লেখা: ইরফান শেখ
বিবিসি কালচারের একটা আর্টিকেল পড়লাম। তার মূল বক্তব্য হলো—মধ্যযুগে মানুষ এখনকার মত টানা ৮-৯ ঘণ্টা ঘুমাত না।
সন্ধ্যার পর পর ঘুমিয়ে যেতো। ঘুম ভাঙত রাত ১১টায়। তখন তারা পড়তে বসত, ঘরদোর গুছাত, শুকিয়ে দেওয়া কাপড় ভাঁজ করত, কৃষকরা খড়ের গাদা আলগা করত, ভেড়া ছাগলদের খাবার দিত, ফায়ারপ্লেসের আগুনটা নেড়ে দিত, কেউ কেউ প্রার্থনা করত, প্রদীপগুলো তেল দিয়ে রিফিল করতো ইত্যাদি।
রাত ২টার দিকে আবার বিছানায় গিয়ে, লেপ টেনে ঘুমিয়ে যেত। ৬টার দিকে উঠত।
প্রথম ঘুমটা ছিল মূল ঘুম, পরের ঘুমটাকে বলতো ন্যাপ। বাংলা অনুবাদ করলে 'ভাত ঘুম' টাইপ।
এটা য়ুরোপের গল্প। আমাদের দেশের মধ্যযুগে এমন কিছু হয়েছে কিনা জানি না। আমাদের দেশের ইতিহাস লেখার চল ছিল না। যৎসামান্য যা কিছু জানা যায় বিদেশি লেখক (ইবনে বতুতা, লামা তারানাথ, ফা হিয়েন, রালফ ফিচ, জুয়ান জ্যাং, তবাতবায়ি)-দের লেখায়—সেগুলোও রাজনৈতিক ইতিহাস।
মানে কে কবে সিংহাসনে বসছে, কে কারে মারছে, কে কারে ধরছে—এসবের ইতিহাস। দেশের মানুষ কয়টা বাজে ঘুমাইত আর সকালে কি রুটি খাইত না ভাত খাইত—সেসব নিয়ে তথ্য তেমন একটা পাওয়া যায় না।
অন্তত এ দেশের মানুষের ঘুমের তরিকা নিয়া আমার তেমন একটা লেখা চোখে পড়েনি। মধ্যযুগে কি দুপুরের ভাত ঘুম ছিল কিনা, থাকলে কবে থেকে ছিল—জানার উপায় নেই।
তবে একটা জিনিস নিশ্চিত যে, সন্ধ্যার পর অন্ধকারের জন্য কাজ-কর্ম করার তেমন উপায় ছিল না। এ দেশে তেলের দাম ছিল আকাশচুম্বি। ফলে খুব কম বাসা-বাড়ি প্রদীপ জ্বালানোর লাক্সারি এফোর্ড করতে পারত।
সে হিসেবে সন্ধ্যার কিছু পর ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়ারই কথা। রাত ৩-৪টার দিকে কৃষক, কৃষাণীরা ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগে যেত। যে অভ্যাস এখনও গ্রামের নন-প্রবাসী, নন টেসলা পাইলট কৃষক পরিবারগুলোতে প্রচলিত।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৮৩৩ সালের রেকর্ডস থেকে এটা বোঝা যায় যে, মশারি প্রচলিত ছিল শুধু অবস্থাসম্পন্ন মুসলমান পরিবারগুলোতে। হিন্দুদের মধ্যে মশারির তেমন প্রচলন ছিল না। হিন্দু মুসলিম সবাই পুরানো শাড়ি সেলাই করে কাঁথা বানাতেন। যে অভ্যাসটা এখনও গ্রামে আছে।
বেশিরভাগ মানুষ পাটি বিছিয়ে ঘুমাতেন। খাট-পালঙ্ক ছিল কেবল অবস্থাসম্পন্ন বাড়িগুলোতে।
কিন্তু গরু চড়াতে গিয়ে, দুপুরবেলা মাঠে ভাত খেয়ে রাখাল গাছতলায় শুয়ে একটা ঘুম দিতেন কিনা; অথবা শাশুড়ির রোষ স্কিপ করে কৃষক বউ তার বাচ্চা কাচ্চাদের নিয়ে বিকাল বেলা একটা ঘুম দিতেন কিনা—তা জানা যায় না।
নব্বই এর দশকে ভাত ঘুম ব্যাপারটা খুব প্রচলিত ছিল। এখন ২০২০ এর দশকে সেটা সম্ভব না। কারণ কর্মস্ফীতি ঘটে গেছে। একই লাইফ স্ট্যান্ডার্ড মেইন্টেইন করতে গিয়ে মানুষকে এখন আগের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। দু, তিনটা করে চাকরি, ব্যবসা, ফ্রি ল্যান্সিং, ধান্দাবাজি করতে হয়। কাজের মানুষদের দুই-দুইটা ঘুম দেবার লাক্সারি নেই।
আর অকাজের মানুষদের স্ক্রিন টাইম এমন খারাপ যে, তাদের ঘুমের রুটিন বলতে কিছু নেই। বাংলাদেশের অকাজের মানুষদের সংখ্যাটা নেহাত কম না। আর এই অকাজের মানুষদের বেশিরভাগ হলেন তরুণ নারী (ফেমিনিস্টরা মাফ করুক)। সম্ভবত এ কারণে দেশের তরুণীদের মধ্যে ক্রনিক ডিপ্রেশনের হার তরুণদের চেয়ে বেশি।
তবে স্বাস্থ্যগত বিচারে দুই-দুইটা ঘুম দেওয়ার অভ্যাস খারাপ না। ইন ফ্যাক্ট - আমরা গত এক লাখ বছর দুই-তিনটা করেই ঘুম দিতাম।
শিকার ভিত্তিক সমাজে আমাদের নিরাপদে টানা ৭-৮ ঘন্টা ঘুম দেবার উপায় ছিল না। মানুষকে সতর্ক থাকতে হতো। যাযাবর জীবনে হুট হাট ঘুম থেকে উঠেই প্রাণভয়ে দৌড় দিতে হতো।
আমাদের শরীর তাই টানা ১২ ঘন্টা কাজ করা আর টানা ৮-৯ ঘন্টা ঘুমে অভ্যস্ত না। বরং ৪ ঘন্টা কাজ, ২ ঘন্টা বিশ্রাম, আবার ৩-৪ ঘন্টা কাজ, ২ ঘন্টা হুদাই বইসা থাকা, গল্প করা - ব্রেইন ফাংশনের জন্য বেশি স্বাস্থ্যকর, মনোযোগ রক্ষা করার জন্যও ভালো।
শিল্প বিপ্লবের পর সেটা সম্ভব না। এখন সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেই। এখন সন্ধ্যার পরেই বরং বেশি আলো। সন্ধ্যার পরেই পৃথিবী আরও চঞ্চল।
তাছাড়া ঘুম একটা সামাজিক ব্যাপার। আপনি একা ঘুমাতে পারবেন না। আপনার বাসার সবাই ডিনার করবে ১০ টায়, আপনি একা করতে চাইলেন ৭টায়। ডিনার করে ৮টায় ঘুমাতে চাইলেন, এটা সম্ভব না।
মিটিং, বিয়ে শাদি, মেহমান, অনলাইন চ্যাটিং, আড্ডা, পরিবারকে সময় দেওয়া ইত্যাদি আপনার একার টাইমিং এর উপর নির্ভর করে না। সমাজে মানুষ মূলত একা ঘুমায় না। সে সবাইকে নিয়ে ঘুমায়।
আমি গত কয়েক মাসে বিভিন্ন জেলার মানুষদের সাথে কথা বলে জেনেছি সকল জেলা শহরেই মানুষ গড়পরতা ১২টার পর ঘুমায়। উপজেলা বা গ্রামে ১০টার দিকে ঘুমায়। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ৮-১০টার মধ্যে লোকে ঘুমায়।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ অনুযায়ী শীতের দেশের মানুষ বেশিক্ষণ ঘুমায়। সবচেয়ে কম ঘুমায় আরব অঞ্চল ও ভারতীয় উপমহাদেশের লোকজন। কম ঘুমানোর তালিকায় প্রথম দিকে তিন দেশ হলো সৌদি, জাপান, কোরিয়া। জাপান আর কোরিয়া এখানে ব্যতিক্রম। ওদের পচে যাওয়া ওয়ার্ক লাইফ কালচারের জন্য ওদের কপালে বেশি ঘুম জোটে না। সারাদিন অফিস করতে হয়। অফিস শেষে প্রায় বাধ্যতামূলকভাবে কলিগদের সাথে আড্ডা দিতে হয়। বাসায় ফিরে রান্না করে, ঘরের কাজ করে, আধমরার মত ৪-৫ ঘন্টা ঘুম।
ফলে, ঘুম নিয়ে অভিযোগ করা, ঘুম নিয়ে অসন্তুষ্টিতে ভোগা দেশগুলোর তালিকাতেও জাপান, কোরিয়া চ্যাম্পিয়ন। (বাংলাদেশ থেকে যারা জাপান আর কোরিয়া গিয়ে সেটেল হতে চায়, তাদের প্রতি আমার অসামান্য শ্রদ্ধা কাজ করে। মনে মনে বলি, একদম ঠিক আছে! জাপান যা!)
আরব ও ভারতীয় উপমহাদেশ সবচেয়ে কম ঘুমানো দেশগুলোর তালিকায় উপরে থাকলেও ঘুম নিয়ে অসন্তুষ্টির তালিকায় ভারত আর সৌদি একদম নিচের দিকে। অন্য একটা হিসাব হলো কোন দেশের লোক কখন ঘুমাতে যায়। এটা নিয়ে খুব ভালো জরিপ হয়নি। তবে মোটা দাগে দেখা যায় শীতের দেশ আর সভ্য দেশগুলোর মানুষ দ্রুত ঘুমাতে যায়। সবচেয়ে দেরিতে ঘুমাতে যায় দক্ষিণ এশিয়া আর আফ্রিকার মানুষ।
স্ক্রিনটাইমের সাথে ঘুমাতে যাওয়ার টাইমের সম্পর্ক আছে। ফেসবুক চালানোর ক্ষেত্রে এশিয়া আফ্রিকার মানুষরাই সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে। বাংলাদেশ এই তালিকার প্রথম ১০-এ নেই। কারণ গড়ে এই দেশের মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে কম। কিন্তু শুধু যদি ঢাকার তরুণদের নিয়ে জরিপটা করা হতো, নির্ঘাত বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়ার পর ২য় অবস্থানে থাকত।
ঢাকা আর জাকার্তার চাইতে দেরিতে ঘুমাতে যায় এমন শহর পৃথিবীতে আর নেই। মোটামুটি ২টার আগে কোনো তরুণ-তরুণী ঘুমায় না। এবং যেহেতু ঘুম একটা সামাজিক বিষয়, যেহেতু একা ঘুমানো যায় না, তাই তরুণদের দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, তাদের বেকারত্বও তাদের মব ভায়োলেন্স করার মত ফুরসত থাকার সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় আছে।
যেহেতু দেশের ৯৭% স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ফাংশন করে না, যেহেতু ছেলেমেয়েরা এখন প্রায় কেউই স্কুল, কলেজ অ্যাটেন্ড করে না, কেবল কোচিং এবং টিউটরদের উপর নির্ভর করে—সেই বাস্তবতায় ঢাকার তরুণদের সকালে ওঠা নিয়ে কোন সামাজিক দায় নেই।
পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম দেশ।
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর।
পৃথিবীর সবচেয়ে দেরিতে ঘুমানো প্রজন্ম।
এশিয়াতে সবচেয়ে অকেজো শিক্ষা ব্যবস্থা।
এর প্রভাব জিডিপিতে না পড়ে উপায় আছে?
নেই।
আমি কোন কনক্লুশনে যাচ্ছি না। কী করণীয় সেটা বলা, আলাপ করাও জরুরি না। জাস্ট এটা বোঝা দরকার যে আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? আমি করছি আর আমি কোথায় যাচ্ছি। রাষ্ট্র, সমাজ না বুঝলে অন্তত নিজেকে বুঝলেও চলে।
গত বছর আমি গুলশানের একটা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। অফিস যেতে লাগতো ২ ঘণ্টা। আসতে লাগত দুই ঘণ্টা। নামে ৯টা-৫টা অফিস হলেও, বাস্তবে আর ১০ জন ঢাকাবাসীর মতই আমার অফিস ছিল ৭টা-৮টা। পুরো ১৩ ঘণ্টা ব্যয় হতো অফিস করতে।
সেই অফিস করা যে খুব প্রোডাক্টিভ হতো—তা না। আমি বিধ্বস্ত হয়ে বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে যেতাম। আমার ঘুম ভাঙত ২টায়। আমি কিছু খেয়ে, কাজ করে আবার ৪টায় ঘুমাতাম। য়ুরোপের মধ্যযুগের মানুষ ছিলাম। একা থাকি তাই এমন লাইফস্টাইল সম্ভব ছিল। বউ বাচ্চা থাকলে, অফিসের পর ওরা আমাকে পাশবিক পারিবারিক নির্যাতন করতো। যেটা এই দেশের কোটি কোটি ক্লান্ত নারী-পুরুষের নিয়তি।
বিভিন্ন কারণে পরে আমি আমার নিজের প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসি। আমার অফিসেও ৯টা-৫টা চাকরি শুরু করি, অন্যদের শুরু করাই। কিন্তু আশানুরূপ পারফরম্যান্স পাচ্ছিলাম না। আমি দেখতাম দুপুরে খাবার পর সহকর্মীদের ম্যান্দা মারা অবস্থা। সবারই ঘুম পাচ্ছে। কয়েকজনের ওয়ার্ক ফ্রম হোম শুরু হলো। তাদের যাতায়াত খরচ বাঁচল। তাদের যাতায়াত সময় বাঁচল। অফিসের ইলেক্ট্রিসিটি বিল বাঁচল। অপারেশন কস্ট কমল। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম প্রোডাক্টিভিটি বেড়ে গেল আড়াই গুণ।
এমনকি কর্মীরা ফাঁকিবাজি শুরু করলো। ৯-৫টা তারা ডেস্কে থাকতো না। তারা নিজেদের কাজ করত, বাইরে যেত, রান্না করত, ঘুম দিত। কিন্তু প্রিটেন্ড করত যে তারা ডেস্কে আছে। আমি বুঝতাম। কিন্তু কাজ ঠিকঠাক পাচ্ছি , তাহলে আর বুঝে কী করবো?
আস্তে আস্তে আমাদের অফিস টাইমও ৯-৫টা থাকলো না। আমাদের অফিস টাইম যার যার সুবিধা অনুযায়ী পালটে গেল। যেমন আমি সকালে কাজ করতে পছন্দ করি। আমি সকালে অফিস শুরু করলাম। মন চাইলে বাসায় বসি, মন চাইলে অফিস চলে যাই। আমার কো ওয়ার্কার কারও বিকালে কাজ করা পছন্দ। কেউ বসে দুই-তিন শিফটে। মন চাইলে ল্যাপটপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করার মাঝে অফিস করে। মন চাইলে অফিস চলে আসে, মন চাইলে তার দেশের বাড়ি ফরিদপুর গিয়ে মায়ের হাতে ভাত খেতে খেতে অফিস করে। অর্থাৎ এখন আর অফিসের স্থান, কাল নেই। আছে শুধু কাজ আর প্রায় ৩ গুণ প্রোডাক্টিভিটি।
আমাদের অফিসের গল্পই যেন বিশ্ববিখ্যাত বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বসে পড়লাম। তাদের একটা আর্টিকেল ছিল, Remote Or In-Office Work? The Future Lies In A Better Hybrid Model.
চাইলে গুগল সার্চ দিয়ে পড়তে পারেন।
আপনার অফিসের ম্যানেজমেন্ট আপনার হাতে থাকলে হাইব্রিড মডেল আর ঘুম নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। এটা কিন্তু শুধু আমাদের মত অখ্যাত অফিস করছে তা না। এইচএসবিসি, ভেঞ্চার থ্রি সেভেন্টি ওয়ান, টারাসহ গুলশানের কিছু আন্তর্জাতিক অফিসও এটা শুরু করেছে। অনেকের কাছে তো আবার গুলশান হলো তীর্থস্থান। গুলশানের সাদা চামড়ারা ট্রেন্ড শুরু না করলে, দেশি অফিসগুলো নিজেরা কোনো ট্রেন্ড শুরু করার সৎ সাহস পায় না।



পাঠকের মন্তব্য