ডার ইফেক্ট বলে যে, ব্যালটের উপরের দিকে যে প্রার্থী বা দলের নাম বা প্রতীক থাকে, তারা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রায় ১% থেকে ১০% পর্যন্ত ভোটের সুবিধা পেতে পারে।
 
২০০৩ সালে ক্রসনিক, মিলার এবং মাইকেল টিচি দেখিয়েছেন যে, ২০০০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যালটে প্রথম স্থানে থাকার কারণে জর্জ ডব্লিউ বুশ শেষ স্থানে থাকলে যত ভোট পেতেন, তার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি ভোট পেয়েছিলেন।
 
জোনাথন কোপেল ও জেনিফার স্টিন নিউইয়র্ক সিটির ১৯৯৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি নির্বাচনে গবেষণা করে দেখান যে, যেখানে বিভিন্ন এলাকায় ব্যালটের বিভিন্ন ক্রম দেওয়া হয়েছে , সেখানে প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে প্রার্থীরা ব্যালটে প্রথম স্থানে থাকলে বেশি ভোট পেয়েছেন। প্রায় ১০% ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ভোটের পরিমাণ বিজয়ীর ব্যবধানের চেয়েও বেশি ছিল।
বাই চয়েস, জামাত ও এনসিপিকে এই সুবিধা দেওয়ার ফলে তারা এই ব্যালট গুলোতে ১% থেকে ১০% এর বেশি সুবিধা পেতে পারে ।
এই ব্যালট অর্ডার ইম্প্যাক্টের পেছনে রয়েছে বিহেভারিয়াল ইকনমিক্স।
 
রিচার্ড থ্যালার ২০১৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান আচরণগত অর্থনীতি নিয়ে কাজের জন্য। তাঁর বিখ্যাত ধারণা হলো নাজ (Nudge)—অর্থাৎ মৃদু ঠেলা দিয়ে কীভাবে সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে নির্দিষ্ট একটি দিকে প্রভাবিত করা যায়।
 
নাজ কীভাবে কাজ করে তার একটি উদাহরণ হলো:
 
আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়—আপনি মৃত্যুর পর চক্ষুদান করতে আগ্রহী কি না—এবং সেখানে লেখা থাকে, “আপনি যদি আগ্রহী না হন, তাহলে নিচের চেকমার্কে টিক দিন”, তাহলে অধিকাংশ মানুষই টিক দেয় না। ফলে, শুধুমাত্র একটি প্রম্পটের মাধ্যমে মানুষকে মনোরোত্তর চক্ষু দানে নাজ করা যায় ।
 
অথবা, আমস্টারডামের পাবলিক টয়লেটে শুধু একটি মাছির ছবি আঁকা থাকার কারণে অধিকাংশ পুরুষ নির্দিষ্ট স্থানে প্রস্রাব করে এবং বাইরে ছিটায় না।
 
কলাম ও রো এর সংখ্যা নিজের মত সাজিয়ে এনসিপি ও জামাতকে দুইটা পেজের প্রথম সারিতে রাখার উদ্দেশ্য ভোটারদের নাজ করা।
 
গত এক বছর ধরে পিনাকী ইলিয়াসরা যে প্রচার চালাচ্ছেন—প্রশাসন নাকি বিএনপিপন্থী হয়ে গেছে—এর একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য আছে। সেটি হলো এই বাস্তবতাকে আড়াল করা যে, বর্তমান প্রশাসন সক্রিয়ভাবে জামাতকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করছে।
 
বিভিন্ন আলোচনায় আমি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছি কেন এই ইনসেন্টিভটি স্ট্রাকচারাল। বিএনপির নিজস্ব একটি বিশাল দলবল রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা নিজেদের লোকজন দিয়েই দেশ চালাবে, ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে বর্তমান প্রশাসনের প্রতিটা রাজাধিরাজকে তাদের পূর্বের জীবনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে যদি জামাত–এনসিপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হবে এবং এই সরকারের প্রতিটা ব্যক্তি আগামী সরকারের শীর্ষ পদ উপহার পাবেন, প্রতিদান হিসেবে ।
 
আমলা তন্ত্রের বিষয়টি একই কিন্তু সেখানে একটু সুক্ষতা রয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিএনপিপন্থি ও জামাতপন্থিদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। সাধারণ মধ্যপন্থি আমলাদের বিএনপিপন্থি বলা হলেও, তাদের বিএনপির প্রতি কোন আদর্শিক অবস্থান নাই। বিএনপির জন্যে তারা এক পা-ও এগোবেন না কিন্তু যারা জামাতপন্থি হিসেবে পরিচিত, তারা জামাতকে ক্ষমতায় আনার জন্য সবকিছু বাজি রাখতে প্রস্তুত।
 
এদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—এরা সাধারণত গুপ্ত থাকে, কিন্তু সংকটময় মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রভাবটি তারাই রাখে।
 
এখানেও ঠিক সেটাই হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রথম যে প্রমাণ আমরা দেখছি, সেখানে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে—নির্লজ্জভাবে নির্বাচন কমিশন জামাত ও এনসিপিকে সুবিধা দিতে ব্যালট পেপার সাজিয়েছে। এর ফলে সুপরিচিত ব্যালট অর্ডার ইফেক্টে শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামের দল ১% থেকে ১০% পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারেন ।
এখন কেউ বলতে পারেন, বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী প্রতীক ছাপালে তো কোনো না কোনো দল সুবিধা পাবেই; এক্ষেত্রে কাকতালীয়ভাবে জামাত ও এনসিপি পেয়েছে। অন্যভাবে করলে বিএনপি পেত—তাহলে কি করার আছে ?
 
এই যুক্তির জবাব ১৯৭৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছে। Gould v. Grubb মামলায় আদালত রায় দেয় যে, যেহেতু ব্যালট অর্ডার প্রার্থীদের তাৎপর্যপূর্ণ সুবিধা দেয়, তাই ব্যালটে দল ও প্রার্থীদের সিরিয়াল বর্ণানুক্রম নয়—দৈবচয়নের মাধ্যমে এলোমেলোভাবে নির্ধারণ করতে হবে (California Election Code §13112(a))।
 
সেই রায়ের ভিত্তিতে, বর্ণমালার ক্রম দৈবচয়ের মাধ্যমে র্যান্ডমাইজড করে প্রতীকের সিরিয়াল সাজানো হয়।
 
আমি একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট । বিএনপি বা জামাত বা এনসিপি সহ —কোনো দলের প্রতিই আমার আনুগত্য নেই। আমি তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও লিখেছি, জামাতে আমিরকেও টিজ করেছি, আসিফের বিরুদ্ধেও লিখেছি।
 
কিন্তু অনেক ইন্ডিপেন্ডেটদের সাথে আমার পার্থক্য হচ্ছে আমি যদি দেখি, সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে জামাতকে ছলে–বলে–কৌশলে ক্ষমতায় আনার একটা প্রকল্প সরকারের বিভিন্ন তরফ থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেইটা দেখে আমি আমার নিরপেক্ষতা চলে যাবার ভয়ে চুপ থাকিনা।
 
কারণ নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় এবং গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার পর রায় মেনে না নেওয়ার কারণে বাংলাদেশ আবার নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় পড়ে, তাহলে এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে ভারত ও হাসিনা। এবং তারপরে বাংলাদেশ আর স্থিতিশীল হতে পারবেনা যেটা আমার প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য।
 
আমি অনুরোধ করছি,
সরকার ও নির্বাচন কমিশন যেন তদন্ত করে দেখে—কোন প্রক্রিয়ায়, কার সিদ্ধান্তে, এইভাবে জামাত ও এনসিপিকে ব্যালট অর্ডার ইফেক্টের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এবং তদন্ত করে এই দায়ী ব্যক্তিদের কমিশন থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পোস্টাল ব্যালটসহ সব ব্যালটে প্রতীক বর্ণানুক্রমে নয়, দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় —যাতে কোনো দল পরিকল্পিতভাবে ১% থেকে ১০% সুবিধা না পায়।
 
এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। বন্দর ইজারা দেওয়া বা গাজায় সৈন্য পাঠানো না।
প্রফেসর ইউনুসকে এখন ব্যালট পেপারে জালিয়াতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে প্রমান করতে হবে তারা নিরপেক্ষতার সাথে নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা ও নিয়ত রাখে।
 
কারন আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে, বাংলাদেশ ধংস হয়ে যাবে।
 
বিঃদ্র; আমি তউকিরের সাথে আলাপের ভিত্তিতে প্রবাবিলিস্টিক আরগুমেন্ট টি ড্রপ করেছি। কিন্তু আমরা দুই জন এক হয়েছি যে, রো কলামের সঙ্খ্যা, কত গুলো পেজ থাকবে এবং এলফাবেটিক অর্ডার উপর থেকে নীচে হবে নাকি বাম থেকে ডানে হবে, তার মধ্যে চয়েজ বিল্ট ইন আছে । এবং এই চয়েজ গুলওর মাধ্যমে যে দুইটা দলকে সামনে রাখা যায়।
এইটা র্যান্ডম নয়।
২৬৮ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top