বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশে সাংবাদিকদের এমন দলবাজি নেই। প্রেস ক্লাব কিংবা সাংবাদিক সংগঠনে এরকম রাজনৈতিক দলের পক্ষে গুচ্ছবদ্ধ করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না।
বাংলাদেশের সোনালী যুগের সাংবাদিক মানিক মিয়া, এবিএম মুসা, সৈয়দ আবুল মকসুদ, মাহফুজউল্লাহর নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ থাকলেও; সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তারা নিরপেক্ষতার আচরণবিধি মেনে চলতেন। এই কোড অফ কন্ডাক্ট গোটা পৃথিবীর সাংবাদিকেরা মেনে চলে।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় রাজপথে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হলে; উনি মায়াবী সুরে জিজ্ঞেস করেন, ভাত খাইছো বাবু অথবা শ্যামল! সেই থেকে সুধাসদনে গিয়ে সাংবাদিকদের নিয়মিত ভাত খাওয়া শুরু হয়। আওয়ামী লীগের এই ভাত কেন্দ্রিক রাজনীতিই সাংবাদিকতার প্রথম দলীয়করণ।
আওয়ামী লীগের ছড়ানো ভাত খাওয়া অসংখ্য সাংবাদিক দেখে; তখন বিএনপি ও জামায়াত ভাত ছড়াতে শুরু করে। ফলে মিডিয়া হয়ে পড়ে দলীয় ভাত খাওয়ার প্রতিযোগিতা।
অথচ সাংবাদিকের আনন্দভূক হবার কথা; রিপোর্টিং-এর আনন্দে অনাহার ভুলে থাকার কথা। এই প্যাশনই যদি না থাকে; তাহলে সরাসরি দলীয় ক্যাডার হয়ে জয় বাংলা ও জিন্দাবাদ করে বেড়ালেই হয়।
২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ ভাতের পরিবর্তে বিরিয়ানি খাওয়াতে শুরু করে দলীয় সাংবাদিকদের। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় যারা সুধাসদনে ভাত খেয়েছিলো; তাদেরকে বলা হয়; আজকাল তো ব্যবসা পাহারা দেয়ার জন্য সারমেয় না পুষে ব্যবসায়ীরা মিডিয়া পুষতে চায়; যাও একটা ব্যবসায়ী ধরে নিয়ে এসো; তোমার অভিজ্ঞতা আর ব্যবসায়ীর টাকার বিনিময়ে তোমাকে টিভি লাইসেন্স দেবো।
বাজারে আসে সাড়ে চুয়াত্তর টিভি; শুরু হয় ভিন্নমতের লোকদের গলায় গামছা দিয়ে টেনে এনে মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেয়া। সংস্কৃতি মামা ও খালারা চোখে কাজল দিয়ে, পাউডর মেখে এসে সেখানে নানারঙ্গে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে সাধারণ মানুষকে।
শুরু হয় মিডিয়া ইউফোরিয়ার যুগ; গণভবনে এবার পিঠাপুলি খাওয়ানো হয় সাংবাদিক ও কালচারাল উইংকে। চোখ ছল ছল করে ওগো মা বলে সবাই হাসিনার পায়ে পড়ে যায়। হাসিনা বিদেশ সফর থেকে ফিরলেই প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছির আসরে তেলাঞ্জলি দেবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
তেলাঞ্জলির বিনিময়ে সাংবাদিকদের প্লট-পদ-পদকের ইঁদুর দৌড় শুরু হয়। হেড অফ নিউজেরা নির্দেশ দেয় উন্নয়ন ঢোল বাজাতে। শুরু হয় পদ্মা সেতুর স্প্যান সাংবাদিকতা, মেট্রোরেলের পিলার সাংবাদিকতা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উড়িয়ে বঙ্গবন্ধু টানেল বানিয়ে আনন্দে একে অন্যের গলা জড়িয়ে ধরে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে শুরু করে আওয়ামীবাদিকেরা। হ্যা সাংবাদিকতা ততোদিনে প্রকৃষ্ট আওয়ামীবাদিকতা হয়ে উঠেছে।
টিভির সিইও, হেড অফ দ্য নিউজ বড় বড় গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুরতে থাকে; অনেকের বাগান বাড়িতে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ললিতলোভনকান্তি ভর্তা খাওয়া শুরু হয়। আওয়ামী লীগের খাওন রাজনীতি কিন্তু থেমে নেই। মন্ত্রীরা রিপোর্টারদের ব্রেকফাস্টে দাওয়াত দিতে শুরু করে। তরুণেরাও শিখে ফেলে কিভাবে ফেসবুকে লিখতে হয়, আজ বিপু ভাই কেরানিগঞ্জের তেহারি খাওয়ালেন; আতিক ভাই ভুনা খিঁচুড়ি রান্না করে খাওয়ালেন।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা পাঠ শেষে অনেক স্বপ্ন ও প্যাশন নিয়ে সাংবাদিকতা করতে আসা তরুণ-তরুণীদের সর্ব নিম্ন বেতন দিয়ে, শ্রম শোষণ করে, কখনো বেতন বকেয়া রেখে; তারকা আওয়ামীবাদিকরা লন্ডনে ও প্যারিসে চেক ইন দিতে শুরু করে। ছেলেমেয়েকে এমেরিকা-ক্যানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে গ্রাজুয়েশন হলে; সেই গ্যাজুয়েশন ক্যাপ উড়িয়ে গর্বিত পিতা-মাতার সঙ্গে ফটোসেশন চলতে থাকে।
তরুণ সাংবাদিকদের সামনে রোলমডেল তখন এই মধ্যবয়েসী আওয়ামীবাদিকেরা। মিডিয়ায় সাফল্যের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়, যদি তুমি তেল দাও, তবে তুমি বেশ; যদি তুমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করো, তবে তুমি শেষ।
বুবুমিডিয়ার এই তেলাঞ্জলির যুগেও সাহস করে দুর্নীতি, ভূমি দখল, গুম, ক্রসফায়ার বিষয়ে রিপোর্ট করেছে সাহসী তরুণেরা। তখন হেড অফ দ্য নিউজের সহযোগিতায় গোয়েন্দা সংস্থার কাঁচামালেরা রিপোর্টারকে তুলে নিয়ে গেছে। এইভাবে রিপোর্টার উইদাউট বর্ডারস-এর প্রেস ফ্রিডম সূচকে বাংলাদেশ তলানিতে পৌঁছালে; তখন আবার টকশোগুলোতে ভাতখেকো আওয়ামীবাদিকেরা নেমে এসেছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের গপ্পো নিয়ে।
বসের মন পেতে তরুণ সাংবাদিকদের মাঝে আঁতেল হয়ে ওঠা কেউ কেউ, প্যারিসে সাংবাদিক নির্যাতনের কক এন্ড বুল গপ্পো ফেঁদে কাউন্টার দিয়ে দেয় পশ্চিমকে। অমনি সে তরুণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে টেবিল ভর্তি ভাত খেতে যায় সেসময়ের তথ্য মন্ত্রী হাছান মাহমুদের বাসায়।
উইকেন্ডে এমেরিকায় শাহজাদার বাসার বাজার করে দেবার কৃতিত্বে "র"কে "ড়"-এর মতো করে উচ্চারণ করা লোকেরা দেশে ফিরলে, টিভি টকশোর নয়নের মণি হয়ে পড়ে তারা। "আপনি জানেন না তো, আমাকে বলতে দিন" বলে প্রবীণদের থামিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে সেসব টকার। এইভাবে প্রায় প্রতিটি টিভিই হয়ে ওঠে বাতাবি লেবুর বাগান, যেখানে আওয়ামী চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুগন্ধ মৌ মৌ করতে থাকে।
মিডিয়ায় আওয়ামী ভাতবৃক্ষের শেকড় এতো গভীরে যে, জুলাই বিপ্লবের পর ভাতের রাণী, তেহারির রাজারা ভারতে পালিয়ে গেলেও; ২০০৯-২৪ (৫ অগাস্ট) পর্যন্ত যে আওয়ামীবাদিকেরা ক্ষমতার পায়ে চোখ রেখে কাটিয়েছে; ৬ অগাস্ট থেকে তারা ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শুরু করে। এতোদিনে অরিন্দমের সাংবাদিকতার মৌল আদর্শের কথা মনে পড়েছে। কিন্তু ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে এ কোন সত্যান্বেষণ নয়; এ হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের ম্যান্ডেটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকার আর জুলাই বিপ্লবীদের ছিদ্রান্বেষণ। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের গুম-খুন-ক্রসফায়ার-দুর্নীতির শতছিদ্র ঢেকে রেখে; সূচের একটি ছিদ্র বিশ্লেষণ। কাঁচামালের কন্ঠ ও কাঁচামাল বেলা ছিদ্রান্বেষণের ফটোকার্ড সাংবাদিকতা চালু করে রিফাইন্ড লীগের ফেরার জন্য বিছানা প্রস্তুত করতে থাকে।
আওয়ামী লীগ কার্যত বাংলাদেশকে বাপের দেশ মনে করে; আর প্রণব মুখার্জি ও নরেন্দ্র মোদীর আশীর্বাদ পেয়ে তাদের মাঝে একটা ব্রাহ্মণভাব এসে পড়েছিলো। ফলে আওয়ামী লীগ মনে করে, সে দেশের মানুষকে ইচ্ছামতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে, তকমা দেবে, অশ্লীল গুজব ছড়াবে; এর বিপরীতে তাকে কেউ কিচ্ছুটি বলবে না। ঐ যে কালচারাল উইং আছে, তারা এসে মন্থরার ভঙ্গিতে পরমতসহিষ্ণুতা ও মিলেমিশে থাকার আলাপটা দেবে। মন্থরার পেলব কন্ঠে "বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি" শুনে বেশ কয়েকবার জনগণ আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দিলেই; তারা ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের শান্তি সম্মেলন করে, গুম-খুন-নির্যাতন-দমন-পীড়ন শুরু করেছে।
নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা লীগের এসব ভাটের আলাপকে পাঁচ পয়সার দাম দেয় না; মিডিয়ায় আওয়ামী ভাতবৃক্ষের অবিরাম ডিফেমেশন আর চরিত্রহননে বিরক্ত হলে; এসব অপসাংবাদিকতা ও শিকারী সাংবাদিকতা সহ্য করা হবে না বললে; তখন আবার আওয়ামীবাদিকরা বিবৃতি লিখে প্রেস ফ্রিডমের কুমির কান্নাটি জুড়ে দেয়। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না; বিবৃতিতে স্বাক্ষরের ভাত সৈনিকদের অভাব হয় না। আওয়ামী লীগের এই বিবৃতি কালচার সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। আগে সাইকেলে চড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ভাত ঘুম থেকে তুলে স্বাক্ষর নিতে হতো। এখন ইমেইলে বিবৃতি পাঠিয়ে ফোন করে সম্মতি নিয়ে নিলেই হয়। দেখা যাক; এইসব ধাপ্পাবাজির বিবৃতির আলকাপ নৃত্য দিয়ে রিপোর্টার ইউইদাউট বর্ডারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে কিনা আওয়ামীবাদিকেরা।
পাঠকের মন্তব্য