ঘরের গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী হয়ে ওঠার যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু নিজস্ব গুনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্যা। বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতাদের সাথে টক্কর দিয়ে অসম সাহসিকতায় আর দৃঢ পদক্ষেপে এগিয়ে নিয়েছেন দেশকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব, গনতান্ত্রিক জাগরণ গড়ে তোলায় তার বড় অবদান রয়েছে। আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। বাংলাদেশ বিনির্মানে তার কিছু অবদানের কথা রইল eআরকির পাঠকদের জন্য।
১।
বাংলাদেশের অনেক প্রথমের সাথে খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে আছে। খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি বিএনপির প্রথম নারী চেয়ারপার্সন হিসেবেও নিযুক্ত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও ১৯৯২ সালে ঢাকায় আয়োজিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি সার্কের প্রথম নারী চেয়ারপারসন হন।
২।
খালেদা জিয়া নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন অনন্য। নির্বাচনের মাঠে তিনি এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তার কোনো নির্বাচনী আসনে কখনোই তিনি হারেননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া প্রতিবার পাঁচটি করে আসনে প্রার্থী হন এবং প্রতিটি আসনেই জয়লাভ করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বলাইবাহুল্য, তিনটিতে তিনি জয়লাভ করেন।
৩।
খালেদা জিয়ার শাসনামলের একটা বড় মাইলফলক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৯২ সালে বাউবি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের ঝরে পড়া শিক্ষাজীবনে ফিরে যেতে পারছে। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে গিয়ে আবারও শুরু করতে পারছে একাডেমিক লেখাপড়া।
৪।
বাংলাদেশের নারী শিক্ষার একটা শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বুঝতে পারলেন এদেশে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। শহর বাদেও গ্রামে, মফস্বল এলাকায় যেন মেয়ে শিশুরা স্কুলমুখী হয় সেজন্য মেয়েদের লেখাপড়া করা হয় অবৈতনিক। সাথে দেওয়া হতো উপবৃত্তি আর স্কুলের টিফিনও। এই এক সিদ্ধান্তের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের হার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
৫।
১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২’ প্রণয়ন করেন, যা বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। ফলে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (NSU), অনুমোদিত হয় এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
৬।
নারীদের ওপর নির্যাতন রুখতে তিনি শুধু বক্তব্যেই থামেননি, এগুলো বন্ধ করার জন্য নিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও। ধর্ষণ, এসিড সন্ত্রাস ও যৌতুকবিরোধী আইন তার শাসনামলেই প্রণীত হয়—যা সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
৭।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতিও আসে আন্তর্জাতিকভাবে। ২০০৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী’ তালিকায় তিনি স্থান পান ২৯তম অবস্থানে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চেও তখন তার নাম। সেসময় ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে নিয়ে লিখেছিল, এক সময়ের লাজুক এবং চাপা স্বভাবের গৃহবধূ বেগম জিয়া, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষায়।
৮।
মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে আরও শক্ত ভিত্তি দিতে ২০০১ সালে তার সরকার প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয়। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
৯।
২০০২ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। এই সাহসী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়—পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ তখন পথ দেখিয়েছিল সারাবিশ্বকে।
১০।
রাজনীতিতে আসার আগেই তিনি স্বৈরাচার এরশাদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম তখন আলোচিত। কিন্তু এরশাদ কোনোভাবেই চাইতেন না, খালেদা জিয়া বিএনপির দায়িত্ব নিক। কারণ এরশাদের ধারণা ছিল, তার ক্ষমতা দখলে খালেদা জিয়া বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
তথ্যসূত্র: ডয়চে ভলে, বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, চ্যানেল২৪, দেশ রুপান্তর, বাংলা আউটলুক, বাংলাদেশ জার্নাল



পাঠকের মন্তব্য