লেখা: তুহিন খান (অ্যাক্টিভিস্ট, রাজনীতিবিদ ও লেখক)
আমেরিকা যখন আফগানিস্তানের উপর হামলা চালায়, তখন ইউএনের সিক্যুরিটি কাউন্সিলে ISAF (International Security Assistance Force) নামে একটা বহুজাতিক বাহিনীকে আফগানিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব ছিল আফগানিস্তানে তালেবান-বিরোধী সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা করা এবং সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করা। কিন্তু ধীরে ধীরে এই বাহিনী তালেবানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে; ২০১৪ সালে আফগান সিক্যুরিটি ফোর্সের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর এই বাহিনী ডিসব্যান্ড করে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি এরকম আরেকটা বাহিনীর প্রস্তাব ইউএনে পাস করাইছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বাহিনীর নামও কাছাকাছি: ISF (International Stabilization Force)। কাজ কী এই বাহিনীর? গাজাকে ‘ডি-মিলিটারাইজ’ করা এবং ‘সন্ত্রাসবাদী’ অবকাঠামোগুলা ধ্বংস করা, ইসরায়েল ও মিশরের সাথে গাজার সীমান্তবর্তী অঞ্চল সুরক্ষিত করা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, বাছাইকৃত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে ট্রেনিং দেওয়া, গাজার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন ইত্যাদি। এই বাহিনী গাজায় ঢোকার পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী বের হয়ে যাবে, এমন না। বরং ইসরায়েলি বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়ার প্রত্যাশিত মাত্রা অর্জনসাপেক্ষে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে।
এই বাহিনীর কার্যক্রমের ধরন ও পরিধি এখনও অস্পষ্ট। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, মিসর ও ইসরায়েলি সেনাদের নেতৃত্বেই এই বাহিনীর কাজ করা লাগবে। অলরেডি হামাস এই ধরনের বাহিনীকে গাজা পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে। এরকম কোনো বাহিনী গাজায় গেলে, হামাসের সাথে এর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। আফগানিস্তান এর বাস্তব উদাহরণ।
৯/১১-এর সেই অস্থির সময়েও দু-দফায় ন্যাটো-নেতৃত্বাধীন সেই বহুজাতিক বাহিনীতে সৈন্য পাঠাইতে অস্বীকৃতি জানান বেগম খালেদা জিয়া: প্রথমে ২০০২ সালে টনি ব্লেয়ারকে ফিরিয়ে দেন; তারপর ২০০৪ সালে ফিরিয়ে দেন রামসফিল্ডকে। আর এর খেসারতও তারে দিতে হয় চরমভাবে।
কিন্তু আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার এই নয়া ‘ওয়র অন টেরর’ জোটে সেনা পাঠাইতে এত উদগ্রীব কেন? এই সেনা পাঠানোর ব্যাপারটা কি বাঙলাদেশের প্যালেস্টাইন নীতির সাথে যায়? এই ব্যাপারে বাঙলাদেশের সিক্যুরিটি অ্যাডভাইজার কি প্রপার রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করছেন? এটা কি ইভেন এই সরকারের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে?
নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিল সাহেবের কাজটা আশলে কী? মায়ানমার সীমান্তে প্রায়ই বাঙলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খুন করা হচ্ছে বাঙলাদেশিদের। আর বিনিময়ে বাঙলাদেশ থেকে গোপনে আরাকানে যাচ্ছে বিবিধ ত্রাণসামগ্রী। কেন ও কীভাবে হচ্ছে এসব? রোহিঙ্গা পলিসির কী হইল? মানবিক করিডোরেরই বা কী হইল? কিছু যদি না-ই হইল, তাইলে এসব আলাপ কেন উঠল? মায়ানমার সীমান্তে বাঙলাদেশের নিরাপত্তা কি বাড়ছে না কমছে? আর এসবের মধ্যে আবার গাজায় সেনা পাঠানোর আলাপটা ঠিক কেন শুরু করলেন উনি?
যে সরকারের আমলে বাঙলাদেশে ফিলিস্তিন নিয়ে অ্যাক্টিভিজম সবচেয়ে তুঙ্গে, সেই সরকারই এমন একটা উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে—আশ্চর্যজনক না? ‘আধিপত্যবাদ বিরোধিতা’র ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর যে সরকার, তার আমলেই বাঙলাদেশ সরাসরি ইসরায়েলি সেনাদের সাথে কাজ করার ‘সৌভাগ্য’ অর্জন করছে—অদ্ভুত ব্যাপার না?
আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই। রেটোরিকবাজ আর পপুলিস্ট সরকারগুলোর চরিত্র সাধারণত এমনই হয়। দেশকে কোনো একটা পপুলিজমে মত্ত রেখেই তারা নিজেদের কাজগুলা সেরে নেয়। ‘আধিপত্যবাদ বিরোধিতা’ বিক্রি করেই তারা ‘আধিপত্য’ ডাইকা আনে। তাও ভালো যে, এই সরকারের ইউনিফাইড কোনো ক্ষমতাকেন্দ্র বা পলিসি নাই। তারা কোনো রাজনৈতিক শক্তিও না। কয়েকদিন পরই তারা ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। ফলে তাদের দিক থেকে ক্ষতির আশঙ্কা খুবই কম।
কিন্তু ভয়ের বিষয় এই যে, দেশে এমন অনেক রাজনৈতিক শক্তিও আছে, যারা জনগণকে এরকম কোনো একটা পপুলিজমে বা আধিপত্যবাদ বিরোধিতার রেটরিকবাজিতে মত্ত রাইখা দেশ বিক্রি কইরা দিতে পারে যেকোনো সময়। ক্ষমতার জন্য নিজেদের সমস্ত ঘোষিত নীতি এরা বিসর্জন দিতে পারে। পপুলিস্ট রেটরিকবাজি করতে করতে যারা দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে সময় থাকতে সাবধান হওয়া দেশের মানুশের জন্য জরুরি। দেশের সার্বভৌমত্ব সবার উপরে, এইটা কম্প্রোমাইজ হয়ে গেলে হাজারো আর্তনাদ করেও আর লাভ হবে না—এইটা মাথায় রাখবেন।
রেটরিকে মইজেন না। কোনটা রেটরিকাল, অকার্যকর আর সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর আধিপত্যবাদ বিরোধিতা, আর কোনটা রিয়েল, কার্যকর ও সার্বভৌমত্বের জন্য জরুরি আধিপত্যবাদ বিরোধিতা—তা চিনতে শেখা এই মুহূর্তে বাঙলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের আশু কর্তব্য।



পাঠকের মন্তব্য