ঘুরে ফিরে জ্বালানির গাড়ি, আবার কেন ফুলবাড়ি?

১২১ পঠিত ... ১৭:৪১, আগস্ট ১৭, ২০২৬

বিদ্যুতের চরম সংকট, গ্যাসের শূন্য থালা আর আমদানির চড়া মাশুল—তিন চাকাতেই যখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের গাড়ি পথ হারিয়েছে, ঠিক তখনই সরকার পুরোনো এক সিন্দুক খুলে দেখতে চাইছে—ফুলবাড়ির কয়লা।

সম্প্রতি বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হয়। দিনাজপুরের ফুলবাড়ি খনি থেকে যদি কয়লা তোলা যায়, তবে বছরে মিলতে পারে প্রায় দেড় কোটি টন। অর্থাৎ, আমদানির প্রায় ৭৫ শতাংশ কয়লার চাহিদাই মেটানো সম্ভব হবে দেশীয় উৎস থেকে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চায় সরকার—বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর চড়া চাপ কিছুটা কমানো।

এই পরিকল্পনা কিন্তু হাওয়ায় ভেসে আসা কোনো কথা নয়; এটি যুক্ত হচ্ছে সরকারের প্রস্তাবিত ১০ বছর মেয়াদি নতুন জ্বালানি নীতির সঙ্গে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অ্যামচেমের এক সভায় স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এখন কয়লা উত্তোলনের দিকে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। তাই ফুলবাড়িসহ অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে (Open-pit mining) কয়লা তোলার কথা ভাবতে হচ্ছে।’

তিনি জানান, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি প্রকাশ্যে আসবে এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির মিশ্রণ (Energy Mix) নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সংকটটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষমতা ৭,৩১২ মেগাওয়াট, যার সিংহভাগই চলে বিদেশি কয়লায়, একমাত্র বড়পুকুরিয়া ছাড়া। অন্যদিকে, ১২,৪৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকের বেশি এখন অলস বসে আছে স্রেফ গ্যাসের অভাবে।

এর সঙ্গে আগুনে ঘি ঢেলেছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কাতার ও স্পট মার্কেটের এলএনজি (LNG)-র ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত এবং যুদ্ধে উত্তাল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতার কারণে কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ থমকে যায়। বাধ্য হয়ে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে কোষাগার খালি হওয়ার জোগাড়। আর তার সরাসরি মাশুল গুনছে দেশের শিল্পকারখানা ও আমজনতা—লোডশেডিং আর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কড়া অনুশাসনে।

সব মিলিয়ে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে সত্যি, কিন্তু তাই বলে সংকট কাটাতে ফুলবাড়ির উন্মুক্ত খনিকে মহৌষধ মনে করার আগে ২০০৬ সালের রক্তভেজা ইতিহাসটা একবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।

সে বছর ‘এশিয়া এনার্জি’র উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন ফুলবাড়ির হাজার হাজার মানুষ। তাদের ভয়টা কোনো অমূলক কল্পনা ছিল না—কৃষিজমি, ভিটেমাটি, ভূগর্ভস্থ পানি আর বাপ-দাদার ভিটার অস্তিত্ব হারানোর ভয়। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে তিনজন প্রাণ হারান, আহত হন শত শত মানুষ। সেই আন্দোলনই ইতিহাসে ‘ফুলবাড়ি ট্র্যাজেডি’ হিসেবে দাগ কেটে আছে।

ফুলবাড়ির সমীকরণটা তাই স্রেফ কয়লা বেচাকেনার নয়; এটা একটি পুরো অঞ্চলের ভৌগোলিক রূপ আর মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অস্তিত্বের প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞ সমীক্ষাগুলো বলছে, উন্মুক্ত খনি থেকে কয়লা তুলতে হলে ভূগর্ভস্থ পানি অবিরাম পাম্প করে বের করে দিতে হবে। সরকারি বিশেষজ্ঞ কমিটির ২০০৬ সালের মূল্যায়নেই আশঙ্কা করা হয়েছিল, এর ফলে প্রায় ৩১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাবে। পরের সমীক্ষাগুলোতেও উঠে এসেছে একই অশনিসংকেত—পানি ও কৃষির চরম বিপর্যয়।

সঙ্গে আছে বিপুল জমি অধিগ্রহণের ধাক্কা। মূল প্রস্তাবে প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা অধিগ্রহণের কথা ছিল, যার বেশির ভাগই তিন ফসলি উর্বর কৃষিজমি। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও তখন সতর্ক করেছিলেন যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপুল জনগোষ্ঠী রাতারাতি বাস্তুচ্যুত হবে এবং পুরো অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

সবচেয়ে বড় স্থায়ী ক্ষতটা তৈরি করবে পরিবেশদূষণ। একটানা পাম্পিংয়ের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য তো নষ্ট হবেই, তার ওপর সালফারসমৃদ্ধ খনিজ উপাদান থেকে তৈরি হবে ‘অ্যাসিড মাইন ড্রেনেজ’ (Acid Mine Drainage)। এই অ্যাসিডিক বিষ মাটি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে তা শুধু খনি এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—দীর্ঘমেয়াদে বিষাক্ত করে তুলবে আশপাশের কৃষিজমি, মাছ, বনভূমি এবং মানুষের পানীয় জল।

তাহলে কি জ্বালানি সংকটের এ দিনে মাটির নিচের সম্পদ স্রেফ ফেলে রাখা হবে? উত্তরটা এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারে অর্থনৈতিক যুক্তি অবশ্যই আছে, কিন্তু ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি করা ছাড়া ‘আর কোনো বিকল্প নেই’—এই যুক্তি মেনে নেওয়া যায় না।

কারণ, যেকোনো জ্বালানি প্রকল্পের লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু কয়লার টন বা বেঁচে যাওয়া ডলারের অঙ্কে মাপা বিপজ্জনক। জমি হারানোর সামাজিক মূল্য, কৃষির ধসের অর্থনৈতিক ক্ষতি, পানির হাহাকার, পরিবেশ পুনর্গঠনের চড়া মাশুল আর রাজপথের সম্ভাব্য সংঘাত—এগুলোর খরচও সেই অঙ্কে যোগ করতে হবে।

তাই ফুলবাড়ি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং তৃতীয় কোনো পক্ষকে দিয়ে করানো পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা (EIA/SIA)। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমও ঠিক এই নিরপেক্ষ সমীক্ষার তাগিদ দিয়েছেন।

জ্বালানি সংকট নিঃসন্দেহে এক কঠিন বাস্তবতা, কিন্তু সেই বাস্তবতার দোহাই দিয়ে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট ডেকে আনা কোনো বুদ্ধিমত্তা নয়। ২০০৬ সালের রক্তঝরা আন্দোলন আজকের নীতিনির্ধারকদের জন্য স্রেফ স্মৃতিচারণের বিষয় নয়, এটি একটি জীবন্ত সতর্কবার্তা।

জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অর্থনীতি, পরিবেশ, পানি, খাদ্য আর মানুষের মৌলিক অধিকার—সবকটিকে একই পাল্লায় মাপতে হবে। তা না হলে আজকের বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে গিয়ে আমরা আগামী দিনের পানি, খাদ্য আর জীবন-জীবিকাকে এক চিরস্থায়ী অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেব।

১২১ পঠিত ... ১৭:৪১, আগস্ট ১৭, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top