লেখা: জিয়া হাসান
ইস্কাটনে আমার অফিসের সামনে অনেকগুলো টং ঘর। চার-পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে মাথা ব্লক হয়ে গেলে, রিফ্রেশ হতে আমি টং ঘরে যাই—অনেক বছরের অভ্যাসে দুধ চা সহ একটা সিগারেট ধরাই। দোকানি আর আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে গল্প করি।
আমি একটা নির্দিষ্ট দোকানেই বসি। একদিন দেখি ছেলেটা নেই। পরদিন তাকে বললাম, কী ব্যাপার, কাল তো দেখলাম না?
সে বলল, স্যার, গতকাল মির্জা আব্বাসের মিটিংয়ে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সারা সকালটা মারা গেল, দুই হাজার টাকা লস গেছে। শুধু আমি না, আরও অনেক দোকানি আর স্টাফকে নিয়া গেছিল। গরীব মানুষের উপর এই জুলুম কি আল্লাহ সহ্য করবেন?
আমি মাঝে মাঝে ভাবি—কোন ভিত্তিতে আমার বন্ধুরা ধরে নেন বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসবে? আমি সমাজে যাদের সঙ্গে মিশি—খেয়াল করবেন, আমি সোশাল মিডিয়ার কথা বলছি না, সমাজের কথা বলছি—আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, কলিগ—প্রায় সবাই বিএনপির ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। তারা কেউ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার 'ঠিকা' নেয়নি। ভালো কোনো বিকল্প দেখলে তাকেই ভোট দেবে।
আর চায়ের দোকানের সেই ছেলেটা—যার ২০০০ টাকা মাইর গেলো—সেও বিএনপিকে ভোট দেবে? এত নিশ্চিত? কেন দেবে? এই অবস্থায় বিএনপি কীভাবে ধরে নিচ্ছে যে তারা নির্বাচনে জিতবেই?
অনেকে একটা যুক্তি দেন—গ্রামের রাজনীতি আলাদা। গ্রামের মানুষ নাকি ‘মার্কা’ দেখে ভোট দেয়। আমার স্ট্যাটিস্টিশিয়ান বন্ধুরা দেখান, ঐতিহাসিকভাবে কোন কোন এলাকায় বিএনপি ৩০% ভোট নিশ্চিতভাবে পেয়ে এসেছে। ফলে, ঐ এলাকাগুলোতে তারা এখনো ধরে নিচ্ছে ৩০% ভোট নিশ্চিত।
কিন্তু এই হিস্টোরিকাল প্যাটার্নভিত্তিক ভোট ব্যাংক থিয়োরিটা আমার কাছে সবসময়েই প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে। সুইং ভোটার নিয়ে আমার নিজস্ব একটা পর্যবেক্ষণ আছে। হিন্দু কমিউনিটির আওয়ামী লীগের প্রতি এলিজিয়েন্স বাদে সমাজে কোনো স্থায়ী ভোট ব্যাংক আমি দেখি নাই। আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করি। আমি দেখেছি —সমাজে ৫% আওয়ামী লীগ, ৫% বিএনপি। বাকিরা সবাই সুইং ভোটার। বিগত ১ দশকে আওয়ামি লিগের এই ৫% হয়তো কমে ১% হয়ে এসেছে, আর বিএনপির ৫% হয়তো ১০% এ পৌঁছেছে।
তাহলে আমার এই থিয়োরি যদি ঠিক হয়, বিএনপি যে কোনো আসনে ৩০% নিশ্চিত ভোট পাবে বলছে, তার মধ্যে ১০% হতে পারে ভোট ব্যাংক, আর বাকি ২০% সুইং ভোটার—যারা আগেরবার আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। অর্থাৎ হিস্টরিক প্যাটারন যেইটা দেখাচ্ছে সেইটা মুলত ছিল একটা এন্টি ইঙ্কামবেন্সি সুইং ভোট, যে অ্যান্টি ইঙ্কাম্বেসি ফ্যাক্টরকে উপেক্ষা করে অ্যানালিস্টরা ৩০% ভোটারদের দলীয় ব্যাঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আমার এই হাইপোথেসিসের পিছনে যেমন কোনো একাডেমিক এভিডেন্স নাই, ঠিক তেমনি বিএনপি যে সকল আসেনে বারবার জিতে আসছে, সেটাকে ভোট ব্যাংক ধরে নেওয়ার বিপরীতে কোনো স্ট্যাটিস্টিকাল প্রমাণও নাই, সেইটা র্যান্ডমনেস হতে পারে। তাই আমি মনে করি, আগামী নির্বাচন অনেকটাই ‘আনপ্রেডিক্টেবল’।
কিন্তু, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে দেখি, তারা তাদের বিজয় নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত।
তাদের এই আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি হচ্ছে—ঐতিহাসিক ভোট ব্যাংক, বিকল্প না থাকা ও আওয়ামি লিগের ভোট ব্যাঙ্কের ভোট পাওয়ার নিশ্চয়তা। তারা জানে, এনসিপি এখনও আরবান মিডল ক্লাসকে বোঝাতে পারেনি তাদের মূল্যবোধ আসলে কী। তারা মনে করে, বাংলাদেশের মহিলারা জামায়াতকে কোনোদিন ভোট দেবেন না। এবং বিএনপি যথার্থভাবেই জানে, আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের বড় অংশ বিএনপির দিকেই আসবে।
এইসব ধরে বিএনপি মনে করে—তাদের বিজয় সুনিশ্চিত, যা তাদের ক্ষমতার পাওয়ার বিষয়ে একটি এনটাইটেলমেনট তৈরি করেছে ।
কিন্তু একজন র্যান্ডমনেন্স ও আনসারটেনিটির ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি চাঁদাবাজি, আর খুন ও হত্যাযজ্ঞের প্রতিনিধিত্ব করা একটি দল হিসেবে—সমাজের সর্বস্তরের এত ঘৃণার পাত্র হয়ে—কোনো দল যদি হিস্টরিকাল প্যাটারেনের ভিত্তিতে ধরে নেয় যে তাদের নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিত, তবে সেইটা ফুল্ড বাই র্যান্ডমনেসও হইতে পারে। আগামি নির্বাচনে ৪ কোটি নতুন ভোটার। আগামি নির্বাচন একটা অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচন। আগামি নির্বাচন প্রথম একটা নির্বাচন যখন ট্রাডিশানাল মেডিয়ার পরিবর্তে সামাজিক মিডিয়ার ন্যারেটিভ সমাজের মানস নির্মাণ করছে। ৮ মাস দীর্ঘ সময়। এই সময়ে অনেক কিছু ঘটতে পারে।
কিন্তু বিএনপি কিছুই করবে না। তারা পাল্টাতে পারবে না। প্রথমত তারা নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে এন্টাইটেল্ড মনে করে, ফলে তাদের নিজেকে পরিবর্তনের কোন বাসনা নাই। কারন সে জানে সে জিতবেই। দ্বিতীয়ত বিএনপি দলগতভাবে সামন্ততান্ত্রিক দল। দাস-প্রভু সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো রাজনীতি তারা চেনে না। এই সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক বাদে আর কোনো রাজনীতি সে জানে না।
বিএনপি বুঝতেই পারছে না—সমাজের আকাঙ্ক্ষা আজ কোথায় চলে গেছে, আর তারা কোথায় আটকে আছে। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আজ কোন স্তরে পৌঁছেছে, আর বিএনপি সেই তুলনায় কোথায়।
সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে এতটা ঘৃণা পাওয়ার পরেও একটা দল কীভাবে হিস্টোরিকাল ভোটিং প্যাটার্নের ভিত্তিতে বিজয় নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসী থাকে—সেটা আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে- কারণ সে জানে না তার অ্যানালিসিস হয়তোবা ফুল্ড বাই র্যান্ডমনেস।



পাঠকের মন্তব্য