একুশ বসন্তেই যিনি জয় করেছিলেন মৃত্যুকে

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে

মেয়েটির নাম প্রীতিলতা। ডাকনাম রানী। নামটার মধ্যে একটা রাজকীয় ব্যাপার থাকলেও সে ছিল একদম শান্ত আর মুখচোরা। অথচ এই শান্ত মেয়েটার ভেতরে যে একটা প্রলয় লুকানো ছিল, সেটা ধলঘাট গ্রামের মানুষ কেন, খোদ ব্রিটিশ পুলিশও টের পায়নি। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর স্কুলের করিডোর দিয়ে যখন সে হেঁটে যেত, তখন তাকে দেখে মনে হতো সে বুঝি কোনো গভীর দর্শনের বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে। আসলে ভেতরে ভেতরে সে একটা আগ্নেয়গিরি পুষছিল।

সেদিন রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে যখন সে দাঁড়াল, তখন তার পরনে পুরুষের পোশাক। মাথায় পাগড়ি। হাতে ধরা অস্ত্রটা তার কাছে তখন কেবল এক টুকরো লোহা নয়, বরং কয়েক শ বছরের পরাধীনতার শেকল ভাঙার চাবিকাঠি। ক্লাবের দরজায় লেখা সেই অদ্ভুত অপমানজনক বাক্যটি তার চোখে পড়েছিল, যেখানে এই দেশের মানুষকে কুকুরের সমান করা হয়েছে। প্রীতিলতা আলগোছে একবার হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল চূড়ান্ত একটা অবজ্ঞা।

রাত দশটার দিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার উঠল,  বন্দে মাতরম!

মুহূর্তের মধ্যে চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল। গুলির শব্দ, কাঁচ ভাঙার আওয়াজ আর আগুনের তাণ্ডব। প্রীতিলতা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। তার নেতৃত্বে একদল তরুণ তখন ইতিহাসের বুক চিরে সামনে এগোচ্ছে। ক্লাবের ভেতর সাহেব-মেমদের আনন্দ-উল্লাস তখন প্রাণভয়ে আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। প্রীতিলতার হাতের রিভলভার থেকে যখন আগুন ছুটছে, তখন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি সাধারণ কোনো নারী নন, তিনি সাক্ষাৎ রণচণ্ডী। 

কিন্তু নিয়তি বড় অদ্ভুত। অভিযান শেষে যখন সবাই নিরাপদে ফিরছে, ঠিক তখনই একটা বুলেট এসে বিঁধল প্রীতিলতার শরীরে। অন্ধকারের মধ্যে লাল রক্ত চুঁইয়ে পড়তে লাগল মাটির বুকে। চারপাশ থেকে তখন পুলিশের বুটের আওয়াজ এগিয়ে আসছে। প্রীতিলতা বুঝতে পারলেন, সময় ফুরিয়ে এসেছে। ধরা পড়া মানেই অমানুষিক নির্যাতন আর গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়। তিনি কি ভয় পেলেন? না, তার চেহারায় তখন এক অপার্থিব প্রশান্তি।

প্রীতিলতা মাটির ওপর বসে পড়লেন। চারদিকে বুটের শব্দ ক্রমে কাছে আসছে। টর্চের আলো অন্ধকার বনবাদাড় চিরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। শরীরের ক্ষতটা থেকে রক্ত ঝরছে টপটপ করে, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি শান্ত হাতে পকেট থেকে ছোট্ট একটা ক্যাপসুল বের করলেন। পটাশিয়াম সায়ানাইড। 

মানুষ মরণশীল, কিন্তু সবাই কি নিজের মৃত্যুর সময়টা বেছে নিতে পারে? প্রীতিলতা পারলেন। তিনি জানতেন, ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়া মানে শুধু নিজের অসম্মান নয়, বরং তার মাস্টারদা আর বিপ্লবী বন্ধুদের বিপদে ফেলা। তারা তাকে বাঁচাতে আসবে, আবারও রক্তক্ষয় হবে। তার চেয়ে এই ভালো। তিনি ক্যাপসুলটা হাতের তালুতে নিলেন। আকাশভরা তারার দিকে একবার তাকালেন কি? হয়তো সেই মুহূর্তে মায়ের মুখটা মনে পড়েছিল, কিংবা দেশের ধূলিকণার ঘ্রাণ পেয়েছিলেন শেষবারের মতো। 

এক মুহূর্তের দ্বিধা নেই, এক ফোঁটা চোখের জল নেই। খুব সাবধানে ক্যাপসুলটা মুখে দিলেন তিনি। যেন দীর্ঘ পথ হাঁটার পর একটু তৃষ্ণার জল পান করছেন। এক অদ্ভুত শীতলতা তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ল। পাহাড়তলীর সেই অন্ধকার রাতে একটা আগুনের শিখা নিভে গেল ঠিকই, কিন্তু রেখে গেল এক অবিনশ্বর তেজ। 

পরদিন পুলিশ যখন সেই পুরুষের পোশাক পরা তরুণীর দেহটা উদ্ধার করল, তখন তাদের বিস্ময়ের সীমা ছিল না। একুশ বছরের একটা মেয়ে! যার চোখের পাতায় তখনো লেগে আছে এক পৃথিবী স্বপ্ন। ব্রিটিশদের দাপট সেদিন থমকে গিয়েছিল সেই নিথর দেহের সামনে। 

প্রীতিলতা প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মধ্যেও এক ধরনের রাজকীয় জয় আছে। তিনি হারেননি, বরং পটাশিয়াম সায়ানাইডের সেই তিক্ত স্বাদের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার এক মিষ্ট ঘ্রাণ রেখে গেছেন উত্তরসূরিদের জন্য। আজও যখন পাহাড়তলীর সেই পুরনো ক্লাবের পাশ দিয়ে বাতাস বয়, মনে হয় সেই বাতাস আজও ফিসফিস করে বলে, রানী হারেনি, রানী অমর হয়ে গেছে।

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top