জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। এক রাজপ্রাসাদ।
বড় ব্যস্ততা দেখা যায় এখানে। কত কত লোক আর তাদের কত শত কাজ! বাড়ির কর্তাগণ, গিন্নিমাতাগণ, ভ্রাতা-ভগ্নীগণ, ছোট শিশুগণ- আলাদা মহাপ্রাণ, আলাদা জীবন আর আলাদা আলাদা জগৎ তাদের প্রত্যেকের।
এরই মাঝে দেখা যাচ্ছে একটি অতি দুরন্ত শিশুকে। তারও কিন্তু আলাদা ক্ষুদ্রপ্রাণ, আলাদাই চিন্তা আর কল্পনার জগৎ! তার সে জগতের 'রবি' সে নিজেই।
বড্ড দুরন্ত এই শিশু! সারাদিন তার শিশুমাথায় ঘুরছে কত কি চিন্তা। নিজমনে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় শিশু, আজ সে দেখে এসেছে গাছের ডালে পাখির বাসায় এসেছে নতুন শিশু। কিচিরমিচিরে জীবন ভরে আছে তাদের। কিন্তু এই অসামান্য খবর তাকে পেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। বলবার কেউ নেই হাতের কাছে। আছে এক মান্যদা দাসী। তাতে সেটা আবার খুবই ব্যস্ত। হাতে তার রাজ্যের কাজ। তবু্ও শিশু খানিকক্ষণ তার পিছে পিছেই ঘুরে বেড়ালো।
ও মানু, শোন না। ঐদিকে ঐ পেয়ারা গাছে না জানিস...
ও ছোড়দাবাবু গো, আমারে ইবার ইট্টু ক্ষ্যামা-ঘিন্না দ্যাওদিনি। দেকতিছ না কাজ কত্তি কত্তি যে হেদোয় মরতিছি। সোনা ছোড়দাবাবু আমার, ইট্টু উদিকে গিয়ে চুপ কইরে বসদিনি। হাতের কাজখান শেষ হলি আপুনারে ধুয়ায়ে মুছায়ে খাতি দিতি হবি আমার। ম্যালা কাজ পড়ে রয়েছে।
শিশু রেগে গেল।
তুই কোন কাজের না রে মানু। একটা কি কথা বলচি আগে শুনে তো তো নিবি। তা না আগেই শুধু ফ্যাচ ফ্যাচ।
গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দূরে গিয়ে বসে রইল শিশু। কিন্তু কেউ তাকে আর উঁকি দিয়ে দেখে গেল না। কিছুক্ষন পর সে নিজেই নিজের রাগের কথা ভুলে গেল। তার মন পড়ে রইল পেয়ারা গাছটার ডাসা ডাসা পেয়ারায় আর তার চার বাসিন্দায়। আচ্ছা, পাখির ছানা কি পেয়ারা খেতে পারে? পেয়ারার যে শক্ত বীজ, ওদের গলায় আটকে যায় না? একেকটা যে ক্ষুদে! বড্ড আদুরে দেখতে!
শিশু আপনমনে হাসলো। তক্ষুনি ফটকের বাইরে গাড়ির শব্দ হওয়ায় তিনবছরবয়সী শিশু দৌড়ে গেল সেদিক। নিশ্চয়ই সোমেনদাদা আর সত্য(সম্পর্কে ভাগ্নে) এসেছে। তারা বিদ্যালয়ে যায়। এখন তাদের কাছে গেলেই তাদের স্কুলের অনেক মজার গপ্পো পাওয়া যাবে আর তাদেরকেও তো পাখি-পরিবারটির কথা জানাতে হবে।
সোমেনদাদা আর সত্য এত মজার গল্প করে যে তার শুধুই স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে। আজ ওরা এসে বললে, তাদের স্কুলে নাকি খেলা হবে, গান কবিতা ও হবে। শিশুর প্রাণ নেচে উঠল।
সে চুপ করে সুযোগের অপেক্ষায় রইল। আজ বিকেলে মাস্টারমশাই এলে তাঁকে বলতে হবে সেও যেতে চায় স্কুলে। আগেও সে একথা বলেছে মাস্টারমশাইকে। তিনি কিছু তো করেনই না, শুধু বিরক্ত হন।
বিকালে যথাসময়ে মাস্টারমশাই এলেন। তাকে পাঠ করতে দিয়ে তিনি কাঠি দিয়ে মহামনোযোগে কান চুলকোতে লাগলেন। কিন্তু পাঠে রবির মন নেই। আজ যে করেই হোক তাকে স্কুলে যাবার ব্যপারটা মাস্টারমশাইকে দিয়ে পাকা করাতেই হবে। সবার এই মজা আছে, শুধু তার নেই। কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না গো!
পাঠ নিয়ে গড়িমসি করতে করতে একসময় সে মাস্টারমশাইকে বলে বসল,
ও মাস্টারমশাই! নিত্য সোমেনদাদা আর সত্যটা স্কুলে যাচ্ছে আর কতকি পড়ে-শুনে, জেনে-শিখে আসছে। শুধু আমি একাই কি এখানে পড়ে থাকব?
মাস্টারমশাই বিরক্ত হলেন। এই ছোড়া দুদিন পরপর একই গান গাইছে। তিনি যতই বলেন এখনও সময় হয় নি, তবু সেকথা তার মাথায় ঢোকে না। আজও তিনি বিরক্ত সুরে বললেন,
যা পাঠ দিয়েছি তা হয়েছে?
রবি মুখখানি কাঁচুমাচু করলে। হয়নি তো। মাস্টারমশাই রেগে গেলেন। তাকে যা-তা বলে বকে দিলেন। রবি কেঁদে ফেলল। কেউ তাকে স্কুলে যেতে দিতে চায় না। রবির ক্রন্দনে গৃহশিক্ষক মাধব পণ্ডিত ভয়ানক অতিষ্ঠ হয়ে রবিকে চপেটাঘাত করে বললেন,
‘এখন স্কুলে যাওয়ার জন্য যে রকম কান্নাকাটি করছ, পরে না যাওয়ার জন্য আরও বেশি কাঁদতে হবে।’
গৃহশিক্ষকের এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলতে শুরু করেছিলো অল্পদিনের মধ্যেই। তা সে গল্প কিছু পরের। আপাতত আমাদের ছোট্ট রবিবাবুকে মাত্র চার বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হল। সে মহানন্দে স্কুলে যাওয়া শুরু করল।
কিন্তু তার যে স্বপ্নের স্কুল ছিলো তার সাথে বাস্তবের স্কুলের কিছুই মিলল না। সে সেখানে শিক্ষাপ্রণালীর চেয়ে বেশি দেখল শাসনপ্রণালি! তার মন খারাপ হল। সারাদিন শিক্ষকগন তাদের রাগ করেন, বকেন। ক্লাসে পড়া না পারলে ছাত্রকে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে ক্লাসের অনেকগুলো শ্লেট তার হাতে চাপিয়ে দেন।
শুধু নিজেরা ছাত্র হয়ে শাস্তিভোগ করবে এই নিয়ম রবির পছন্দ হল না। তাই সেও নিজবাড়িতে স্কুল খুলে বসলো। তার স্কুলের পোড়ো হল তাদের বাড়ির বারান্দার রেলিংগুলো। খুব করে তাদের পড়িয়ে, দুষ্টমি করলে বকে, বেত্রাঘাত করে মনখারাপ দূর করার তাগিদে দুপুরগুলো তরতরিয়ে কেটে যায় রবির।
কিছুদিনের ভেতর এই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হল রবির। 'গভর্নমেন্ট পাঠশালায়' আবারও তাকে শিশুশ্রেনিতে ভর্তি করা হল। কিন্তু স্কুল নিয়ে শিশুমনের মোহভঙ্গ হল।
তাই প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় যশের ছাপ তার কোনদিন এলো না। একদিন যিনি হবেন বাঙ্গলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট তাকে কি নিয়মের বেড়িতে বাধা যায়?
বাড়িতে রবিকে থাকতে হয় চাকর-বাকরদের কড়া শাসনে। স্নানাহার এমনকি রাতে শোবার আগ পর্যন্ত পুরো সময়টাই তারা মানে তার বয়সীরা চাকরদের হাতে বন্দি। নিজেদের কাজ কমাবার জন্য চাকর-বাকররা এই শিশুদের সকল খেলাধুলা বন্ধ করে দিয়েছে আর বেশি দুরন্তপনা দেখালেই বিস্ময়করভাবে মারও জুটে যাচ্ছে কপালে। কিন্তু তাতে কি আর শিশুমন আটকায়?
তখন তাদের জোড়াসাঁকোর অন্দরের অবস্থা ছিলো আনন্দরসে পরিপূর্ণ। বড়ো বড়ো ওস্তাদ আসরে গান করতেন এবং বড়ো বড়ো অভিনেতা এসে অভিনয় করতেন। এ বিষয়গুলো শিশু রবিকে খুব আকৃষ্ট করেছিলো। এ সময়েই তাকে রামায়ণ ও মহাভারত পড়ে শোনানো হতো। এর পাশাপাশি অবশ্য ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্যবিদ্যার প্রথম পাঠ ইত্যাদি তার পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
ধীরে ধীরে আরো কিছু সময় পার হল। শিশু রবি আজ বালক রবি! সে পড়ে নরমাল স্কুলে। এখানেও তার পড়াশুনোর প্রতি কোন মায়া নেই। তাই সে কখনো কিছু পুরষ্কারও পায় নি। এই স্কুলে তাদের পড়ানো হত সুরে সুরে ইংরেজি কবিতা। বালক রবি এই সুরেলা বিজাতীয় ভাষা হজম করতে পারেনি কখনোই। তাই এর প্রতি মায়াও হয়নি তার কখনোই। তার কাছে একে মনে হত মন্ত্রোপাঠ। সে নিজেই মনে মনে আওড়াতো,
কলোকী পুলোকী সিংগিল মেলালিং মেলালিং মেলালিং।
(Full of glee, Singing Merrily, merrily, merrily)
(রবি ঠাকুরের নিজের করা পাঠোদ্ধার)।
নরমাল স্কুলে বালক রবির মনোকষ্টের আরও কারণ ছিলো। সহপাঠীদের সঙ্গে তার হৃদ্যতা হয়নি। মনে মনে মেলেনি। তাই সে একাই থাকতো আর শুধু মনে মনে দিন গুনত,
এক বৎসর, দুই বৎসর, তিন বৎসর; আরো কত বৎসর এমন করে কাটাতে হবে!
তাছাড়া ছিলেন হরনাথ পন্ডিত। তাঁর মুখের ভাষা এত খারাপ ছিলো যে বালক তা থেকে বাঁচতে শেষ বেঞ্চিতে বসতো। তবু রক্ষা নেই নিত্য লেগেই রয়েছে শাস্তি আর গালমন্দ। একবছর পরের বার্ষিক পরীক্ষার বাঙলা বিষয়ে সে প্রথম হল। পন্ডিত মশাইয়ের তা হজম হল না। তিনি বললেন, এ ছাত্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। এ পরীক্ষা আবার নেয়া হোক।
বালক আবার পরীক্ষা দিলো, আবারও প্রথম হল। একদিন এই বালক হয়ে উঠবে বাঙলা সাহিত্যের তথা সারাবিশ্বের সাহিত্যের অন্যতম কর্ণধার, তাকে আটকে দেয়া কি সহজকথা? হল না। হরনাথ পন্ডিত মুখ হাড়ির মত করে বসে রইলেন।
আবার মজা কি, যেখানে হরনাথ পন্ডিত ছিলেন, সেখানেই আবার সাতকড়ি দত্ত নামের বিপরীত মেরুর শিক্ষকও ছিলেন নরমাল স্কুলে। সাতকড়ি দত্ত মহাশয় জানতে পেরেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতে পারে। একদিন সাতকড়ি মহাশয় রবীন্দ্রনাথকে কাছে ডেকে দুটি লাইন দিয়ে বলেন একটি কবিতা লিখতে।
'রবি করে জ্বালাতন আছিল সবাই
বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই।’
বালক রবীন্দ্রনাথ এই চরণ দুটি নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিল; এর দুটি লাইন ছিলো-
‘মীনগণ দীন হয়ে ছিল সরোবরে
এখন তাহারা সুখে জলে ক্রীড়া করে।’
এ সময়ে রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র আট বছর। বাঙলা পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ও সাতকড়ি দত্তের মতো শিক্ষক পাওয়া নরমাল স্কুলের এক বছরের জীবনে রবীন্দ্রনাথের সুখস্মৃতি হয়ে রইল।
তারপর সময়ের আবর্তে একদিন এই কিশলয় হয়ে উঠলেন এক মহীরুহ। নিজ জীবনে তিনি যে একাধারে কত কিছু ছিলেন তা বলে শেষ করার উপায় নেই আর দুনিয়াজোড়া লোকের জানতেও বাদ নেই।
নিজের স্কুলজীবনের কথা স্মরণে রেখে নিজের প্রতিষ্ঠিত 'শান্তিনিকেতনে' ছাত্রদের বকাঝকার পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি কাউকে কখনো আঘাত দিতে চাইতেন না। একবার প্রমথনাথ বিশী সম্পর্কে একটা নালিশ এল। এমন অবস্থা যে, তাকে না বকলেই নয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গুরুদেব প্রমথকে অনেকক্ষণ ধরে বকলেন। তিনি একটু থামলে প্রমথ বললেন,
কিন্তু ঘটনা হলো আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
রবীন্দ্রনাথ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন,
বাঁচালি। তোকে বকাও হলো আবার তুই কষ্টও পেলি না।
অনেক ছোটবেলা থেকেই একা থাকা, রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বাড়িতে বেড়ে ওঠা, অসংখ্য চাকর-বাকর থাকা সত্ত্বেও কিন্তু তাঁর সঙ্গে একটু খেলবে, একটু গল্প করবে এমন লোকের অভাবে অভাবি এই ছেলেটির ছিল অসাধারণ গুণ। একপলকেই লিখে ফেলতে পারত অসাধারণ সব কবিতা। নিজে মাস্টার সেজে পড়াত তাঁর বিড়াল ছানাটিকে। বই পড়তে সে অনেক ভালোবাসত। বদ্ধ ঘরে তাঁর ভালো লাগত না। কিন্তু বাইরে যাওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না। সে শুধু মন খুলে কল্পনা করতে পারত।
তাঁর সেই কল্পনাপ্রবণ মন বাঙ্গালি জাতির তথা আমাদের জন্য ছিলো আশীর্বাদ। আজকের এই জন্মতিথিতে বিশ্বরবির কাছে আকন্ঠ নিমজ্জিত ঝণী ভক্তের সহস্রকোটি শ্রদ্ধার্ঘ্য।



পাঠকের মন্তব্য