নিউ মার্কেটে ৪০০০ টাকার শার্ট যখন একদামে ৬০০ টাকা বলার পর সাথে সাথে দোকানদার প্যাক করে দেয় তখন আপনিও অন্য সবার মত মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবেন, ইশ! আরেকটু কম বলার দরকার ছিলো। এইভাবে দিয়ে দিলো শার্টটা। শালায় নিশ্চয়ই ঠকাইছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু আপনার একার না, এটা আমাদের জাতীয় অভিজ্ঞতা। ঈদের সময় শপিং করা তো আরো ডেঞ্জারাস। দোকানে দোকানে ঠকে যাওয়ার হাতছানি। এসবের মাঝে যেভাবে শপিং করলে বিজয়ের হাসি শেষ পর্যন্ত আপনিই হাসবেন সেটাই বলে দিচ্ছি আজ। বিফলে এমবি ফেরত।
১. খুব বেশি আগ্রহই দেখাবেন না
নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে গেলে আপনার এটিচিউড হতে হবে এমন যেন আপনি আসলে পাশেই একটা কাজে এসেছিলেন, সময় বেঁচে গেছে বলে মার্কেটে ঢুঁ মারছেন, একটু দেখে নিচ্ছেন। আপনার জীবনের লক্ষ্য আসলে এই শার্টটা কেনা না। আজ না কিনলেও আপনার জীবন থেমে যাবে না, পৃথিবী ঘোরা বন্ধ হবে না, ঈদও বাতিল হয়ে যাবে না। এমন না যে আপনি আসলে কেনার জন্যই দামদর করছেন। পছন্দ হোক বা না হোক এমনিই দাম বলার জন্য দাম বলছেন। এমন ভাব করে ঘুরবেন যেন আপনি আসলে বাংলাদেশের খুচরা বাজারে দরদামের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে বের হয়েছেন।
২. দরদাম শুরু করবেন অযৌক্তিক জায়গা থেকে
মনে করেন আপনি খুব সুন্দর একটা শার্ট পছন্দ করেছেন আর দোকানদার আপনার চোখে চোখ রেখে একটু হাসি দিয়ে বললো ভাই এই শার্টটা ৪০০০ টাকার। এত সুন্দর হাসির ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। যে যুদ্ধে আপনি নেমেছেন সেখানে আপনার বলা দামটাই নির্ভর করবে আপনি জিতবেন না ঠকবেন। দামাদামির শুরুতে লজ্জার মাথা খেয়ে আপনি যদি দশ ভাগের এক ভাগ দাম দিয়ে দামাদামি শুরু করতে না পারেন তাহলে ধরে নিবেন আপনি চলে যাবার পর দোকানের কর্মচারীরা আপনাকে মুরগি ভেবে হাসবে।
৩. বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসতে চান
দরদামে আপনাকে কুপোকাত করে ফেলতে শুরু করলে এক মুহূর্ত সময় অপচয় না করে বের হয়ে আসুন। বলুন নিচ থেকে একটু ঘুরে আসি, বাসা থেকে কল করেছে, ইমার্জেন্সি একটা কাজ করতে হবে, এসব বলে দরদামের মাঝেই ছেড়ে আসতে চান। দেখবেন আপনি বের হয়ে যেতে চাইলেই আপনাকে আটকাবে, লাস্ট কত হলে নিতে পারবেন, এখানেই আসলে খেলে দিতে হবে। এখানে পেনাল্টি মারতে হবে মেসি কিংবা রোনালদোর মত।
৪. একই জিনিস অন্তত পাশাপাশি ৩টা দোকানে জিজ্ঞেস করুন
নিউ মার্কেটে এক্সক্লুসিভ বলে কোনো কিছু নেই। এক দোকানে যা পছন্দ হচ্ছে একটু খোঁজ নিলে পাশের দোকানেও পাবেন। দামাদামিতে না বনলে পাশের দোকানে গিয়ে খোঁজ করবেন আর এইবার স্টার্টিং প্রাইস আরো কম থেকে শুরু করবেন। আপনি যত কমে শুরু করতে পারবেন দোকানদারকে আপনি তত বেশি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন যেমন, তেমনি করে তত বেশি জিতে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে থাকবে।
৫. কখনোই নিজের বাজেট বলবেন না
কখনোই বলবেন না, ভাই ১৫০০ টাকার মধ্যে একটা পাঞ্জাবি দেখান। এই কথাটা বলার সাথে সাথে দোকানদার বুঝে যাবে যে আপনার পকেটে আসলে ১৫০০ না, অন্তত ২৫০০ আছে। তারপর আপনার কাছে পাঞ্জাবি যার দাম চাওয়ার সময় বলবে আসলে ৪০০০ টাকা দাম কিন্তু আপনাকে ২০০০ দিবো, এ নিতে পারবেন। এভাবে আপনার বাজেট আগে বলে ফেলা মানেই আপনি ফেঁসে গেছেন। আপনি কত টাকা খরচ করতে এসেছেন সেটা আইডিয়া করতে পারলে নিউ মার্কেটে আপনি কখনোই দামের সাথে পণ্যের গুণগত মান বজায় রেখে কিছু বাসায় নিয়ে আসতে পারবেন না। দোকানদারকে রাখতে হবে ধোঁয়াশার মধ্যে। আপনি এক মিস্টেরিয়াস মানুষ, তার কাছে এমন ভাব দেখাতে হবে আপনার পকেটে লাখ টাকা আছে কিন্তু নেহাত আপনার পছন্দ হচ্ছে না বলে পাঞ্জাবিটা কিনছেন না।
৬. প্রথম দাম শুনে কোনো রিঅ্যাকশন দিবেন না
১২০০ টাকার পাঞ্জাবির দাম যখন দশ হাজার টাকা শুনবেন তখন এমন ভাব করা যাবে না যে আপনার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আপনি মোটেও অবাক হচ্ছেন না। আপনি জানেন দোকানদার দাম বাড়িয়ে না বললে যেমন বেশি দামে বেচার সুযোগ মিস করবে তেমনি আপনিও দামাদামির মজাটা মিস করবেন। আপনি দাম শুনে শান্ত হয়ে পণ্যটা কোথায় তৈরি, কোন কাপড় দিয়ে তৈরি, গায়ে দিলে কেমন লাগে, রং উঠবে না তো এসব জিজ্ঞেস করবেন। এরপর হঠাৎ করে ঠান্ডা গলায় ৮০০ টাকা অফার করবেন, বেচলে বেচেন, না বেচলে না বেচেন স্টাইলে।
৭. একা শপিং এ যাবেন না
শপিং একা করতে যাবার চেয়ে ৩/৪ জন মিলে শপিং করতে যান। যাই দেখবেন তাতে একেকজন বিভিন্ন মতামত দিতে শুরু করবেন, একজনকে রাখবেন যার কাজই হবে বিভিন্ন নেগেটিভ মন্তব্য করা। আরে এইটার প্যাটার্নটা ভালো না, সুতার মান খারাপ। গোমড়া মুখে সে বিভিন্ন নেগেটিভ মন্তব্য করলে দোকানদার আপনাদের উপর বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। আর দলভারি হওয়ার কারণে আপনি স্ট্র্যাটেজিক্যালি ভালো পজিশনেও থাকবেন।
৮. ভাই, পাশের দোকানে তো কম বলছে
কেনাকাটার শুরুতে একদম প্রথম দোকানে ঢুকেও যদি মনে করেন দাম বেশি চাচ্ছে তাহলে পাশের দোকানের উদাহরণ দিয়ে বলতে হবে যে তারা তো আরো কম বলছিলো, কিন্তু আপনার কাছে পোষায়নি বলে এখানে আসছেন। পাশের দোকানে কম বলেছে যে এইটা বোঝানোর জন্য দরকার হলে দোকান থেকে বের হয়ে যেতে ধরবেন, কারণ কিনলে তো আপনি ওই দোকান থেকেই কিনতে পারবেন। দোকানদারকে ভয়ের ওপর রাখুন।
৯. সবশেষে—হারলেও মুখে হাসি রাখুন
সব সময় যে জিতে আসবেন তার কোনো গ্যারান্টি নেই। গো হারা হারলেও আপনি যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত নিজেকে বোঝাতে পারেন আসলে আপনি জিতেছেন তাহলে কিন্তু মনে খুব বেশি চাপ পড়বে না। দুই দিনের দুনিয়ায় নিউ মার্কেটে কেনাকাটার মত একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খুব বেশি না ভেবে হাসিমুখে বের হয়ে আসুন। যে গোলকধাঁধায় বাঘা বাঘারাও কাবু হয়ে যায় সেখান থেকে যে বের হতে পেরেছেন সেটাই তো বড় কথা, তাই না?



পাঠকের মন্তব্য