লেখা: এম হাসান
পাকিস্তানের কিছু প্রদেশে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের খু-ন করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। দেশটা যদিও একটা ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, সত্তরের দশকেও দেশটা কিন্তু এতটা উগ্র ও ধর্মীয় মৌলবাদী ছিল না।
আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দাবি করেন পঁচাত্তরের পর থেকে ইসলামি শাসন কায়েমের চেষ্টা করা হইছে। আমি অনেকবার চিন্তা করছি যে তাহলে বাংলাদেশ কেন পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ইন্দোনেশিয়া হলো না। বোঝার চেষ্টা করছি কেন বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর্মী বা নারী পুলিশ সদস্যদের সাথে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মত অবস্থা হয় নাই।
________
এই প্রশ্নটার উত্তর আমি পাই ১৯৯৩ সালে দি নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটা প্রতিবেদন থেকে, Conversations: Khaleda Zia; A Woman Leader for a Land That Defies Islamic Stereotypes.
পৃথিবীতে তখন দুইটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো ও বাংলাদেশের বেগম খালেদা জিয়া। বেনজির ভুট্টো পড়াশোনা করেছেন অক্সফোর্ডে, পাকিস্তানের রাজকীয় এক পরিবারের মেয়ে। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম বাংলাদেশের সাধারণ একটি পরিবারে, একসময় গৃহবধূ থেকে আকস্মিকভাবেই স্বামীকে হারান, রাজপথে লড়াই করে এরশাদের পতন ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। এই তথ্যগুলো নিয়ে কারো কোন সন্দেহ থাকলে ড. গওহর রিজভীর একটা আর্টিকেল দিতে পারি, মিলিয়ে নেবেন।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষিত বেনজির ভুট্টো যখন ধর্মীয় নেতা ও ইসলামপন্থী সেনাবাহিনীকে তোষামোদে ব্যস্ত, স্বল্পশিক্ষিত খালেদা জিয়া তখন দেশের নারীদের জন্য স্কুলগুলো ফ্রি করে দিচ্ছেন, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন সারাদেশে।
দি নিউ ইয়র্ক টাইমসের বারবারা ক্রসেট তার প্রতিবেদনে লেখেন, Now as Prime Minister, Mrs. Zia -- in contrast with Benazir Bhutto when she first became Prime Minister of Pakistan -- is aggressively promoting education and vocational training, especially of girls, and expanding small-scale, no-collateral lending to increase the self-sufficiency of women.
(বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মিসেস জিয়া শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনজির ভুট্টোর প্রথম দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার নীতির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, খালেদা নারীদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করছেন এবং তা জোরালোভাবে বাস্তবায়ন করছেন।)
বারবারা ক্রসেট খালেদা জিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কী কী করছেন দেশের মেয়েদের জন্য, উত্তরে তিনি বলেন, Our primary education is now free and compulsory up to grade five -- and for girls free up to grade eight," she said. "We are experimenting in some areas with a scheme that gives food grains to families who keep their children in school.
Sometimes, a parent will bring a bright girl to me who is too poor to continue her studies, said the Prime Minister, the mother of two university-aged sons. I have a discretionary fund for such girls.
(তখন তিনি বলেন, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা এখন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক—এবং মেয়েদের জন্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে করা হয়েছে। কিছু এলাকায় আমরা এমন একটি কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছি সেসব পরিবারকে খাদ্যশস্য দেওয়ার মাধ্যমে যারা তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এবং একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া দুই পুত্রের মা আমাকে এও বলেন, কখনও কখনও এমনও অভিভাবক আমার কাছে এসেছেন তাদের মেধাবী মেয়েকে নিয়ে যে তারা দারিদ্র্যের কারণে মেয়ের পড়াশোনা চালাতে পারছেন না, এ ধরনের মেয়েদের জন্য আমার একটি বিবেচনাধীন তহবিল রয়েছে।)
খালেদা জিয়া সরকারের নীতির কারণে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের স্কুল পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের অনুপাত ৫২ঃ৪৮-এ উন্নীত হয়। ২০০৬ সাল নাগাদ ৫০ঃ৫০ হয়ে যায়।
________
কিন্তু দেশের মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের জন্য তো টাকা দরকার। অর্থনীতি যদি না বাড়ে তাহলে তো এইটা সম্ভব হবে না। তাই দেশের কর ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনা হয় নব্বইর দশকের শুরুতেই, যোগ হয় ভ্যাট।
এই ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান ডেইলি স্টারে একটা লেখেন, Saifur Rahman also understood that in order to invest in human capital, government revenue needed to rise. His solution was to rationalise the tax code, lowering the rate, and broadening the base. The Value Added Tax, introduced in 1991, was a major milestone on this front.
(সাইফুর রহমানও বুঝেছিলেন যে মানবসম্পদে বিনিয়োগ করতে হলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তার সমাধান ছিল কর ব্যবস্থাকে যুক্তিসংগত করা, করহার কমানো এবং করের আওতা বিস্তৃত করা। ১৯৯১ সালে প্রবর্তিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল।)
খালেদা জিয়া এবং তাঁর মন্ত্রীদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এমন একটা নতুন পথ খুঁজে পায়, যেই পথে চলে উপমহাদেশের অন্য দুই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান না হয়ে আজকের বাংলাদেশে রূপ নেয়।
________
বিখ্যাত লেখক ও গবেষক নিকোলাস ক্রিস্টফ বাংলাদেশের উন্নয়নের রহস্য কী তা নিয়ে লেখেন, What was Bangladesh’s secret? It was education and girls.
(বাংলাদেশের গোপন রহস্য আসলে কী ছিল? তা ছিল শিক্ষা আর মেয়েরা।)
তিনি ব্যাখা করেন, But then [after 1980s] the government and civic organizations promoted education, including for girls. Today, 98 percent of children in Bangladesh complete elementary school. Still more astonishing for a country with a history of gender gaps, there are now more girls in high school in Bangladesh than boys.
(কিন্তু এরপর [১৯৮০–এর দশকের পর] সরকার ও নাগরিক সংগঠনগুলো শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ নেয়, এর মধ্যে মেয়েদের শিক্ষাও ছিল বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৯৮ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, লিঙ্গ বৈষম্যের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আজ বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়ের সংখ্যাই বেশি।)
ক্রিস্টফ আরও লেখেন, As Bangladesh educated and empowered its girls, those educated women became pillars of Bangladesh’s economy. The nation’s garment factories have given women better opportunities, [...] Bangladesh is now the world’s largest garment exporter, after China.
(বাংলাদেশ তার মেয়েদের শিক্ষিত ও ক্ষমতায়িত করেছে যার ফলশ্রুতিতে, সেই শিক্ষিত নারীরাই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছেন। দেশের পোশাক কারখানাগুলো নারীদের জন্য উন্নত সুযোগ সৃষ্টি করেছে, […] আর এখন বাংলাদেশ চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।)
বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় বাংলাদেশে নারীদের প্রধান কর্মক্ষেত্র তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ে ২৯%। কেন? কারণ তৈরি পোশাক শিল্প বিদেশে রপ্তানি করার জন্য যত ধরণের সুযোগ-সুবিধা দেয়া দরকার, তা নিশ্চিত করা হয়েছিল এই সময়। পরের সরকারের সময় এই বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৫%! এইটা বিআইডিএসের তথ্য, আমার কথা না।
________
বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপারে একটা কথা প্রচলিত আছে। আমরা প্রচন্ড
পরশ্রীকাতর ও অকৃতজ্ঞ একটা জাতি।
মুজিব তার আত্মজীবনীতে বাঙালির পরশ্রীকাতরতা নিয়ে লিখেছেন, ঈর্ষা,দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না, এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।
বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়াকে যে জুলুম সহ্য করতে হয়েছে এর একটা বড় অংশের ভ্যালিডেশন এসেছে সমাজের এলিট প্রগতিশীল-সেক্যুলার অংশ থেকে। এবং এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিছু নারীরাই।
তাদের এই আচরণের পিছনে ছিলো পরশ্রীকাতরতা এবং হিংসা।
অথচ... ইতিহাস স্বাক্ষী বাংলাদেশের নারীদের ভাগ্য পরিবর্তনে এক বেগম খালেদা জিয়ার অবদান এই সো-কল্ড প্রগতিশীল-সেক্যুলার সম্প্রদায় থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি।



পাঠকের মন্তব্য