যৌতুক নিয়ে নারী নির্যাতন আইন সংশোধন: আপস নাকি নতুনভাবে নিপীড়ন?

৭৫ পঠিত ... ১৮:৫৪, জুলাই ০৯, ২০২৫

টাটকা যখম নিয়ে ভিকটিমের অপরাধীর সাথে বাধ্যতামূলক আপস—যৌতুক নিয়ে নারী নির্যাতনের নতুন সংশোধন নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কী আছে নতুন এই সংশোধনে?

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের নতুন সংশোধনে ২১ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, যৌতুকের কারণে সাধারণ জখমের শিকার নারীদের এখন থেকে মামলার আগে স্থানীয় লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতায় যেতে হবে। মধ্যস্থতায় বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে যেকোনো পক্ষ মামলা করতে পারবে। অন্তর্বর্তী সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ সংশোধন করে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করে ১ জুলাই নতুন অধ্যাদেশ জারি করে।

এই আইনের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর প্রথমেই একজন নারী মামলা প্রক্রিয়ায় যেতে পারবেন না। প্রথমে তাকে স্থানীয় লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের মাধ্যমে সালিশি প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। এর মাধ্যমে বিষয়টা নিষ্পত্তি না হলে পরে দুপক্ষই মামলা করতে পারবে।

এই অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর, বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে এই সংশোধন নারীর মামলা করার আইনি অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করবে। ভুক্তভোগীকে অপরাধীর সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করবে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, এই আইন নারী অধিকারকে আরও সুসংহত করবে। ২০২০ সালে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে যৌতুক বিষয়ক আইনকে আপসযোগ্য অপরাধ করা হয়েছিল, এই আপসের প্রক্রিয়াকে অর্থবহ করতেই মধ্যস্থতার নতুন বিধান আনা হয়েছে।

তবে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের সাথে এর সংঘর্ষ কোথায়? এই আপসের সংযোজন কি ভিকটিমের জন্য হয়রানি বা নতুনভাবে নিপীড়নের জন্ম দিচ্ছে? চলুন, দেখা যাক বিশ্লেষণ করে।

নতুন আইনে বলা হয়েছে, নির্যাতনের পর উক্ত ভুক্তভোগী সরাসরি মামলার প্রক্রিয়ায় যেতে পারবেন না, তাকে প্রথমে স্থানীয় লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের মাধ্যমে মধ্যস্থতার মধ্যে যেতে হবে। এরপর বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে উভয় পক্ষ মামলা করতে পারবে। আগের আইনে প্রথমেই নির্যাতন শিকার নারীকে সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হত, এরপর হাসপাতাল থেকে প্রমাণসহ সার্টিফিকেট নিয়ে থানায় মামলা করতে পাঠানো হত।

কিন্তু বর্তমানে ভুক্তভোগীর প্রথমেই মধ্যস্থতার বিষয়টি আসার কারণে অফিসিয়ালি প্রমাণ সংরক্ষণের বিষয়টি আর থাকছে না। কোনো কারণে অভিযুক্ত মধ্যস্থতায় আসতে দেরি করলে, নির্যাতনে ভুক্তভোগীর জখমের চিহ্ন মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়, এবং হাসপাতালের সার্টিফিকেট না থাকার কারণে ভুক্তভোগীর জখমের অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। এতে করে প্রমাণের অভাবে ঘটনাটির ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

আইনটিতে মধ্যস্থতায় বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে, উভয় পক্ষের মামলা করার অধিকার রাখা হয়েছে। তাহলে কি অভিযুক্তরও ভুক্তভোগীর নামে মামলা করার সুযোগ রাখা হয়েছে? এই ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে পরবর্তীতে মামলা করার সুযোগ পেয়ে অভিযুক্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপস না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে করে ভুক্তভোগীকে আবার আদালতেই যেতে হবে। যাতে ভুক্তভোগীর হয়রানি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আছে। এবং অভিযুক্ত ভুল মামলা করার মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে আরও হয়রানি করার সুযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের আইনজীবী নাহিদ শামস প্রথম আলোকে বলেন, প্রচলিত আইনে যৌতুকের কারণে সাধারণ জখমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জখম হালকা হলেও এটা নির্যাতন। এ ধরনের অপরাধে ভুক্তভোগী নারীকে মধ্যস্থতার দিকে ঠেলে দিলে যৌতুকের কারণে নির্যাতন বেড়ে যেতে পারে।

আমরা ন্যায়বিচার থেকে শিক্ষা পাই, যেকোনো অপরাধের বিপরীতে অভিযুক্তের আইনি প্রক্রিয়া দিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে, এবং অভিযোগ প্রমাণ হলে তার নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বর্তমান আইনের আওতায় নির্যাতনে জখমের প্রমাণ অল্প হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও মধ্যস্থতায় আপসের মাধ্যমে তার অপরাধ ক্ষমার দিকে চলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এখন একটি আলোচনা শুরু হতে পারে, কাদের দ্বারা গঠিত হতে পারে এই স্থানীয় লিগ্যাল এইড কার্যালয়? এই নিয়ে আমরা ধারণা করতে পারি স্থানীয় সরকারের সদস্যদের দ্বারা এই সংগঠন গঠিত হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবিক প্রেক্ষিতে আমরা দেখি, আমাদের গ্রামীণ পরিবেশে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং কিছু ক্ষেত্রে মফস্বল, শহুরে অঞ্চলেও দেখা যায়, স্থানীয় সরকারের সাথে একটা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সুসম্পর্ক থাকে, এবং নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসার ভেতরের কাজ করার ক্ষেত্রেই নিয়োজিত থাকেন। স্থানীয় রাজনীতিতে পুরুষরা সক্রিয় থাকেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে, যা স্থানীয় সরকার অথবা লিগ্যাল এইড বডির সাথে তাদের সম্পর্কের সুযোগ সৃষ্টি করে। সেক্ষেত্রে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব হওয়ার সর্বোচ্চ সুযোগ থাকে, যা লঘু এবং গুরুতর অপরাধকেও বিচারের সূচনায়ই নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ প্রদান করে। এর প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাবে, উক্ত অপরাধীর অপরাধ প্রবণতা আরো বেড়ে যেতে পারে।

সব বিবেচনায়, এই আইন পুনর্বিবেচনা এবং বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক বিবৃতিতে এই আইন পুনর্বিবেচনার দাবি জানায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করে, এই বিধান নারীর বিচারপ্রাপ্তির পথকে দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলবে। বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার ফলে ভুক্তভোগী নারী আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে হয়রানির আশঙ্কা বাড়বে, অপরাধীরা উপকৃত হবে এবং সমাজে যৌতুকের মতো অপরাধের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হবে।

অবশ্য, নারীর বিচার—ব্যাপারটা তো এই সময়ে এসেও এক প্রহসনের নাম। দেশের কত কত গুরুতর সমস্যা, সেই সময়ে নারীর অধিকার নিয়ে এত চিন্তা করার সময় কার? আপনি যে এত কষ্ট করে সময় দিয়ে লেখাটা পড়লেন, সেজন্য আপনাকেও, স্যরি।

৭৫ পঠিত ... ১৮:৫৪, জুলাই ০৯, ২০২৫

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top