১.
আমাদের এই সমাজে বাঁচার চেয়ে বাঁচানোর চেষ্টাটাই চিরকাল বেশি। কেউ আমাদের হৃদয় বাঁচাতে চায়, কেউ দেশ বাঁচাতে চায়, আর একদল মানুষ সকাল-বিকেল আদাজল খেয়ে আমাদের শরীরটা বাঁচাতে চায়। এই শেষোক্ত দলটিই হলো ডায়েট-সংস্কৃতির পুরোহিত। এদের কাছে শরীরের চেয়ে শরীরের সাইজ বড়। আর এই জবরদস্তি খিদেমারানি থেকে মুক্তি পাওয়ার দিনটাই হলো ৬ মে, ইন্টারন্যাশনাল নো ডায়েট ডে।
একটা নিরীহ পরোটা দেখে আপনার মনে জাগার কথা ছিল লালসা, অথচ সেখানে এখন জেগে ওঠে পাটিগণিত!
ওরে বাবা, এতে কত ক্যালোরি?
এই যে খাবারের স্বাদকে সংখ্যার খাঁচায় বন্দি করা, এটাই হলো আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমরা এখন জিভ দিয়ে খাই না, আমরা ক্যালকুলেটর দিয়ে খাই। আর এই গণিতের যূপকাষ্ঠে রোজ বলি হচ্ছে আমাদের হাজার বছরের রসনাবিলাস। নো ডায়েট ডে বলছে, ভাইরে, অন্তত একটা দিন ওই ক্যালকুলেটরটা ডাস্টবিনে ফেলে দে। পেট ভরে যা খেতে ইচ্ছে করে খা, কারণ তুই মানুষ, কোনো এক্সেল শিট নোস।
২.
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন ফিটনেস মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকটা পেন্সিলের মতো ধারালো হওয়া। যেন শরীরটা যত সরু হবে, মগজটা ততই চওড়া হবে বলে লোকে ধরে নিয়েছে! মজার ব্যাপার হলো, যারা ডায়েট চার্ট বানান, তারা আপনাকে পুষ্টির গল্প শোনান না, তারা আসলে আপনাকে এক ধরণের অপরাধবোধ বিক্রি করেন। আপনি একটা চপ খেয়েছেন মানেই আপনি নরকের সবচেয়ে গরম কড়াইটার যোগ্য, এই যে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার ব্যবসা, তাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে আজকের দিনটা। মেরি ইভান্স ইয়ং যখন ৯২ সালে এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তিনি বুঝেছিলেন যে মানুষের খিদেটা পেটে নয়, সমাজ আসলে খিদেটা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
৩.
আমাদের চারিদিকে এখন ডায়েট ইন্ডাস্ট্রি যেন এক সর্বব্যাপী অক্টোপাস। লো ফ্যাট, জিরো সুগার, কেটো ফ্রেন্ডলি৷ এই সব গালভরা শব্দের আড়ালে যা চলছে তাকে বাংলায় বলে ঘোড়াকে ঘাস দেখানো। আপনি ঘাসই খাচ্ছেন, কিন্তু দাম দিচ্ছেন বিরিয়ানির! নো ডায়েট ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শরীরের কাজ হলো বেঁচে থাকা, আনন্দ পাওয়া এবং নড়াচড়া করা৷ কাউকে ইমপ্রেস করার জন্য প্রদর্শনীতে রাখা কোনো শোপিস হওয়া নয়।
৪.
আমরা আয়নার সামনে দাঁড়াই নিজেকে দেখতে নয়, বরং খামতিগুলো খুঁজতে।
ইশ, এখানটা একটু ঝুলে গেছে! কিম্বা নাকটা কি চর্বিতে একটু বেশিই চ্যাপ্টা লাগছে?
এই যে সারাক্ষণ নিজের শরীরের সঙ্গে একটা কোল্ড ওয়ার চালিয়ে যাওয়া, নো ডায়েট ডে বলে এতে একটা অন্তত বিরতি দেওয়া হোক। বডি পজিটিভিটি মানে এই নয় যে আপনাকে অলস হতে হবে, বরং এর মানে হলো, আপনার শরীরটা আপনার শত্রু নয়। সে আপনাকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, তারও তো একটু সম্মান প্রাপ্য! তাকে সারাক্ষণ শসা আর ঘাসপাতা খাইয়ে লিকলিকে দড়ির মতো বানানোর চেষ্টায় কোনো বীরত্ব নেই।
৫.
ডায়েট সংস্কৃতির মোড়লরা ভয় দেখান, ওজন বাড়লেই কিন্তু হার্ট অ্যাটাক, সুগার, প্রেশার সব এসে লাইনে দাঁড়াবে! যেন রোগা মানুষেরা অমরত্বের বরদান পেয়ে পৃথিবীতে এসেছেন। মজার ব্যাপার হলো, স্ট্রেস আর ডিপ্রেশন৷ যা ডায়েট করার ফলে বোনাস হিসেবে আসে; তা শরীরের জন্য কোনো অংশেই কম ক্ষতিকর নয়। HAES বা সব সাইজে স্বাস্থ্য দর্শনের মূল কথা হলো, আপনি রোগা না হয়েও স্বাস্থ্যকর হতে পারেন। ভালো করে ঘুমোনো, একটু হাত-পা নাড়ানো আর মন খুলে হাসা, এগুলো রক্তচাপ মাপার মেশিনের রিডিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। আপনি যদি প্রতিদিন জিমে গিয়ে মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে কসরত করেন, তবে সেই ফিটনেসের চেয়ে শান্তিতে বসে এক কাপ চা আর একটা বিস্কুট খাওয়া অনেক বেশি মোক্ষদায়ক।
বুঝতে হবে, আপনার মেদ নিয়ে আপনি যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত ডায়েট ফুড কোম্পানিগুলো। কারণ আপনি যদি নিজেকে ভালোবাসতে শুরু করেন, তবে কোটি কোটি টাকার ডায়েট-পিল, জিরো-ক্যালোরি ড্রিংক আর চর্বি কমানোর বেল্টগুলো বিক্রি হবে না। আপনার আত্মবিশ্বাস মানেই ওদের লোকসান। তাই ৬ মে-র এই দিনটা আসলে একধরণের বিদ্রোহ। এটা পুঁজিবাদী সৌন্দর্যের সংজ্ঞার মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার দিন।
পুনশ্চ: জীবনটা খুব ছোট। এই সীমিত সময়ের মধ্যে যদি অর্ধেক সময় কাটে কী খাব না তা ভাবতে আর বাকি অর্ধেক সময় কাটে কী খেয়েছি বলে আফসোস করতে, তবে বেঁচে থাকার সময়টা কোথায়?
ইন্টারন্যাশনাল নো ডায়েট ডে-র বার্তা খুব পরিষ্কার:
দাঁড়িপাল্লাটা ভাঙুন (মানে ওজন মাপার যন্ত্রটা), আয়নার দিকে তাকিয়ে একবার হাসুন আর আজ অন্তত ওই ডায়েট চার্টটার ঠোঙায় করে কিছু একটা চটপটে খাবার খান।
মনে রাখবেন, কবরে যাওয়ার সময় শরীরটা কত সুন্দর ছিল, তা কেউ দেখতে আসবে না; লোকে মনে রাখবে আপনি কতটা হাসিখুশি আর তৃপ্ত মানুষ ছিলেন। তাই আজ অন্তরাত্মার ডাকে সাড়া দিন, খিদেটাকে ডাস্টবিনে না পাঠিয়ে বরং থালায় সাজিয়ে নিন।
শুভ নো ডায়েট ডে!



পাঠকের মন্তব্য