১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুটাতে লাহোর শহরটায় বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়েছিল। চারদিকে চাদর মুড়ি দেওয়া চেনা-অচেনা সব মানুষের ব্যস্ততা, আর রাজনীতির মাঠের বড় বড় হর্তাকর্তাদের গম্ভীর ফিসফাস। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে বিরোধী দলগুলো একজোট হয়ে একটা সম্মেলনের ডাক দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকেও একদল মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে এসে নামলেন সেই অচেনা শহরে। তাঁদের দলের প্রধান মানুষটি বেশ দীর্ঘদেহী, চশমার মোটা ফ্রেমের আড়ালে তাঁর চোখে সারাক্ষণ এক অদ্ভুত স্বপ্নের আনাগোনা, আর আঙুলের ফাঁকে ধরা বিখ্যাত সেই চুরুটের পাইপ। সম্মেলন কক্ষের মূল টেবিলে যখন সবাই নিজেদের আখের গোছানোর হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত, ঠিক তখন তিনি পকেট থেকে বের করলেন একটা ভাঁজ করা কাগজ। হালকা একটু কেশে শান্ত কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বললেন, দেশের এই সংকটকালে লাহোর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি আমার কাছে ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি আছে।
সেই দাবিগুলো যখন একে একে পড়া হতে লাগল, তখন সম্মেলন কক্ষের তাপমাত্রা যেন মুহূর্তের মধ্যে হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল। প্রস্তাবগুলো ছিল এক সত্যিকারের যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ার, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে শুধু প্রতিরক্ষা আর পররাষ্ট্র নীতি, আর বাকি সব ক্ষমতা থাকবে প্রদেশগুলোর নিজের হাতে। দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থা কিংবা পূর্বের টাকা পশ্চিমে পাচার রোধের সাংবিধানিক গ্যারান্টি, প্রদেশগুলোর নিজস্ব কর আদায়ের অধিকার, বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বাধীন হিসাব এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের দাবিগুলো শুনে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। চারদিকের মৃদু গুঞ্জন হঠাৎ করেই তীব্র চিৎকারে রূপ নিল; বাঘা বাঘা নেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, এ তো দেশ ভাঙার প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র, এই লোক নির্ঘাত বিচ্ছিন্নতাবাদী।
প্রস্তাবটি সেখানে পাত্তাই পেল না, কিন্তু সেই দীর্ঘদেহী মানুষটির ভেতরের জেদ আর প্রত্যয় ছিল একদম অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি কোনো হট্টগোলে না জড়িয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু এক চিলতে রহস্যময় হাসি নিয়ে সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন এবং পরদিনই ডেকে বসলেন এক জনাকীর্ণ প্রেস কনফারেন্স। সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, এই ছয়টি দফা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী খেয়াল নয়, এটি সাড়ে সাত কোটি শোষিত বাঙালির পুরোপুরি বেঁচে থাকার দাবি, আমাদের মুক্তির ঐতিহাসিক সনদ। লাহোরের মাটিতে উপেক্ষিত হয়ে তিনি যখন ঢাকায় ফিরে এলেন, তখন দিনটি ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি—বাঙালির ভাষা শহীদদের স্মরণের দিন। সেই দিনই দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে এই ৬ দফাকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়ে আন্দোলনের এক মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলো।
মার্চ মাস আসতেই শুরু হলো এক জাদুকরী অধ্যায়। সেই নেতা আর ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রইলেন না, ঢাকার পল্টন থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দান কিংবা খুলনার হাদিস পার্ক—সবখানে ছুটে বেড়াতে লাগলেন ঝড়ের গতিতে। যেখানেই তাঁর পা পড়ছে, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এসে জমা হচ্ছে তাঁর কথা শোনার জন্য। গ্রামের যে সরল চাষাভুষো মানুষটি কোনোদিন অর্থনীতির জটিল মারপ্যাঁচ বোঝেনি, সেও এই কথাগুলো শুনে গামছায় চোখ মুছে বলতে লাগল, এতদিনে আমাদের মনের কথা কেউ একজন ঠিকঠাক বলতে পেরেছে। শাসকগোষ্ঠীর সিংহাসন তখন কাঁপতে শুরু করেছে; তারা বুঝতে পারল এই মানুষটাকে এভাবে ছেড়ে দিলে তাদের তখত-তাউস ধুলোয় মিশে যাবে। চারদিকে শুরু হলো তীব্র ধরপাকড় আর কঠোর নিষেধাজ্ঞা, কিন্তু ততক্ষণে এই বাংলার মাটির গভীরে এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটতে শুরু করেছে, যা ওপর থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণের অপেক্ষায় দিন গুনছিল। আর এই থমথমে পটভূমিতেই ঘনিয়ে আসছিল এক ঐতিহাসিক জুন মাস।
২
মে মাসের চড়া রোদ আর গুমোট গরম পার হয়ে যখন ১৯৬৬ সালের জুন মাসটা এলো, তখন পুরো বাংলার আকাশে মেঘের চেয়েও ভারী হয়ে জমেছিল এক অদ্ভুত রাজনৈতিক অস্বস্তি। মে মাসের শুরুতেই সেই দীর্ঘদেহী চশমা পরা মানুষটাকে বন্দি করা হয়েছে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে, কিন্তু তাঁর দেওয়া ওই ছয়টি দফা ততদিনে সাধারণ মানুষের মগজে আর রক্তে মিশে গেছে। ঢাকার রাজপথ, চায়ের দোকান আর কারখানার শ্রমিকদের আড্ডায় তখন একটাই ফিসফাস—আওয়ামী লীগ ৭ই জুন পুরো দেশজুড়ে হরতাল ডেকেছে। শাসকগোষ্ঠী ভাবল, মূল নেতা যখন খাঁচায় বন্দি, তখন সামান্য কিছু হুমকিতেই এই আন্দোলন বাতাসে কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। তাই তারা রাস্তায় নামাল পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনী আর ভারী বুট পরা সৈন্যদের। কিন্তু তারা বাঙালির ভেতরের ওই শান্ত জেদটাকে চিনতে ভুল করেছিল।
৭ই জুনের সকালটা শুরু হয়েছিল এক অন্যরকম স্তব্ধতা দিয়ে। দোকানপাট বন্ধ, চাকা ঘুরল না কোনো যানবাহনের। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথেই সেই স্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ আর টঙ্গীর রাজপথে। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, কলকারখানার শ্রমিক আর চটপটে ছাত্ররা দলে দলে এসে দাঁড়াল বুলেটের মুখোমুখি। দুপুরের দিকে তেজগাঁও স্টেশন এলাকায় যখন মিছিলের ওপর পুলিশের রাইফেলগুলো গর্জে উঠল, তখন বাতাসে বারুদের গন্ধের সাথে মিশে গেল তাজা রক্তের ঘ্রাণ। মনু মিয়া নামের এক সাধারণ শ্রমিক পিচঢালা তপ্ত রাস্তায় লুটিয়ে পড়লেন, তাঁর বুকের রক্তে ভিজে গেল বাংলার মাটি। শুধু মনু মিয়া নন, শফিক, শামসুল হকসহ একে একে ১১ জন মানুষ সেই রাজপথে নিজেদের জীবন ঢেলে দিলেন।
এক অদ্ভুত নীরবতা আর হাহাকার নেমে এলো পুরো শহরে, কিন্তু সেই হাহাকার পরক্ষণেই রূপ নিল এক তীব্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গে। শত শত মানুষকে আহত আর গ্রেপ্তার করেও সেই দিন মানুষের ভেতরের ক্ষোভকে দমিয়ে রাখা গেল না। শাসকগোষ্ঠী ভেবেছিল রক্ত ঝরিয়ে তারা ভয় পাইয়ে দেবে, কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে এই ১১ জন শহীদের রক্ত আসলে ৬ দফাকে কাগজের দলিল থেকে বের করে প্রতিটি বাঙালির ঘরের দেওয়ালে একটা অলিখিত প্রতিজ্ঞার মতো সেঁটে দিয়েছে। ৭ই জুনের সেই রক্তক্ষয়ী হরতাল প্রমাণ করে দিল, এই আন্দোলন আর কোনো ড্রয়িংরুমের রাজনীতি নয়, এটি এখন গণমানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।
কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর বসে সেই চশমা পরা নেতা যখন এই খবর পেলেন, তাঁর চোখ দুটো নিশ্চয়ই অশ্রুতে আর গৌরবে চকচক করে উঠেছিল। এরপর ইতিহাস আর থামেনি। এই ৭ই জুনের ওপর ভর করেই পরবর্তীতে এসেছে '৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, '৭০-এর নির্বাচন, আর সবশেষে ১৯৭১ সালের সেই রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ। জুনের সেই তপ্ত দিনে ঢাকার রাজপথে যে রক্তের দাগ লেগেছিল, সেই দাগটাই আসলে পাঁচ বছর পর একটা স্বাধীন দেশের মানচিত্র হয়ে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করেছিল। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে তাই ৭ই জুন এক অমর, অবিনশ্বর স্মারক হয়েই রয়ে গেল।



পাঠকের মন্তব্য