শ্রাবণ মাসের থমথমে এক মধ্যরাত। কলকাতার ৩৮/২ এলগিন রোডের দোতলার বড় ঘরটায় মোমের আলো মিটমিট করে জ্বলছে। বাইরে অবিরাম ঝিঁঝি পোকার ডাক আর টিপটিপ বৃষ্টি। কিন্তু ভেতরের পরিবেশটা অন্যরকম; থমথমে, গভীর রহস্যে ঘেরা। ঘরের মাঝে পায়চারি করছেন সুভাষচন্দ্র বসু। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা, গালে কয়েকদিনের গজানো দাড়ি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, ব্রিটিশের এই বন্দিজীবনের শেকল তাঁকে ভেঙে ফেলতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? বাড়ির বাইরে ২৪ ঘণ্টা সিআইডি আর পুলিশের জোড়া চোখ পাহারা দিচ্ছে। একটা মাছি গলারও উপায় নেই। ঠিক তখনই তাঁর মাথায় এল এক অদ্ভুত আর মাস্টারমাইন্ড বুদ্ধি।
তিনি ডেকে পাঠালেন প্রিয় ভাইপো শিশির কুমার বসুকে। ঘরের দরজা বন্ধ করে চুপিচুপি শুরু হলো এক দুঃসাহসিক নাটকের পরিকল্পনা। প্রথম কাজ, ছদ্মবেশ। ধর্মতলার ওয়াছেল মোল্লার দোকান থেকে গোপনে কেনা হলো এক লম্বা কোট, ঢিলেঢালা শালওয়ার আর কুচকুচে কালো ফেজ টুপি। রাধাবাজারের একটা গোপন প্রেস থেকে ছাপানো হলো চতুর এক ভিজিটিং কার্ড। কার্ডে নাম লেখা ‘মহম্মদ জিয়াউদ্দিন, ট্রাভেলিং ইনস্পেক্টর, দ্য এম্পায়ার অব ইন্ডিয়া লাইফ অ্যাসিওরেন্স’।
এরপর শুরু হলো আসল খেলা। সুভাষচন্দ্র বাড়িতে সবাইকে জানিয়ে দিলেন, তিনি কয়েকদিনের জন্য গভীর এক ধর্মীয় নির্জনবাসে যাচ্ছেন। কেউ যেন তার ঘরে না ঢোকে, কোনো ঝামেলা না করে। বিশ্বাস বাড়াতে ভাইঝি ইলা বসু রাতের বেলা সুভাষচন্দ্রের ঘরে আলো জ্বেলে রাখতেন, টেবিলের খাবার নিজেরাই খেয়ে খালি প্লেট বাইরে পাঠানো হতো। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ভাবল, বড়বাবু তো ঘরের ভেতরই আছেন, নিশ্চিন্তে বসে ধোঁয়া ওড়ানো যাক!
১৬ই জানুয়ারি, রাত তখন গভীর। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক একটা পঁয়ত্রিশ।
নিঝুম অন্ধকারে ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন লম্বা কোট আর ফেজ টুপি পরা এক লোক! না, ইনি আর কোনো রাজবন্দি নন, এখন তিনি পুরোদস্তুর মহম্মদ জিয়াউদ্দিন! বাইরে স্টার্ট দিয়ে দাঁড় করানো শিশিরের জার্মান ‘ওয়ান্ডারার’ গাড়িটা। পাহারাদারদের চোখ ধোঁকা দিতে ঘটানো হলো এক দারুণ চতুর ঘটনা। সুভাষচন্দ্র গাড়িতে উঠলেন ঠিকই, কিন্তু দরজায় কোনো শব্দ করলেন না। কেবল ড্রাইভিং সিটে থাকা শিশির নিজের পাশের দরজাটা সশব্দে আটকে দিলেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ভাবল, দূর! গাড়িতে তো কেবল একজনই গেল, সুভাষবাবু তো ওপরে ঘুমোচ্ছেন!
গাড়িটা রাতের কুয়াশা চিরে এলগিন রোড পার হয়ে অ্যালেনবি রোডের দিকে মিলিয়ে গেল।
সারা রাত ধরে চলল এক পাগলাটে ড্রাইভ। ধানবাদের বারারিতে পৌঁছানোর পর, গোমোহ স্টেশন থেকে রাতের কালকা মেইলে চেপে সুভাষচন্দ্র পৌঁছে গেলেন পেশোয়ারে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বিপত্তি বাঁধল ভাষায়। তিনি পশতু বলতে পারেন না। কী করবেন? এবার ধারণ করলেন এক বধির ও বোবা পাঠানের রূপ। যে লোক কথা বলতে পারে না, শুনতে পায় না; তাকে আবার প্রশ্ন কিসের? এরপর কাবুলে গিয়ে ইতালীয় কূটনীতিক কাউন্ট অর্ল্যান্ডো মাজোত্তা সেজে সীমান্ত পার হয়ে সোজা মস্কো, আর সেখান থেকে বার্লিন!
ব্রিটিশ রাজশক্তি যখন টের পেল যে খাঁচা খালি এবং পাখি অনেক আগেই নীল আকাশে ডানা মেলেছে, ততক্ষণে বহু দেরি হয়ে গেছে। ইতিহাস এই দুঃসাহসিক পলায়নকে চেনে 'মহানিষ্ক্রমণ' নামে।



পাঠকের মন্তব্য