দেখুন, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আপনি যত ধরনের তথ্য-উপাত্ত হাজির করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেননি, উনি বাংলাদেশের বিরোধিতা করবেন কী করে, বেঁচেই তো ছিলেন না তখন, বা উনি প্রচলিত অর্থে জমিদার বলতে যা বোঝায়, তা ছিলেন না, তাতে কোনো লাভ হবে না।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ওদের সমস্যা মূলত দুটো। এক, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু। দুই, একজন হিন্দুর লেখা গান কেন জাতীয় সংগীত হবে। ব্যস, মূল সমস্যাটা এখানেই।
কারণ, ওরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, সেটি একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র, পাকিস্তানের আদলে একটা দেশ, যেখানে মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মের কেউ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে না! শরিয়াহ রাষ্ট্রের নিয়মই এটি! আফগানিস্তান-সোমালিয়ার ধরনই এটি। এসব দেশে অন্য ধর্মের মানুষের কোনো অধিকার নেই। তারা নামমাত্র নাগরিক, থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো কিছুতে নাক গলাবে না। প্রকাশ্যে নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারবে না। এখন ওরকম এক রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত কেন একজন হিন্দুর লেখা হবে? এটা অসম্ভব কল্পনা।
আজ আপনি জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করে দিন, আমি আপনাদের সঙ্গে বাজি ধরে বলতে পারি, ওরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটা টুঁ শব্দও করবে না। আপনি গান করেন, রবীন্দ্র-উপাসনা করেন, দেয়ালে ছবি আঁকেন, যা খুশি করেন; ওদের তাতে কিছুই যাবে-আসবে না। ওদের সমস্যা জাতীয় সংগীতে!
শেখ মুজিবের যেমন 'অপরাধ' পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানানো, যে অপরাধে ওরা মুজিবকে যতভাবে সম্ভব অপদস্থ করতে রাজি, তাঁর নাম-নিশানা মুছে ফেলতে কোনো দ্বিধা করে না; ঠিক তেমনি ওদের কাছে রবীন্দ্রনাথের অপরাধ হিন্দু হওয়া এবং জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হওয়া।
ওরা কারা? এই সংখ্যা বিশাল! প্রায় সবাই মাদ্রাসায় পড়া, এর বাইরে জামাত-শিবির করা, বছরের পর বছর বাংলাদেশবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী মিথ্যা ন্যারেটিভ প্রচারকারী, ইউটিউবে যারা ওয়াজ করে, যারা ওয়াজ শোনে, বামাতি—বিশাল এক গ্রুপ! এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও, যারা রবীন্দ্রনাথকে ঘৃণা করে শুধুমাত্র 'বিধর্মী' তকমা দিয়ে! গত ৫৫ বছর ধরে নিবিড়ভাবে চলা বিশাল প্রকল্পের প্রোডাক্ট এরা!
এখন ওদের কীভাবে প্রতিহত করব আমরা, কীভাবে ওদের ন্যারেটিভ ভাঙব বা ওদের দমন করব, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। অনেক দেরি হয়ে গেছে বলে এই কাজ বড্ড কঠিন! কিন্তু অসম্ভব নয়।



পাঠকের মন্তব্য