এক.
মানুষের সাথে মানুষের যে দূরত্ব, তাকে কি কেবল ইঞ্চি বা সেন্টিমিটারে মাপা সম্ভব? নাকি সেই ব্যবধান আসলে মতাদর্শের গভীর গহ্বর? ২০২৬ সালের এই বৈশাখে ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দেখি, তরুণরা এখন আর মেঘের আড়ালে বসে কবিতা লেখে না; তারা সরাসরি টেবিলের ওপর হৃদপিণ্ডটা রেখে দিয়ে বলে, দেখো, এর স্পন্দন তোমার সাথে মেলে কি না। একে তারা বলছে হট-টেক। অর্থাৎ, প্রথম মিলনেই বলে দেওয়া যে আমার বাগানে জবা ফুটবে নাকি কেবল ক্যাকটাস। আমি যদি বলি আমি সন্তানহীন জীবন চাই, তবে সেই সত্যটি কি তোমার কাছে একটি পূর্ণ সংখ্যার মতো স্বচ্ছ মনে হবে, নাকি দশমিকের পরের অসীম যন্ত্রণার মতো গোলমেলে লাগবে?
আমাদের পরিচয়ের প্রথম লগ্নটি সাধারণত একটা মিথ্যা কুয়াশার মতো হয়, যেখানে আমরা নিজেদের ত্রুটিগুলো ধুলোর নিচে চাপা দিয়ে রাখি। কিন্তু এই নতুন প্রথাটি যেন একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ। এখানে ছোটখাটো আলাপ বা Small talk নেই; আছে কেবল ধারালো কিছু সিদ্ধান্তের সমষ্টি। যেমন ধরো, রাজনীতির জটিল সমীকরণে আমি যদি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির থাকি, তবে তুমি কি আমাকে বৃত্তের বাইরে ঠেলে দেবে? এই যে সরাসরি বলা, আমি বিয়ে করবই না কিংবা আমার ক্যারিয়ারই আমার একমাত্র ধ্রুবক, এ তো আসলে সময়ের সাশ্রয়। কারণ আমরা জানি, ভুল মানুষের সাথে দীর্ঘপথ হাঁটার চেয়ে একাকী স্টেশনে বসে থাকা অনেক বেশি গাণিতিক ও যুক্তিসঙ্গত। যারা সত্যের অপচয় করতে চায় না, তারা আসলে প্রথম দিনেই জ্যামিতিক রেখার মতো সবটুকু স্পষ্ট করে নিতে চায়, যাতে পরবর্তীকালে কোনো ভুল কোণ তৈরি হয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ না হয়।
দুই.
মানুষের হৃদয়ের ভেতরেও কি কোনো অদৃশ্য ক্যালকুলেটর থাকে? এই যে আমরা প্রথম বিকেলেই সবটুকু সত্য উগরে দিচ্ছি, একে কি সংযোগ বলা যায়, নাকি এ কেবল একটি সূক্ষ্ম বিয়োগফল? তুমি যখন তোমার নন-নেগোশিয়েবল শর্তগুলো সাজিয়ে ধরো, তখন আমার মনে হয় যেন আমি কোনো ল্যাবরেটরিতে বসে লিটমাস পেপারের রং বদলানো দেখছি। যদি আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা জীবনের পরম লক্ষ্যগুলো না মেলে, তবে কি আমরা দুটি সমান্তরাল সরলরেখার মতো অনন্তকাল পাশাপাশি হেঁটে যাব, যাদের মিলন কোনোদিনও সম্ভব নয়? এই আধুনিক হট-টেক আসলে সেই আশঙ্কাজনক সমান্তরালতাকে শুরুতেই চিহ্নিত করার এক কঠিন পদ্ধতি। এতে মায়ার অপচয় হয়তো কমে, কিন্তু নিভৃত সেই অনুভূতির কী হবে, যা কেবল একটু একটু করে চেনার মধ্য দিয়েই জন্ম নিতে পারত?
তবুও মেনে নিতে হয়, এই ২০২৬ সালের তপ্ত দুপুরে আবেগের চেয়ে যুক্তির ধার অনেক বেশি। আমরা এখন আর ভুল মানুষের জন্য দীর্ঘ বারোটি বছর অপেক্ষা করতে রাজি নই। আমাদের হাতে সময় কম, অথচ আকাঙ্ক্ষার দৈর্ঘ্য অসীম। তাই তো প্রথম চ্যাটেই বলে দেওয়া ভালো, ‘আমি এই শহরে থাকব না’ কিংবা ‘আমার বিশ্বাসগুলো তোমার বিশ্বাসের চেয়ে আলাদা’। এই যে ব্যবচ্ছেদ, একে কি নিষ্ঠুরতা বলব? নাকি একে বলব এক প্রকার গাণিতিক সততা? এতে অন্তত মাঝপথে এসে হঠাৎ আবিষ্কার করতে হয় না যে, যে মানুষটিকে আমি ভালোবেসেছি, তার প্রতিটি ছায়া আমার বিপরীত দিকে পড়ে। মায়া তো আসলে এক ধরণের ভ্রম, আর এই ট্রেন্ডটি সেই ভ্রমকে শুরুতেই চূর্ণ করে দেয়। হয়তো এতে কবিতা কমে যায়, কিন্তু জীবনের জটিল পাটিগণিতটুকু অন্তত সঠিক হওয়ার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থেকে যায়। অমিলগুলো জানাজানি হয়ে গেলে যে বিচ্ছেদ ঘটে, তাতে দীর্ঘশ্বাস থাকে ঠিকই, কিন্তু অনুশোচনার কোনো ভাগশেষ থাকে না।



পাঠকের মন্তব্য