সমাজে সবার মাঝে একজন হয়ে বাঁচার মতো সভ্যতা যেহেতু আপনার মধ্যে নাই; বিবর্তনের চক্রে যেহেতু এখনও জেলিফিশ হিসেবে রয়ে গেছেন; সুতরাং আপনাকে শ্রেষ্ঠ, সেরা, প্রথম হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে। সমাজের স্বাভাবিক ধারা বা স্ট্রিমে পড়ে থাকলে কি চলে নাকি! আপনাকে হতে হবে মেইনস্ট্রিম বা মূলধারা। মূলধারা হতে গেলে আপনাকে নিম্ন বর্ণিত উচ্চ নম্বরের সিঁড়িটি পাঠ করতে হবে।
১. বরিশাল, ফরিদপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ যাবতীয় আঞ্চলিক ভাষা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আপনাকে আসাদুজ্জামান নূরের মতো প্রমিত উচ্চারণে বাংলা বলতে হবে। পাঞ্জাবি-ফতুয়া পরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের মতো পরিপাটি হয়ে ঘোরাফেরা করতে শিখতে হবে। কথায় কথায় হাসবেন না; গম্ভীর হতে শিখুন; যাকে তেলাঞ্জলি দিলে দুটি টেকাটুকা উপার্জনের পথ মসৃণ হয়; তার জন্য বিগলিত হাসিটূকু জমা রাখুন।
২. আপনি মেয়ে হলে; আপনাকে মূলধারা হতে আরও পরিশ্রমী হতে হবে। সুবর্ণা মুস্তাফার মতো কাজল চোখ ঘুরিয়ে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে বাংলা বলা শিখতে হবে। জামদানি শাড়ি, মাটির অলংকার, অ আ ক খ লেখা ওড়না, আড়ং-এর চটি পরে আপনাকে সানন্দা পত্রিকার প্রচ্ছদ হয়ে উঠতে হবে। হাসতে হাসতে গম্ভীর হতে শিখতে হবে আপনাকে; হঠাৎ যখন মনে পড়বে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের প্রাবল্য কমে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে; তখন মুখমণ্ডলের জ্যামিতিতে আক্ষেপ এনে বিষণ্ণ হয়ে উঠতে হবে। 'সাজানো গোছানো দেশটাকে এরা শেষ করে দিলো' এই দীর্ঘশ্বাসে 'কাঁদো বাঙালি কাঁদো' বলে উঠতে হবে। তবে মেইনস্ট্রিম হতে গেলে ছেলে-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াতে হবে। ওরা ক্যানাডা-এমেরিকায়; কমপক্ষে নর্থ সাউথে পড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কক্ষনও নয়।
৩. দৈনিক হিরোশিমা ও দৈনিক নাগাসাকিতে আপনার উপসম্পাদকীয় ছাপা হতে হবে। সেজন্য আপনি প্রগতিশীলতার লোক এটা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগতে হবে। এইচএসসি পাশ করার পর; বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গিয়ে অ্যাসথেটিকস বিষয়টা খুব করে শিখে নিতে হবে। সেখানে বাড্ডার আঞ্চলিক ভাষাও মেইনস্ট্রিম। ফলে অধ্যাপক রাজ্জাকের দিব্যি দিয়ে বাড্ডার ভাষায় রুশ সাহিত্য নিয়ে আলাপ তুলতে হবে। লাতিন এমেরিকার কবিতা নিয়ে রেগে রেগে আলাপ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে, চারুকলায় ও ছবির হাটে যারা সমাজ বদলের মশাল হাতে রেগে রেগে আলাপ করে; তাদের শ্রোতা হয়ে ঢুকে তাত্ত্বিক হয়ে বের হতে হবে। সিপিবি অফিসে গিয়ে এক কাপ লাল চা খেলে; প্রগতিশীলতার ঢেউ বয়ে যাবে গোটা শরীরে। এরপর সাম্রাজ্যবাদী এমেরিকার বিরুদ্ধে দুটি শ্লোগান দিয়ে এমন একটা অভিব্যক্তি মুখমণ্ডলে আনতে হবে যে, আপনিই বিশুদ্ধ দেশপ্রেমিক আর সঠিক কাজটি করছেন; বাকি সবাই অপরাধী, সারাক্ষণ ভুল করছে।
৪. আপনার পরিবার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি, মুক্তিযুদ্ধে স্বজন শহীদ হয়নি, প্রতিবেশী দেশে শরণার্থী হতে হয়নি, দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী বাড়ি পুড়িয়ে দেয়নি, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে আপনার বাড়ি লুট হয়নি; সুতরাং আপনাকে মাথায় পতাকা বেঁধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মালিকানা নিয়ে রাগে গজ গজ করতে হবে। অপরিচিত লোকের দিকে রেগে রেগে তাকাতে হবে; কারণ আপনার পরিচিত নয় মানেই লোকটা রাজাকার।
৫. আপনার নানা ও দাদার দাড়ি টুপি ছিল; ফলে প্রগতিশীল হতে গেলে আপনাকে আপনার নানা-দাদার মতো দেখতে লোকদের মৌলবাদি ও জঙ্গী বলতে শিখতে হবে। এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য সমাজের নানা স্তরে প্রগতিশীলতার ঝান্ডা উড়িয়ে বেড়ানো শিবব্রত দাদা রয়েছে। সে জাতিস্মর হিসেবে ইসলাম ধর্মের ছিদ্রান্বেষণের কাজটা বৃটিশ আমল থেকে করে চলেছে। তার কাছে এক সপ্তাহের ক্র্যাশ কোর্স করলে আপনি গেরুয়া প্রগতিশীল হয়ে উঠবেন। আপনার গায়ের রঙ কালো হলে চিন্তা করবেন না। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা ইসলামকে গালি দিলে আপনার গায়ের রঙ ফর্সা হয়ে উঠবে। মনে রাখবেন, ইসলামকে গালি দিলেই আপনি মেইনস্ট্রিম।
৬. আপনি রুশ ও লাতিন সাহিত্য নিয়ে দুকথা বলতে পারেন, এমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী বলে গালি দিতে শিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মালিক আপনি, যাকে তাকে রাজাকার, মৌলবাদি, জঙ্গি বলে গালি দিতে শিখেছেন; কাজেই আপনার কর্মসংস্থানের অনেকগুলো পথ খুলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, স্থানীয় গদি মিডিয়ার সাংবাদিক, এনজিও-র উন্নয়ন কর্মী, দৈনিক হিরোশিমার উপসম্পাদকীয় লেখক, হলোকাস্ট টিভি টকশোর টকার, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে ভাটের আলাপ করার সারিন্দা, প্রণয় ভবনের দাওয়াতের সৎ পাত্র হিসেবে আপনি 'আমাদের লোক' মানে মূলধারার ধারার লোক। তপস্বী অপরাজিতা, আকলিমা নদী, রুপালী সাহা, গোপালী পালের হার্ট থ্রব হিরো হীরালাল হিসেবে আপনাকে তখন আর ঠেকায় কে!
৭. আপনি যে মেইনস্ট্রিমের লোক, এটা ধরে রাখতে আপনাকে ফেসবুকে সক্রিয় থাকতে হবে। নোবেল বিজয়ী ড ইউনুসকে গালি দিলে আপনি যে মেইনস্ট্রিম; সেই সিগন্যাল পৌঁছে যাবে অন্যান্য মূলধারার ডিঙ্গি নৌকাগুলোর কাছে। এনসিপির নেতাদের ফেইক দুর্নীতির খবর প্রচারের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশ লুণ্ঠনের মহামারীর খবরগুলোকে ইকুয়ালাইজ করে আপনি প্রগতিশীলতার জন্য বিকল্পহীন হয়ে উঠেছেন। ইরানের শাসক কত বড় স্বৈরাচার আর সে নারী সমাজকে কী কষ্ট দিয়েছে; তা নিয়ে অবিরাম কথা বলতে হবে। কিন্তু আফঘানিস্তানের তালিবানেরা নারীদের কত কষ্ট দিচ্ছে তা বলার দরকার নাই। কারণ তালিবান এখন শিবব্রত দাদার নয়নের মণি হয়ে পড়েছে। নরেন্দ্র মোদি তেল আভিভে গিয়ে ইজরায়েলকে ফাদারল্যান্ড ডাকার সঙ্গে সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে মাদারল্যান্ড ভারত। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে কীভাবে চলতে হয়, সে তো আপনি ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত চর্চা করেছেন। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক না হয় বাংলায় চালিয়ে নিয়েছেন; ফাদারল্যান্ডের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কিন্তু আপনাকে ইংরেজি শিখতে হবে। মেইনস্ট্রিমে থাকতে গেলে যুগের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে আপ টু ডেট রাখতে হয়।



পাঠকের মন্তব্য