আটত্রিশ বছর। হিসেব করলে আটত্রিশ বছরের চেয়েও বেশি। আটত্রিশ বছর, সাত মাস, এগারো দিন। এত দিন চাকরি করার পরে সুশোভন পাল অবশেষে অবসর গ্রহণ করলেন। ছোট চাকরিতে সাড়ে একুশ বছর বয়সে টুক করে ঢুকে পড়েছিলেন পিসেমশায়ের দৌলতে। চাকরির কোনও স্থায়িত্ব ছিল না। স্টপ-গ্যাপ চাকরি, মানে অন্যের জায়গায় কাজ করা। সব সময়েই শুনতেন, সামনের মাসে কাজ চলে যাবে।
সরকারি চাকরিতে সাধারণত এত পরিশ্রম করে কেউ কাজ করে না। কথায় আছে না—
আসি যাই মাইনে পাই
কাজ করলে উপরি চাই।
অবশ্য উপরির দিকে ঝোঁক ছিল না সুশোভন পালের। তবে কোনও কাজ হয়ে গেলে কেউ খুশি হয়ে কিছু দিলে শেষের দিকে সেটা নিতেন। কখনও কেউ একটা বড় মাছ পাঠিয়ে দিল বাসায়। কখনও বা এক হাঁড়ি মিষ্টি। নগদ টাকা কখনও নেননি। সেটা পুরোপুরি ঘুষ। একবার শীতকালে একজন একটা শাল উপহার দিয়েছিল। সেটাই সারাজীবনে সবচেয়ে মূল্যবান উপরি।
তবে অল্প বয়সে এই ধরনের উৎকোচও গ্রহণ করেননি তিনি। দু-চারবার লোকে লোভ দেখাতে গিয়ে তিরস্কৃত হয়েছে। খুব যে খারাপভাবে গালাগাল করতেন, তা নয়, তবে শক্তভাবেই। বুঝিয়ে দিতেন, যথাসময়ে কাজ হবে এবং এই কাজের জন্য কোনও টাকাপয়সা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বহুদিন আগের একটা কথা মনে পড়লে এখনও পালবাবুর হাসি পায়। একবার এক লেখককে তিনি গল্পটা বলে দিয়েছিলেন। আর লেখকের যা স্বভাব, পরের সপ্তাহেই ভদ্রলোক কাগজে লিখে গল্পটা বারোয়ারি করে দিলেন।
গল্পটা একটা চিঠি নিয়ে। আর সেই চিঠিটা একটা সামান্য পোস্টকার্ড। এসেছে মফস্সল থেকে কলকাতায়। আসানসোল অঞ্চলের এক ভদ্রলোক তাঁর ভাইপোকে চিঠিটা লিখেছেন। ভদ্রলোকের একটা বৈষয়িক ব্যাপারে তদবির আছে সুশোভনবাবুদের অফিসে। নথিটা সুশোভনবাবুই ডিল করেন। ভদ্রলোক নিজেই দু-একবার অফিসে এসেছেন। যথারীতি সুশোভনবাবু খুব একটা পাত্তা দেননি, মিথ্যে আশ্বাসও দেননি। বলেছিলেন, সময়মতো দেখব।
ভদ্রলোকের ভাইপো কাকার চিঠি নিয়ে অফিসে এসেছেন ব্যাপারটার খোঁজখবর নিতে।
ভাইপোটির বয়স বছর পঁচিশ-তিরিশ হবে। তখনকার সুশোভনবাবুর সমবয়সিই হবেন। সেই ভদ্রলোক কাকার পোস্টকার্ড হাতে করে নিয়ে এসেছেন। তাতে ফাইল নম্বর, প্রয়োজনীয় বিষয়, কোন কেরানির কাছে নথিটি রয়েছে, ইত্যাদি সব তথ্য দেওয়া আছে। শুধু একটা ব্যাপারে খটকা লাগল সুশোভনবাবুর। ভাইপো ভদ্রলোক খুব শক্ত করে পোস্টকার্ডটা হাতে ধরে রেখেছেন। কিছুতেই আলগা করে রাখছেন না কিংবা চিঠিটা উলটাচ্ছেন না।
কী খেয়াল হল সুশোভনবাবুর! ভাইপো ভদ্রলোক সুশোভনের পাশে দাঁড়িয়ে পোস্টকার্ডটা ধরে কাকার নথিটার বিষয়ে কথা বলছিলেন। তিনি কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক হতেই সহসা এক ঝটকায় ভদ্রলোকের হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে উলটে ফেললেন।
ভাইপো ভদ্রলোক, ‘আ হা হা, আ হা হা, করেন কী, করেন কী?’ বলতে বলতেই সুশোভন পোস্টকার্ডের উলটো পিঠটা পড়ে ফেললেন। সেখানে লেখা আছে—
‘ওই কেরানিবাবু, সুশোভন পাল, পালবাবু অতিশয় বিপজ্জনক লোক। ঘুষ খান না, কাজও করেন না। পালবাবুকে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করিবে না, তাহাতে হিতে বিপরীত হইবে। বরং তাঁহাকে তোষামোদ করিয়া যদি কাজ হাসিল করিতে পার, তাহাই চেষ্টা করিবে। অতি সাবধানে এই কার্য সমাধান করিবে।
ইতি
চিরআশীর্বাদক
বিপদভঞ্জন চক্রবর্তী’
বিপদভঞ্জনের বিপদ অবশ্য যথাসময়ে কেটে গিয়েছিল। কিন্তু এই সামান্য ঘটনার মধ্যেই সুশোভন পালের চারিত্রিক ছায়া, বলা যায়, সুশোভন পাল নামক এক নিতান্ত সাধারণ মানুষের চেহারাটাই পাওয়া যাবে।
আসল রক্তমাংসের মানুষটার চেহারা ভালো। উচ্চতা সোয়া পাঁচ ফুট, গায়ের রং শ্যামবর্ণ, চুল কোঁকড়া, ওজন পঞ্চাশ কেজি।
এটা সেই চাকরিতে ঢোকার সময়ের হিসেব। এখনকার হিসেব প্রথম দুটো ঠিকই আছে, কিন্তু চুল কোঁকড়ার বদলে হবে মাথায় বিশাল টাক, ওজন পঞ্চাশ কেজির বদলে অন্তত আশি কেজি।
শুধু সুশোভনবাবুর সঙ্গে জানবুঝ করার জন্য এই কাহিনিতে এত দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা প্রয়োজন হল।
আগেই বলেছি, সুশোভনবাবু গত বছর অবসর গ্রহণ করেছেন। যেমন হয়, প্রায় কিছু বুঝবার আগেই তাঁর ষাট বছর পূর্ণ হয়ে অবসরের দিন ঘনিয়ে এল।
যথারীতি, রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা এক কপি, এক বাক্স ভালো সন্দেশ, একটি তসরের চাদর আর একটি বেতের লাঠি, সেই সঙ্গে গলায় একটা ভারী বেলফুলের মালা।
বিদায়সভা ভালোই হল। উদ্বোধনী সংগীত গাইলেন হেড টাইপিস্ট রাবেয়া চৌধুরী, ‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে…’। এরপর সহকর্মীদের বক্তৃতা, স্মৃতিচারণা। পঁচিশ বছর আগে সিঁড়ির নীচে একটা সদ্যপ্রসূতি মেনি বেড়াল আচমকা সুশোভনবাবুকে কামড়ে দিয়েছিল। একজন সে ঘটনা বললেন।
ব্যাপারটা সুশোভনবাবু ভুলেই গিয়েছিলেন। আজ বক্তৃতা শুনে মনে পড়ল। পরিষ্কার মনে পড়ল, সেই মা-বেড়ালটা ছিল ডোরাকাটা, কিন্তু তার বাচ্চা দুটোর একটা হয়েছিল ফুটফুটে সাদা, আরেকটা সাদাকালো।
পুরনো বন্ধু গোপীবাবু খুব রসিক লোক। তিনি আরেকবারের কথা বললেন। সেবার সুশোভন নতুন বড়সাহেবকে চিনতে না পেরে অফিসের প্যাসেজ দিয়ে বড়সাহেব যাওয়ার সময় সিগারেট ধরানোর জন্য দেশলাই চেয়েছিলেন, ‘দাদা, একটু দেশলাই হবে?’
বড়সাহেবরা এ জাতীয় অনুরোধ রক্ষা করেন না। কিন্তু ইনি একটু বেশিই রক্ষা করেছিলেন। নিজের চেম্বারে গিয়ে বেয়ারাকে দিয়ে এক ডজন দেশলাইয়ের একটা প্যাকেট কিনে সুশোভনবাবুকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
যাক, এসব কথা।
অবসর তো হয়ে গেল, সুশোভন পাল, সহকারী অধিকর্তা। বিদায়সভার শেষে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন এক হাতে পাকানো বেতের লাঠি, অন্য হাতে চাদর আর সন্দেশের বাক্স। সঞ্চয়িতাটা এক সহকর্মী পড়ার জন্য ধার নিয়েছেন। তাঁর মেয়ে খুব কবিতা পড়তে ভালোবাসে। বলেছেন, সাত দিনের মধ্যে ফেরত দেবেন। তবে কস্মিনকালেও ফেরত পাবেন, এ আশা তিনি রাখেন না।
ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরলেন সুশোভন পাল। বাড়িতে ফিরেও ভাবতে লাগলেন। কত রকম কথা। অফিসে প্রচুর খেটেছেন। ছুটি, বিশ্রাম, এসব প্রায় ছিলই না।
অফিসে আগে ছিলেন পালবাবু, শেষজীবনে অফিসার হয়েছিলেন, অফিসের ভাষায় সাহেব। কিন্তু তখনও তাঁকে কেউ পালসাহেব বলেনি, পালবাবুই বলেছে।
এসব কি গৌরবের কথা? অনেক কিছু ভাবেন সুশোভন।
এখন তাঁর হাতে অখণ্ড অবসর। শূন্যগৃহে প্রবীণা গৃহিণী। ছেলেমেয়েরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। খোঁজখবর নেয়, কিন্তু কদাচিৎ আসে।
সুশোভন প্রথমে ভেবেছিলেন, সময় কাটানো খুব একটা সমস্যা হবে না। ঘুমিয়েই দিন কাটিয়ে দেবেন। আহা! কতকাল ভালো করে ঘুমোনো হয়নি।
পরপর কয়েক দিন বেশ ভালোই ঘুমোলেন সুশোভন। ঘুমের একটা মাদকতা আছে, নেশার মতো ব্যাপার আছে। এক ঘুম থেকে অন্য ঘুম, অন্য ঘুম থেকে আরেক ঘুম—এইভাবে ঘুমের ওপর ভাসতে ভাসতে দিনের পর দিন।
মোটামুটি ঠিকঠাক চলছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে খবরের কাগজ, চা-জলখাবার। তারপর প্রভাতনিদ্রা। বারোটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে স্নান, খাওয়া। তারপর যাকে বলে দিবানিদ্রা। এরপর বিকেলে চা খেয়ে পাড়াটা একটু চক্কর দিয়ে এসে একটু টিভি দেখে কিঞ্চিৎ তন্দ্রা। ঘণ্টাখানেক পরে চোখে-মুখে জল দিয়ে নৈশাহার।
কিন্তু ব্যাপারটা অল্পদিনেই একঘেয়ে হয়ে উঠল। তা ছাড়া একটা লোকের পক্ষে কত ঘুমোনো সম্ভব! কয়েক দিন পরে সকালে ঘুমোলে বিকেলে ঘুম আসে না। বিকেলে ঘুমোলে রাতে ঘুম আসে না।
এদিকে এত ঘুমোনো দেখে পালগৃহিণী চিন্তিতবোধ করলেন। বাল্যবয়সে মহিলার শখের বেড়াল বেশি ঘুমিয়ে মরে গিয়েছিল। ডাক্তাররা বলেছিলেন, অসুখের নাম নিদ্রারোগ।
পালগৃহিণীর দুশ্চিন্তা হল, পতিদেবতা সেই রকম কোনও নিদ্রারোগে পড়েছেন কি না। ডাক্তার ডাকা হল। তিনি ব্যাপারটাকে পাত্তা দিলেন না। তিনি বললেন, ‘ও কিছু নয়। জানেন তো, ছড়া আছে—
কথায় কথা বাড়ে।
টাকায় বাড়ে টাকা।
ঘুমে ঘুম বাড়ে।
ফাঁকায় ফাঁকা ফাঁকা।’
নাড়ি, প্রেসার কিছুই না দেখে, শুধুমাত্র এই ছড়াটি বলে ডাক্তারবাবু আশি টাকা ভিজিট নিয়ে বিদায় হলেন। অবশ্য ওই আশি টাকার মধ্যে যাওয়ার আগে অন্য এক রোগীর একটা গল্প বলে গেলেন।
রোগী একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। সুতরাং সে তো শুধু ঘুমোবেই। সারা জীবন অফিসে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। এখন নিজেকে শোধরাবে কী করে!
এই বলে সেই পুরনো গল্পটা বললেন।
জনৈক সরকারি কর্মচারী দেরি করে অফিসে এসেছেন। ওপরওয়ালা দেরির কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, ‘কাল রাতে সিনেমা দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে যায়। আজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে চা-টা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’
এ কথা শুনে সেই ওপরওয়ালা আকাশ থেকে পড়লেন। ‘সে কী মশায়, আপনি কি বাড়িতেও ঘুমোন নাকি?’
যাই হোক, ঘুমের সাগর পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাস্তবের ডাঙায় উঠতে হল সুশোভনবাবুকে।
সময় কাটানোর নানা উপায়, ফন্দিফিকির খুঁজতে লাগলেন তিনি।
প্রথমে চেষ্টা করলেন স্ত্রীর সঙ্গে রান্নাঘরে কাজ করে সময় কাটিয়ে দেওয়ার। ভদ্রমহিলা তো চমৎকার একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন রান্নাঘরে। কিন্তু সেই সংকীর্ণ এলাকা থেকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হলেন সুশোভন। এ কাহিনি বিশদ করে বলার কিছু নেই। যে কোনও পুরুষমানুষ রান্নাঘরে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
এরপর টিভির দিকে মনোযোগ দিলেন সুশোভন। এখন তো একশো আটটা চ্যানেল, অষ্টপ্রহর টিভি চলছে। দিনরাত বিরামবিহীন। যতক্ষণ জেগে থাকেন, টিভি দেখেন সুশোভন। যে চ্যানেলে যখন যা হয়, সবকিছু। ‘ইতিহাস ফিসফাস কথা কয়’ থেকে ‘ও পাগলমন বাউলগান’।
দেখে দেখে হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের সব চিনে ফেললেন। প্রথম প্রথম গুলিয়ে ফেলতেন কে মনীষা, কে মাধুরী, কে ঐশ্বর্য। এসব এখন সড়গড় হয়ে গেছে ওঁর। এমনকী কখন মারামারি আসবে, কখন নাচাগানা আসবে, সব ধরতে পারেন। এরপর আর রোমাঞ্চ রইল না।
এর ওপরে বহুক্ষণ ধরে দূরদর্শন দেখায় এবং অভ্যাসের অভাবে কয়েক দিন বাদেই তাঁর চোখ টনটন করতে লাগল এবং খুব মাথা ধরতে লাগল।
অগত্যা দূরদর্শন ছেড়ে সুশোভনবাবু খবরের কাগজে মনোনিবেশ করলেন। সব কটি বাংলা খবরের কাগজ পড়া শুরু করলেন। হকারকে বলে দিলেন, বাংলা দৈনিক পত্রিকা যা আছে, সব দেবে।
যদিও কোনও কোনও খবরের কাগজের দাম কিছু কমেছে, তবু মাসে প্রায় তিনশো-সাড়ে তিনশো টাকা খরচ। একজন অবসরপ্রাপ্ত পেনশনারের পক্ষে টাকাটা অনেক। অবশ্য সময়টা ভালো কেটে যায়।
আজকাল খবরের কাগজে খবর ছাড়াও সাহিত্য, শিল্প, বিনোদন, নানারকম লেখা বেরোয়। সুশোভনবাবু জানেন, এসব লেখায় যেমন সময় কাটে, তেমনই অল্পবিস্তর আয় হয়। তাঁর অফিসের একটি ছোকরা গল্প লিখত। মাঝেমধ্যেই বেশ গর্বের সঙ্গে পাঁচশো টাকার চেক দেখাত। গল্পের পারিশ্রমিক।
এক দিস্তে ফুলস্ক্যাপ কাগজ কিনে কোমর বেঁধে এবার গল্প লেখায় হাত দিলেন সুশোভন। গল্প লেখার চেষ্টায় সময় ভালোই কাটতে লাগল। ঠিক অফিসের মতো সকাল দশটায় স্নান-খাওয়া করে টেবিলে বসেন, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ওঠেন।
শুধু পালগৃহিণী গজগজ করতে লাগলেন, ‘রিটায়ার করার পরও আমাকে অফিসের ভাত রাঁধতে হচ্ছে।’
সে না হয় হল, কিন্তু সুশোভনবাবুর গল্প একটাও হল না। সুশোভনবাবুর লিখতে লিখতে নায়ক-নায়িকার ওপর কনট্রোল চলে যায়। এটা অনেকেরই হয়, গল্প গুলিয়ে যায়।
এদিকে তাঁর চরিত্রদের মৃত্যুযোগ খুব বেশি। মধ্যকাহিনিতে বেশ কয়েকজন হার্টফেল করে মারা গেল। তিনজন গাড়ি চাপা পড়ে, মফস্সলের স্কুলশিক্ষিকা এক নায়িকা সাপে কাটা পড়ে এবং অন্য একজন বিষ খেয়ে মারা পড়লেন। এরপরে গল্পও মারা পড়ে।
এই সময় সুশোভনের নজরে পড়ল যে আজকাল খবরের কাগজে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা খুব চালু হয়েছে। ভুরিভুরি রান্নার রেসিপি, সুখাদ্যের রঙিন ছবি। যিনি যত নতুনত্ব রান্নায় দেখাতে পারছেন, তাঁর লেখা তত জনপ্রিয় হচ্ছে।
সুশোভনবাবু দু-চারটে রন্ধনপ্রণালী পড়ে বুঝতে পারলেন, এর মধ্যে অনেকগুলো বাস্তবে সম্ভব নয়। একজন লিখেছেন কাঁচা আমের সঙ্গে মানকচু সেদ্ধ মাখা বল করে আমকচুর ডালনা। অন্য একজন লিখেছেন, চিংড়িমাছের খোসা সেদ্ধ করে বেটে ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে চিংড়ি পরোটা বানানোর কায়দা।
সুশোভন জানতে পারলেন, হরেক রকম রান্নার বই বেরোচ্ছে। সেসব বই রমরম করে বিক্রি হচ্ছে। সে রকম কয়েকটা বই কিনে ফেললেন। তারপর নিজেই কোমর বেঁধে লেগে গেলেন রান্না নিয়ে লিখতে।
তিনি স্থির করলেন, সরাসরি হেঁসেলের গৃহিণীদের উদ্দেশ্যে লিখবেন। অনেক কাটাকুটি করে, নানারকম মাথা খাটিয়ে সুশোভন প্রথমেই লিখলেন—
ভরাবর্ষায় বাঁধাকপির ঘণ্ট
মা লক্ষ্মীগণ, বৃথা অপব্যয় করিবেন না। শীতকালে যখন বাঁধাকপি সুলভ এবং অপর্যাপ্ত, তখন বাঁধাকপির বাইরের দিকের বড় বড় কালো, ঘন সবুজ পাতাগুলি আপনারা ফেলিয়া দেন। এ বিষয়ে অনেক কিছু লেখার আছে। আমি এ যাবৎকাল এরকম অপব্যয় অনেক লক্ষ করিয়াছি।
মিষ্টি কুমড়া, যাহাকে কোথাও কোথাও বিলাতি কুমড়া বলা হয়, তাহার সুপক্ক বিচি আপনারা কি ব্যবহার করেন? এ বিচিগুলির খোসা ছাড়াইলেই একরকম হালকা, চিড়ার মতো আকারের বাদাম পাওয়া যায়, যাহার খাদ্যমূল্য পেস্তাবাদামের অপেক্ষা বেশি বই কম নহে এবং খাইতে অধিক সুস্বাদু।
এই সূত্রে কাঁচালঙ্কার কথাও বলিতে হয়। প্রতিদিন প্রতিগৃহে প্রচুর পরিমাণ কাঁচালঙ্কা বাটা হয়। এদিকে ঝালে-ঝোলে, ডালে-তরকারিতে আস্ত আস্ত কাঁচালঙ্কা দেওয়া হয়, যেগুলি কেউই খায় না, থালার কোনায় পড়িয়া থাকে। পরিবেশনের পূর্বেই বিভিন্ন ব্যঞ্জনের ভিতর হইতে কাঁচালঙ্কাগুলি আলাদা করিয়া চটকাইয়া লইলে, উহাতে লঙ্কাবাটার কাজ হইয়া যাইবে। অনর্থক খরচ এবং পরিশ্রম হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে।
অপব্যয় লাঘবের বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন, লাউ, মূলা এবং আমের পরিত্যক্ত খোসার সংমিশ্রণে অল্প গুড় দিয়া প্রায় বিনামূল্যে লোভনীয় চাটনি করা যায়।
অথবা, গত দিনের বাসি নিরামিষ তরকারি ফেলিয়া না দিয়া উহা বাসি ডালের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে জল দিয়া সিদ্ধ করিলে সকালবেলায় গরম গরম ভেজিটেবল স্যুপ খাওয়া যায়। সঙ্গে টম্যাটো সস থাকিলে অপূর্ব।
অবশেষে বাঁধাকপির ঘণ্টের কথা বলিতেছি। শীতকালে বাঁধাকপির বাইরের দিকে বড় বড় প্রায় কালো, ঘন সবুজ পাতাগুলি আপনারা ফেলিয়া দেন। ভিতরের পাতাগুলি দিয়া আপনারা তরকারি রান্না করেন।
যে পাতাগুলি বর্জন করেন, উহা কুচিকুচি করিয়া কাটিয়া রৌদ্রে ভালো করিয়া শুকাইয়া লউন। ইহার পর বায়ুনিরোধক একটি কৌটায় ভরিয়া রাখুন। আচার বা আমসত্ত্ব যেরূপ মাঝেমধ্যে রৌদ্রে দিতে হয়, সেইভাবে কয়েকবার ওই বাঁধাকপির শুষ্ক পাতা রৌদ্রে দিতে হইবে।
পরে, বর্ষাকালে রন্ধন করিবার আগের দিন রাত্রিতে এই বাঁধাকপি জলে ভিজাইয়া রাখুন। পরের দিন কলমি শাকের সহিত মিলাইয়া আলুর টুকরো দিয়া পরিমাণমতো নুন, ঘি, গরমমশলা দিয়া ঘণ্ট তৈরি করুন।
খাইয়া দেখিলে বুঝিতে পারিবেন, ইহা সত্যিই কত উপাদেয়।
বলা বাহুল্য, সাপ্তাহিক সুগৃহিণী পত্রিকায় এই রচনা প্রকাশিত হওয়ার পর রীতিমতো হইচই পড়ে গেল। তবে বাঁচোয়া এই যে, লেখাটি বেরোয় নববর্ষ সংখ্যায়, অর্থাৎ বৈশাখ মাসে। তখন আর বড় বাঁধাকপির শীতকালের ঘন সবুজ ডাঁটা কোথায় পাওয়া যাবে, তার জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সেই কুচানো এবং শুকানো বাঁধাকপির পাতার কুচি শাক সহযোগে বর্ষাকালে ঘণ্ট হবে। সে অন্তত ষোলো মাসের ধাক্কা।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই রচনাকে ব্যতিক্রমী চেহারা দেওয়ার জন্য সুশোভনবাবু লেখাটি সাধুভাষায় রচনা করেন। এবং আরেকটি বুদ্ধির কাজ করেন। নিজের নাম সুশোভন পাল বদলে করেন শোভনা পালিত, অর্থাৎ শোভনা পালিত।
পাঠক-পাঠিকা অবাক হবেন না।
রন্ধনপ্রণালীর বিখ্যাত সিরিজ ‘যাহা খাই তাহা ভুল করিয়া খাই’, সেই সিরিজের লেখিকা শোভনা পালিত হলেন অবসরপ্রাপ্ত সহ-অধিকর্তা সুশোভন পাল। আমাদের পালবাবু।
পুনশ্চ: গল্পে পুনশ্চের নিয়ম নেই। কিন্তু একটি খবর দিতে চাই। অবিলম্বে বেস্টসেলার হবে শোভনা পালিতের প্রথম গ্রন্থ রাধি মাছ, না ছুঁই তেল। তৈলবর্জিত মাছ রান্নার ষাটটি পদের সচিত্র রন্ধনপ্রণালী জনপ্রিয় না হয়ে যায় না।
তা যায়নি।
সরকারি অফিস, তার অনেক আইনকানুন। বছর তিনেক স্টপ-গ্যাপ থাকার পরে একদিন টেম্পোরারি হলেন। আবার বছর দুয়েক, এবার কোয়াসি পার্মানেন্ট। অবশেষে একদিন পার্মানেন্ট।
সেই সময়েই পে কমিশন এসে মাইনের স্কেল ভালো করে দিল। তারপর দু-চার দশ বছর অন্তর ছোট ছোট প্রমোশন পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটু মাঝারি গোছের পদস্থ অফিসার হয়ে সুশোভনবাবু রিটায়ার করলেন। সেও প্রায় এক বছর হয়ে গেল।
চাকরি ছোট থেকে মাঝারি, যাই হোক, সারা জীবন ধরে গাধার মতো হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন সুশোভন। অফিসের সবাই বলত, পালবাবু খাটেন খুব।



পাঠকের মন্তব্য