
সুলেখা কাঁদিতেছে।
গভীর রাত্রি। বাহিরে জোছনায় ফিনিক ফুটিতেছে। এই স্বপ্নময়ী আবেষ্টনীর মধ্যে দুগ্ধফেননিভ শয্যায় উপুড় হইয়া ষোড়শী তন্বী সুলেখা অঝোরে কাঁদিতেছে। একা। ঘরে আর কেহ নাই। চুরি করিয়া একফালি জোছনা জানালা দিয়া প্রবেশ করিয়াছে। প্রবেশ করিয়া এই ব্যাথাতুরা অশ্রুমুখী রূপসীকে দেখিয়া সে যেন থমকিয়া দাঁড়াইয়া আছে। কেন এ ক্রন্দন?
প্রেম! হইতে পারে বইকি। এই জোছনা পুলকিত যামিনীতে সুন্দরী ষোড়শীর নয়নপল্লব অশ্রুসঞ্চারের কারণ প্রেম হইতে পারে, সুলেখার জীবনে প্রেম একবার আসি-আসি করিয়াছিল তো। তখনও তাহার বিবাহ হয় নাই। অরুণদা নামক যুবকটিকে সে মনে মনে শ্রদ্ধা করিত। অতীত সঙ্গোপনে এবং মনে মনে। এই শ্রদ্ধাই স্বাভাবিক নিয়মে প্রেমে পরিণত হইতে পারিত। কিন্তু সামাজিক নিয়ম তাহাকে বাধা দিল। সামাজিক নিয়ম অনুসারে অরুণদা নয়, বিপিন নামক জনৈক ব্যক্তির লোমশ গলদেশে সুলেখা বরমাল্য অর্পণ করিল।
হয়তো এই গভীর রাত্রিতে জোছনার আবেগে সেই অরুণ-দাকে তাহার বারবার মনে পড়িতেছে। নির্জন শয্যায় তাহার স্মরণে হয়তো এই অশ্রুতর্পন। তবে ইহাও ঠিক যে, তাহার গোপন হৃদয়ের ভীরু বার্তাটি সে অরুণ-দাকে কখনো জানায় নাই। মনে মনে তাহার যে আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিয়াছিল, বিবাহ্রের পর তাহা ধীরে ধীরে কালের অমোঘ নিয়মানুসারে আপনিই নিবিয়া গিয়াছে।
বিপিন যদিও অরুণদা নয়, কিন্তু বিপিন বিপিন। একেবারে খাঁটি বিপিন। এবং আশ্চর্যের বিষয় হইলেও ইহা সত্য কথা যে, বিপিনের বিপনত্বকে সুলেখা ভালোবাসিয়াছিল। ভালোবাসিয়া সুখী হইয়াছিল। সহসা আজ নিশীথে সেই বিস্মৃত-প্রায় অরুণদাকে মনে পড়িয়া আখিপল্লব জল হইয়া উঠিবে, সুলেখার মন কি এতই অতীতপ্রবণ?
হইতে পারে। নারীর মন বিচিত্র। তাহাদের মনস্তত্বও অদ্ভুত। সে সম্বন্ধে চট করিয়া কোনো মন্তব্য করা উচিত মনে করি না। বস্তুত স্ত্রীজাতির সম্বন্ধে কোনো কিছু মন্তব্য করাই দুঃসাহসের কার্য। যে রমনীকে দেখিয়া মনে হয়, বয়স বোধহয় উনিশ-কুড়ি- অনুসন্ধান করিয়া পুনরায় কাহারো বয়স যখন অনুমান করিলাম পঁচিশ- প্রমাণিত হইয়া গেল তাহার বয়ঃক্রম পনেরো বৎসরের এক মিনিটও অধিক নয়।
সুতরাং নারী-সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে বেকুবের মতো ফস করিয়া কিছু একটা বলিয়া বসা ঠিক নয়। সর্বদাই ভদ্রভাবে ইতস্তত করা সঙ্গত ইহাই সার বুঝিয়াছি এবং সেইজন্যই সুলেখার ক্রন্দন সম্বন্ধে সহসা কিছু বলিব না। কারণ আমি জানি না। এই ক্রন্দন শোভন ও সঙ্গত কারণ যতগুলি হওয়া সম্ভব, তাহাই বিবৃত করিতেছি।
গভীর রাত্রে এক ঘরে একটি যুবতী শয্যায় শুইয়া ক্রমাগত কাঁদিয়া চলিয়াছে- ইহা একটি ডিটেকটিভ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের বিষয়ও হইতে পারে। কিন্তু আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত আছি, তাহা নয়। পাঠক-পাঠিকাগণ এ বিষয়ে অন্তত নিশ্চিত হউন। বিপিন এবং সুলেখাকে যতদূর জানি, তাহাতে তাহাদের ডিটেকটিভ উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা হইবার মতো যোগ্যতা আছে বলিয়া মনে হয় না।
অরুণদার কথা ছাড়িয়া দিলে সুলেখার ক্রন্দনের আর একটি সম্ভাবনার কথা মনে হইতেছে। কিছুদিন পূর্বে সুলেখার একটি সন্তান হইয়াছিল। তাহার প্রথম সন্তান। সেটি হঠাৎ মাস দুই পূর্বে ডিপথেরিয়াতে মারা গিয়াছে। হইত পারে, সেই শিশুর মুখখানি সুলেখার জননী হৃদয়কে কাঁদাইতেছে। শিশুটির মৃত্যুর পর সুলেখা দুইদিন ‘ফিট’ হয়, ইহা তো আমরা বিশ্বস্তসূত্রে জানি। চিরকালের জন্যে যাহা হারাইয়া গিয়াছে, তাহাকে ক্ষণিকের জন্যেও ফিরিয়া পাইবার আকুলতা কঠোর পুরুষের মনেও মাঝে মাঝে হয়। কোমলহৃদয়া রমনীর অন্তঃকরণে তাহা হওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নহে। ক্রন্দনের কারণ পুত্রশোক হইতে পারে। অবশ্যই হইতে পারে।
কিন্তু হ্যা, আরেকটি কারণও হইতে পারে। পুত্রশোক প্রসঙ্গের পর এই কথাটি বলিতেছি বলিয়া আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন- কিন্তু সুলেখার ক্রন্দনের এই তুচ্ছ সম্ভাবনাটা আমি উপেক্ষা করিতে পারিলাম না। বিগত কয়েক দিবস হইতে একটি নামজাদা ছবি স্থানীয় সিনেমা হাউসে দেখানো হইতেছে। পাড়ার যাবতীয় নরনারী সদলবলে গিয়া ছবিটি দেখিয়া আসিয়াছেন এবং উচ্ছ্বসিত হইয়া প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ করিতেছেন। কিন্তু বিপিন লোকটি এমনকি বেরসিক যে, সুলেখার বারম্বার অনুবোধ সত্ত্বেও সে সুলেখাকে উক্ত ছবি দেখাইতে লইয়া যায় নাই। প্রাঞ্জল ভাষায় প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। সুলেখার যাহা ভালো লাগে, প্রায়ই দেখা যায় বিপিনের তাহাতে রাগ হয়। আশ্চর্য লোক এই বিপিন। কিছুক্ষণ আগেই সিনেমায় লাস্ট শো হইয়া গিয়াছে। সুলেখার শয়নঘরে বাতায়নের নিচে দিয়াই সিনেমাতে যাইবার পথ। দর্শকের দল খানিকক্ষণ আগেই এই রাস্তা দিয়া সোল্লাশে হল্লা করিতে করিতে বাড়ি ফিরিলো। হয়তো তাহাতেই সুলেখার ক্রন্দন সিনেমাঘটিত হওয়াটাও কিছুমাত্র অসম্ভব নহে।
হইতে পারে। তরুণী পত্নীকে শান্ত করিবার জন্য মানুষ সব করিতে পারে। হোক না বিপিন লোমশ- সে মানুষ তো। তাছাড়া বিপিন সুলেখাকে সত্যই ভালোবাসিত- ইহাও আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত আছি। কারণ আমরা- লেখকেরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত থাকি। সুতরাং এই ক্রন্দন সিনেমাঘটিত হওয়াটাও কিছুমাত্র অসম্ভব নহে।
সবই হওয়া সম্ভব। বাস্তবিক যতই ভাবিতেছি ততই আমার বিশ্বাস হইতেছে, সুলেখার ক্রন্দনের হেতু সবই হইতে পারে। এমনকি আজই সন্ধ্যাকালে সামান্য একটা কাপড়ের পাড় পছন্দ করা প্রসঙ্গে সুলেখার সহিত বিপিনের সাংঘাতিক মতভেদ হইয়া গিয়াছে। রূঢ়ভাষী পুরুষেরা সাধারণত যাহা করে, বিপিন তাহাই করিয়াছে। গলার জোর অর্থাৎ চিৎকার করিয়া জিতিয়াছে। মৃদুভাষিনী সাধারণত যে উপায়ে জিতিয়া থাকেন, সুলেখা সম্ভবত তাহাই অবলম্বন করিয়াহে- অর্থাৎ কাঁদিতেছে।
কারণ যাহাই হউক, ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে করুণ। রাত্রি গভীর এবং জোছনা মনোহারিণী হওয়াতে আরো করুণ- অর্থাৎ করুণতর। কোনো সহৃদয় পাঠক কিংবা পাঠিকা যদি ইহাকে করুণতমও বলেন, তাহা হইলেও আমার প্রতিবাদ করিবার কিছুই থাকিবে না। কারণ সুলেখা তরুণী। রাত্রি যতই নিবিড় এবং আকাশপ্রাবিনী হউক না কেন, এ বিষয়ে খুব সম্ভবত আমরা একমত যে, এই রাতদুপুরে একটা বালক কিংবা একটা বুড়ি কাঁদিলে আমরা এত আর্দ্র হইতাম না। উপরন্তু হয়তো বিরক্তই হইতাম।
সুলেখা কিন্তু তরুণী। মন সুতরাং দ্রব হইয়াছে এবং এ কথাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, সুলেখার ক্রন্দনের কারণ না নির্ণয় করা পর্যন্ত স্বস্তি পাইতেছি না, এমনকি অরুণদাকে জড়াইয়া একটা শস্তা-গোছের কাব্য করিতেও মন উৎসুক হইয়া উঠিয়াছে। মন বলিতেছে: কেন, নয়? এমন চাঁদনি রাতে কৈশোরের সেই অর্ধ-প্রস্ফুটিত প্রণয়-প্রসুন সহসা পূর্ণ-প্রস্ফুটিত হইতে পারে না কি? ওই তো দূরে ‘চোখ গেল’ পাখি অশ্রান্ত সুরে ডাকিয়া চলিয়াছে। সম্মুখের বাগানে রজনীগন্ধাগুলি স্বপ্নবিহ্বল। চতুর্দিকে জোছনার পাথার। এমন দুর্লক্ষণে অরুণদার কথা মনে হওয়া কি অসম্ভব না অপরাধ?
মনের বক্তৃতা বন্ধ করিয়া কপাটটা হঠাৎ খুলিয়া গেল। ব্যস্তসমস্ত বিপিন প্রবেশ করিল। মুখে শঙ্কার ছায়া। সিনেমার টিকিট পায় নাই সম্ভবত। কিন্তু এ কী!
বিপিন জিজ্ঞেস করিল, দাঁতের ব্যথাটা কমেছে?
না। বড্ড কনকন করছে।
এই পুরিয়াটা খাও তাহলে। ডাক্তারবাবু কাল সকালে আসবেন বললেন। কেঁদে আর কী হবে? এটা খেলেই সেরে যাবে। খাও লক্ষ্মীটি।
জোছনার টুকরাটি মুচকি মুচকি হাসিতেছে!
দেখিলেন তো? বলিয়াছিলাম, সবই সম্ভব!


পাঠকের মন্তব্য