হাসিনা ও ভারত পুনরুদ্ধার প্রকল্প

৬২ পঠিত ... ৮ ঘন্টা ০ মিনিট আগে

এবারের ডাকসু নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিহাসিনাতসিফিকেশন প্রধান আলোচনার বিষয় হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার ও নাতসিদের পতনের পর; জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরিতে সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে নাৎসি প্রভাবকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা ছিল প্রধান কাজ। আর এর মধ্যে দিয়েই সেখানে গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। 

এবারের ডাকসু নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিহাসিনাসিৎফিকেশনের অঙ্গীকারের কথা আলোচিত হওয়ার কথা ছিল। হাসিনা তার যেসব অনুচরকে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক ও কর্মচারি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন; তাদের নিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন করে অপরাধমনস্কতার মাত্রা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি আলোচিত হওয়ার কথা ছিল। সংস্কৃতি চর্চার নামে চারুকলা ও টিএসসিতে যে ভারত সমর্থিত হাসিনাৎসি শেকড় গেড়েছে; তা পরিশুদ্ধকরণের আলোচনা প্রাধান্য পাওয়ার কথা ছিল। সর্বোপরি ২০০৯-২৪ হাসিনা ও তার দোসরেরা যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে; তাদের বিচারের দাবি থাকার কথা ছিল ডাকসু প্রার্থীদের কণ্ঠে।

ছাত্রশিবিরের জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের সঙ্গে অন্যদের বিতর্ক হওয়ার কথা ছিল, রাষ্ট্রে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আদৌ যৌক্তিক কিনা সে বিষয়ে। সংগীত-শিল্পকলা-ভাষ্কর্য-নারীর পোশাক সম্পর্কে জেন-জি হয়েও ছাত্রশিবিরের যে দৃষ্টিভঙ্গি; তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪ বছরের মুক্তাঙ্গনের সঙ্গে মানানসই কিনা সে বিষয়ে তাদের প্রশ্ন করার কথা ছিল।

কিন্তু ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিবিরকর্মীদের আওয়ামী লীগের অভিধান থেকে কেবল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রশ্ন করাই ছিল বিশেষত বাম ছাত্র-ছাত্রী ও মিডিয়ার কাজ। যে আওয়ামী লীগ এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার টুল ব্যবহার করে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে সমর্পণ করেছিল। প্রণব মুখার্জি, সুজাতা সিং ও নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের প্রমাণগুলো যেখানে আজও মূর্ত। 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জনসংখ্যার বিচারে খুব অল্পসংখ্যক লোক পাকিস্তান পক্ষ অবলম্বন করেছিল। বেশিরভাগ পরিবারেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার, মুক্তিযুদ্ধ করার, মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করার, শরণার্থী জীবনে সীমাহীন দুর্দশার জীবন-যাপন করার, পাকিস্তানি মিলিটারির আগুনে ঘর-বাড়ি পুড়ে যাওয়ার ও লুণ্ঠিত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভ্যানগার্ড হিসেবে চেতনার যে মালিকানা দাবি করে; তাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার চেয়ে চেতনার লিপসার্ভিস দেওয়াটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শত্রুপক্ষ পাকিস্তান ৫৪ বছর আগের ইতিহাস। যেহেতু বাংলাদেশ ছিল সেসময়ের পাকিস্তানের ইকোনোমিক পাওয়ার হাউজ; ফলে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্নতার পরে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর একটি দুর্বল রাষ্ট্র; যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দুর্বল। যে পাকিস্তানি সেনা বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল; তারা আজ অব্দি পাকিস্তানের সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও খায়বার পাখতুন খোয়ার জনগণের জীবনে একইরকম ফ্রাংকেনস্টাইন হিসেবে রয়ে গেছে। পাকিস্তানের গণতন্ত্র বিকাশের পথে ঐ অপরাধী সেনাবাহিনীই প্রধান অন্তরায়।

দুর্বল রাষ্ট্র পাকিস্তান জুজু দেখিয়ে ভারতের মানবতা বিরোধী হিন্দুত্ববাদী শাসক নরেন্দ্র মোদি যেভাবে ভারতের নির্বাচনে জেতেন, প্রতিপক্ষ কংগ্রসকে প্রায় প্রতিদিনই পাকিস্তানপন্থীর তকমা দেন; বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদ সমর্থিত আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীরা একইভাবে পাকিস্তান জুজু দেখিয়ে বে-আইনি নির্বাচন করেছে, প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতের মানুষকে পাকিস্তানপন্থী তকমা দেয়; আর নিয়মিত দুর্বল রাষ্ট্র পাকিস্তান জুজু দেখায়।

অথচ বাংলাদেশ বাস্তবতা বিবেচনায়; মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করে, লিখে রেখো এক ফোটা দিলেম শিশির বলে প্রতিবেশী ভারত স্বাধীনতার ৫৪ বছরের মধ্যে ৩২ বছর আওয়ামী লীগ-বাম-জাতীয় পার্টির মাধ্যমে ছায়া উপনিবেশ আরোপ করেছে, সীমান্ত হত্যা করেছে, বাংলাদেশের ভেতরে গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে ইসলামোফোবিক হত্যাযজ্ঞ ও ভারত সমালোচকদের গুমের ঘটনা ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারতের চোখে প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি। এখানে সে ১৯৪৭ সালের আগের হিন্দুত্ববাদী জমিদারি ফিরে পেতে মরিয়া। বাংলাদেশে গরিব মুসলমানের নব্য শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের ভারত মন্ত্রে দীক্ষিত করে কালচারাল হিন্দুত্ববাদের অপারেটিভ হিসেবে গড়ে তোলে তারা। এই কালচারাল হিন্দুত্ববাদ স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের স্বদেশের মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ লুকাতে সারাক্ষণ ৫৪ বছর আগের পাকিস্তানি সেনার মানবতাবিরোধী অপরাধ আর ইসলামি পাকিস্তানের জুজু দেখাতে থাকে। মোদি ঠিক যেভাবে পাকিস্তান জুজু দেখিয়ে ভারতের গুজরাট ও কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যা করেছে; গোটা ভারতে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণাকে মুসলমানের প্রতি ঘৃণায় রুপান্তর করে তাদের এথনিক ক্লিনজিং চালু রেখেছে।

গতবছর জুলাই বিপ্লবের সময় থেকে ভারতের ক্ষমতা কাঠামো, মিডিয়া, থিংক ট্যাংক বলেছে, আওয়ামী লীগ (ও বাম) বাদে বাংলাদেশের সবাই জঙ্গি, উগ্রবাদী মুসলমান। সেই ন্যারেটিভটাই  বাংলাদেশের অভ্যন্তরে  ভারতের অপারেটিভরা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের জীবন সাদা-কালোয় বর্ণনা করা কঠিন। এখানে অধিকাংশ শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হিন্দুকে অখণ্ড ভারতের আলেয়া দেখিয়ে প্রতারিত করেছে ভারত। বাংলাদেশের হিন্দুদের অভিভাবক সেজে ভারত তাদের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। শেখ হাসিনা হিন্দু পুলিশদের দিয়ে ক্রসফায়ার করিয়ে, প্রশাসকদের দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের ওপর পীড়ন করে কমিউনিটি হিসেবে তাদের সমস্যায় ফেলেছে। শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হিন্দুদের মাঝে যারা কট্টর হিন্দুত্ববাদী তারা যে কোনো সমস্যা হলে পশ্চিমা দেশে ও ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে পারে। আওয়ামী লীগ ও বাম ক্ষমতাচ্যুত হলেই বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে গেছে, মোদির তোতাপাখির মতো এই কথা বলতে পারে। কিন্তু দরিদ্র হিন্দুরা ওইসব প্রতিক্রিয়াশীলতার তিক্ত ফলাফল ভোগ করে। এটা খুবই জটিল একটি পরিস্থিতি।

১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ আলাদা করে ভারতে যোগ দেন। ফলে বাধ্য হয়ে পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানে যোগ দিতে হয় অস্বাভাবিক ভৌগলিক দূরত্বের সমীকরণে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, আপাতত এটা মেনে নেওয়া গেল। সেই থেকে বাংলাদেশের হিন্দুদের মাঝে স্বপ্ন জারিত হয়, নিশ্চয়ই এটা একদিন অখণ্ড ভারত হবে। ঠাকুদ্দারা নাতি-নাতনিদের কখনও শ্যামাপ্রসাদের কারণে বাংলা ভাগ হলো, এই কথা বলেননি। জিন্না-টাই সব সর্বনাশের গোড়া এটা মুখস্থ করে বড় হলো হিন্দু শিশুরা।

বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান কৃষকপ্রজা যে কারণে হিন্দু জমিদারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রোহ করেছিল, একই কারণে পাঞ্জাবের মুসলমান জমিদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। ফলে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশের মানুষ একটু কম খেয়ে থাকতে রাজি, কিন্তু সার্বভৌমত্বহীনতায় রাজি নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দেখবেন কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বেশি। রক্ত ও ত্যাগের মাঝ দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে; ভৌগলিক বাস্তবতার কারণে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্য নিতে হয়েছে; ফলে পাকিস্তান রাক্ষসের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারত রাক্ষসের আগমন ঘটল।

আবার সেই অখণ্ড ভারতের আলেয়ার পেছনে দৌড়াতে শুরু করল শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হিন্দুদের একটি অংশ। আর বৃটিশ আমলে যে গরিব মুসলমান হিন্দু জমিদারের চেয়ারের সামনে মাটিতে বসে থাকত; তার নাতি-নাতনি ভারতের সাংস্কৃতিক জমিদারির সামনে ছালা পেতে বসল। ওই টাই আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী কালচারাল উইং বলে পরিচিত।

ফলে তাকে ভারতের নরেন্দ্র মোদির অভিধান অনুযায়ী পাকিস্তান পাকিস্তান জুজু খেলতে হয়। পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের গাঁজাখুরি গল্প নিয়ে হাজির হয় তারা। বাংলাদেশে যতবার আওয়ামী লীগ ও বাম ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, ততবার এই পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের গপ্পোটা ফেঁদে ভারত পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এটা তাদের ডিএনএ-র মধ্যে রয়েছে। কাল্পনিক পাকিস্তান ভূতের গল্প বলে; অখণ্ড ভারত পুনরুদ্ধারের আসল খেলা। এদের ডিএনএ-র প্রত্যাশা; ভারতে মুসলমান যেমন মানবেতর জীবন-যাপন করছে; বাংলাদেশেও মুসলমানদের তেমন মানবেতর জীবন-যাপন করতে হবে। না করলেই তাকে পাকিস্তানপন্থী তকমা দেওয়া হবে। ঐ যে হিন্দুধর্মে অস্পৃশ্য করে দেওয়ার যে চর্চা।

বামপন্থীরা প্রথমে এই গল্পটা জামায়াতকে ঘিরে ফাঁদে; জামায়াতকে গালি দিতে দিতে সে, যেকোনো মুসলমানকে জামায়াতি ও পাকিস্তানপন্থী বলে তকমা দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। বামপন্থীরা তাদের ভাঙা গাল ও বেগুনি চেহারা নিয়ে বিরাট আর্য কল্পনায় ভোগে। সে যখন ফতুয়া পরে মোমবাতি জ্বালায়, কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরা মেয়েটি যখন গম্ভীরভাবে হারমোনিয়ামের রিডে হাত রাখে; তখন কল্পনায় তারা ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হিন্দু জমিদার হয়ে যায়।  উচ্চবর্ণের হিন্দু কল্পনায় নিম্ন মধ্যবিত্তের ছেলে-মেয়ে ‘অমুককে ঘৃণা করি, হাহাহা’ বলে আভিজাত্যের চারুলতার দোলনায় দোল খায়। ইনফেরিয়রের সুপিরিয়র সাজার সস্তা নাটক এসব মেগালোমেনিয়া। জেন-জি-র মাঝে মেনন, ইনু, হাসিনা, অপু উকিলের এই প্রেতায়িত আত্মা; এটা অত্যন্ত অনাধুনিক; নিম্ন সংস্কৃতির প্রদর্শনবাদীতা। হাসিনা পুনর্বাসনের ভারতীয় সংকল্পের ছায়ানৃত্য এসব। এরা অপেক্ষায় আছে; নির্বাচনের পর ভারত মামা এদের দার্জিলিং মেইলে তুললে তখন, গদ গদ হুত ত্যাক করবে।

৬২ পঠিত ... ৮ ঘন্টা ০ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top