ইন্ডিয়া তার আত্মকেন্দ্রিক ও মেগালোম্যানিয়াক বিদেশনীতির কারণে খুব একাকী হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিমানুষের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। যে ভীতি-মিশ্রিত শ্রদ্ধা দাবি করে আশপাশের মানুষের কাছে, সে শেষ পর্যন্ত সবার ঘৃণার পাত্র হয়।
বলিউডের গ্ল্যামার, সিলিকন ভ্যালিতে ইন্ডিয়ার তরুণদের চাকরিপ্রাপ্তি, ডায়াসপোরা সাহিত্যে ইন্ডিয়ার লেখকদের সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক পরিসরে একে পরিচিতি দিয়েছিল।
টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পরে এমেরিকা আফগানিস্তান দখল করেছিল ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে নিজেরই তৈরি করা আফগান মুজাহিদদের এবার সে সন্ত্রাসী নাম দিয়ে সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রবৃত্ত হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগান মুজাহিদ তৈরিতে এমেরিকা পাকিস্তানকে পাশে পেয়েছিল। কিন্তু সেই মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ‘ওয়ার অন টেরর’ চালানোর সময় পাকিস্তানের হাফ-হার্টেড এফোর্টস লক্ষ্য করে এমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন মিত্র খোঁজে ইন্ডিয়ার মাঝে।
ইন্ডিয়ার নেতা নেহেরু ও আবুল কালাম আজাদের যৌথ প্রচেষ্টায় ইন্ডিয়ার শিক্ষা ও শিক্ষকদের একটি সুনাম তৈরি হয়েছিল পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। সে কারণেই এমেরিকা আফগানিস্তানে ইন্ডিয়ার শিক্ষকদের শিক্ষা বিস্তারে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গে যেভাবে হিন্দু শিক্ষকেরা শিক্ষক হিসেবে সোশ্যাল কালচার পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন, আফগানিস্তানেও সেরকম লক্ষ্য নিয়ে ইন্ডিয়ার শিক্ষকেরা কাজ শুরু করেন। আফগানিস্তানের মেধাবী ছেলেমেয়েরা ইন্ডিয়ায় পড়তে আসে। নেহাত পশ্চিমবঙ্গে পড়তে না আসায় আর বাংলা ভাষা শিখতে না পারায় তারা ফিরে গিয়ে কালচারাল সংগঠন খুলতে পারেনি।
ইন্ডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণে শিক্ষার ওপর জোর থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রতিটি শিশুর কাঁধে কালচার রক্ষার সিসিফাসের পাথর বেঁধে দেওয়া হয় না। এ কারণে পূর্ববঙ্গের মতো কালচারাল উইং এখনো গড়ে উঠতে পারেনি আফগানিস্তানে। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে নিজের দেশের চেয়ে ইন্ডিয়াকে বেশি ভালোবাসা কালচারাল প্রজন্ম গড়ে উঠলে তাতে অবাক হব না।
তবে ইন্ডিয়ান শিক্ষকদের সফট পাওয়ারের কারণে দিল্লির সাউথ ব্লক আফগানিস্তানে তাদের হার্ড পাওয়ার নির্মাণ করেছে। এত সংখ্যক ইন্ডিয়ান কনসুলেট গড়ে উঠেছে সেখানে, যা অস্বাভাবিক।
এমেরিকার দক্ষিণ এশীয় বন্ধু হিসেবে ইন্ডিয়া বাংলাদেশের দেওয়ানি লাভ করলে প্রণব মুখার্জি ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে ঢাকা বিজয় করেন। তার নিজ হাতে পলিটিক্যাল গ্রুমিং করা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতা গ্রহণ করলে শতবর্ষ ধরে গড়ে তোলা কালচারাল উইং ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি প্রথা নবায়ন করে।
ইন্ডিয়াকে বাংলাদেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শায়খ আবদুর রহমানকে দিয়ে জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ গড়তে হয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ফিরে আসা সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই তার বেকার জীবনে জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশের মাধ্যমে দোলা জাগান।
ইন্ডিয়ার চেতনার রঙে তৈরি কতিপয় মিডিয়া ‘জঙ্গি’ শব্দটিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ললাটে এঁকে দেয়। বিএনপি সরকারের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে জামায়াতুল মুজাহেদিনের শীর্ষ নেতাদ্বয় গ্রেফতার হন; তাদের শক্তি খর্ব হয়। কিন্তু ইন্ডিয়ান কালচারাল উইং আওয়ামী লীগের আমলে ঘটা উদীচী ও ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, বিএনপি আমলে ঘটা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার গল্পগুলো গানে গানে, নৃত্যে ও কোরিওগ্রাফিতে, উপসম্পাদকীয় কিংবা ফিকশনে, আকর্ষণীয় কার্টুনে আর সংস্কৃতি আড্ডায় প্রতিদিন বলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিধানে ইন্ডিয়াকে লাগবেই—এমন ‘এসো এসো’ সুরে করুণ মিনতি-মাখা পটভূমি তৈরি করে।
এমেরিকা তখন আফগানিস্তানে নিজেদের তৈরি করা ফ্র্যাংকেনস্টাইন মুজাহিদদের হাতে মার খাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের ‘ওয়ার অন টেরর’ সে ছেড়ে দেয় ইন্ডিয়ার হাতে। আর আফগানিস্তানে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আইএস (খোরাসান)-এর মতো গ্রুপগুলোর খোরপোষের দায়িত্ব ইন্ডিয়া হাতে তুলে নেয়।
‘চীনের উইঘুর মুসলমান মার খাচ্ছে’—এই অনুভূতিতে দোলা দিয়ে কিংবা পাকিস্তানে টিটিপি মার খাচ্ছে—এই অনুভূতি আরও ঘন করে ইন্ডিয়া তখন অত্র এলাকার ছোটখাটো এমেরিকা হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে পাকিস্তানের একটি স্কুলে সন্ত্রাসী হামলায় অসংখ্য শিশুর মৃত্যুর পর সেখানে নাগরিক সমাজের দাবির মুখে সর্বত্র সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান চলতে থাকে। ফলে পাকিস্তানে অবস্থানরত টিটিপি সন্ত্রাসীদের আফগানিস্তানে পালিয়ে যেতে হয়। পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি মনিটরিংয়ের অধীনে নিতে হয় ফ্রান্সভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্থা এফএটিএফের চাপে।
পাকিস্তানে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আফগানিস্তানে এমেরিকার উপস্থিতির বিপক্ষে অবস্থান নেন। এমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তখন আফগানিস্তানের অনন্ত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অর্থ অপচয় করতে নারাজ ছিলেন।
এমেরিকা তড়িঘড়ি করে বিদায় নিলে আফগানিস্তান থেকে ইন্ডিয়াও আপাতত বিদায় নেয়। কিন্তু ক্ষমতায় আসা তালেবানরা ইন্ডিয়ার শিক্ষকদের পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার ফিরে এসে শিক্ষাদানের অনুরোধ জানায়। এমেরিকা বিদায় নিলে ইন্ডিয়া ধীরে ধীরে আফগানিস্তানে শিক্ষা-উপনিবেশ গড়ে। আর বেকার হয়ে যাওয়া টিটিপি-আইএস (খোরাসান)-এর ভরণপোষণের দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় দিল্লির সাউথ ব্লক।
আফগান মন্ত্রীরা দিল্লি সফরে এলে পুষ্পবৃষ্টিতে তাদের স্বাগত জানানো হয়। তালেবানদের পছন্দ দেওবন্দের দর্শন। ফলে সেখানেও পুষ্পবৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশেও একই দর্শনে বিশ্বাসীদের একটি অংশ ইন্ডিয়ার অভিভাবকত্বে সক্রিয় হতে থাকে। ফ্যাসিজম টিকিয়ে রাখতে হাসিনা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ইসলামপন্থীদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে শিকার করতে থাকেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরের ইন্ডিয়াঘনিষ্ঠ ইসলামপন্থীদের গোয়েন্দা সংস্থার অভিভাবকত্বে নির্দলীয় নাগরিক সমাজকে ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহার করতে থাকে।
ব্লগার কিলিংয়ের মতো ঘটনায় নির্দলীয় নাগরিক সমাজ প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর পালিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছেন, যারা এখন হাসিনা পতনের জন্য সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন, এরাই ওই জঙ্গি পুতুলনাচের পাপেট মাস্টার হিসেবে কাজ করেছেন।
জুলাই বিপ্লবের পর নিয়মতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী ইসলামপন্থীরা মন্দির ও পূজামণ্ডপ পাহারা দিয়েছেন। চট্টগ্রামে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নিহত আইনজীবী আলিফের পিতা জানাজায় দাঁড়িয়ে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন। এভাবে হাসিনা পতনের পর শাহবাগে জড়ো করা হিন্দুত্ববাদী বজরঙ্গি, ইন্ডিয়ার গদি মিডিয়ার সমস্ত উসকানি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ সমাজ ঐক্যবদ্ধ থেকেছে।
এখন গোয়েন্দা সংস্থায় নতুন প্রজন্মের দেশপ্রেমিক তরুণেরা কাজ করছেন। তারা নিবিড় তদন্ত করলে ঠিকই ধারাবাহিক মাজার ভাঙার উসকানির পেছনে নিয়মতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতির বাইরের ইন্ডিয়ার অভিভাবকত্বে থাকা তালেবানপন্থীদেরই খুঁজে পাবেন বলে ধারণা করি।
সম্প্রতি একটি জাতিসংঘ রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে মাত্র একবার বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হওয়ার পর যেসব ইন্ডিয়াঘনিষ্ঠ মিডিয়া ‘জঙ্গি’ শব্দটি ঘন ঘন বলে, ২০০১-০৬-এর বাসি প্রোপাগান্ডা ফাস্টফুড মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করে ফুঁ দিয়ে খেতে চেষ্টা করছেন, তাদের গ্রিক চিন্তক হেরাক্লাইটাসের উদ্ধৃতি স্মরণ করতে হবে—কেউ একই স্রোতে দুবার সাঁতার দিতে পারে না।
দিল্লির সাউথ ব্লক ও গদি মিডিয়া যখন ‘আল-কায়েদা ইন্ডিয়ান সাবকনটিনেন্ট’-এর গল্পটি দিয়েছে, তারা হয়তো খেয়াল করেনি, একবিংশ শতকের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পরিসরে ইন্ডিয়ান সাবকনটিনেন্ট শব্দটি সাউথ এশিয়া হিসেবে প্রচলিত। কথিত ‘অখণ্ড ভারত’-এর স্বপ্নগ্রস্ত লোক ছাড়া ভারতবর্ষ বা ইন্ডিয়ান সাবকনটিনেন্ট শব্দটি আর কেউ ব্যবহার করে না।
এখন পশ্চিমা বিশ্বের সব মিডিয়া ও পলিসি মেকাররা জানে, দক্ষিণ এশিয়াতে জঙ্গি ও বজরঙ্গি—এই দুটি কট্টর গোষ্ঠীর পাপেট মাস্টার ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা। বজরঙ্গি ‘বাংলাদেশ একদিন অখণ্ড ভারতের অংশ হবে’ বললে, জঙ্গি ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’-এর কথা বলবে।
এই যে পান্ডুলিপি, উসকানি ও প্রতিক্রিয়ার এই যে সাজানো নাটক, তাকে ইন্ডিয়ার গদি মিডিয়া ও বাংলাদেশের ইন্ডিয়াঘনিষ্ঠ মিডিয়া দিয়ে যতই তাওয়া গরমের কাজে ব্যবহার করা হোক, তাতে পরোটা ভাজার মাহেন্দ্রক্ষণটি আর আসবে না।
কাজেই ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ও গদি মিডিয়ার এই পরাগায়নে ‘অখণ্ড ভারত’ ফুল আর ফুটবে না; ফুল আর কখনোই ফুটবে না।



পাঠকের মন্তব্য