ফরাসী প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল (Charles de Gaulle)-এর ছেলে ফিলিপ বাম রাজনীতি করতেন। প্রেসিডেন্ট গলকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার ছেলে যে বাম রাজনীতি করে, আপনি তাকে কিছু বলেন না কেন!
প্রেসিডেন্ট গল উত্তর দেন, যে ছেলে চল্লিশের আগে বাম রাজনীতি করে না; আর চল্লিশের পর বাম রাজনীতি ছেড়ে দেয় না; তাকে দিয়ে কিছু হয় না।
ফিলিপ ঠিকই বাম রাজনীতি ছেড়ে ফরাসী নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর নটরাজ হিটলারের পতন ঘটাতে অসম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমার মধ্যে বাম রাজনীতি প্রিয়তা ছিল। বন্ধুদের অধিকাংশই ছিল বাম রাজনীতি প্রিয়। বাম রাজনীতির ছেলেরা যেহেতু স্টাডি সার্কেল করত, বই পড়ত; ফলে তাদের সঙ্গে কথা বলে আরাম ছিল। কথায় কথায় ফুটনোট দিতে হতো না; কিংবা ডার্ক হিউমার করে তা ব্যাখ্যা করতে হতো না। বাম ছেলেরা বিতর্ক প্রিয় ছিল। কিন্তু বিতর্কে আমার নাম ডাক থাকায়; পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সমীহের।
এরপর ইউরোপে গিয়ে সামাজিক গণতন্ত্রে; একই সঙ্গে সাম্য চিন্তা, পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রের মিশেলে কল্যাণরাষ্ট্রের সফল নিরীক্ষা দেখে; আমি ধীরে ধীরে সামাজিক গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ি।
দেশে ফিরে দেখি, আমার উল্লেখযোগ্য বাম বন্ধুরা আওয়ামীলীগের থিংক ট্যাংক হয়ে পড়েছে। পরিবারে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কোনো ইতিহাস না থাকার পরেও সবাইকে ধরে ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শেখাচ্ছে। শাহবাগে মাথায় পতাকা বেঁধে এমন রাগী চেহারা করে দাঁড়িয়ে; যেন কেউ সামান্য ভিন্নমত প্রকাশ করলে তাকে জল দিয়ে জ্যান্ত গিলে খাবে। এরপর আওয়ামীলীগের প্রোপাগান্ডা ও উইচ হান্টিং সেল সি আর আই-এর দায়িত্বে আমার এক একদা বাম বন্ধু এলো। আর খুব কাছ থেকে দেখা সমাজতন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তো বাংলাদেশের আকাশে উদিত হিটলারের নব্য গোয়েবলস হিসেবে কাজ শুরু করলেন। রাশেদ খান মেনন তার ফ্যাসফেসে কণ্ঠে শ্রেণি শত্রু চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিতে থাকলেন। বাদল খান আরও ক্ষেপে গিয়ে দাড়ি টুপিওয়ালাদের হত্যাযোগ্য করে তুললেন। দেখলাম কালচারাল উইং-এর বামেরা ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত।
আমাকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলেন বাম রাজনীতিক আনু মুহাম্মদ। এই একজন মানুষ জনমানুষের পক্ষে তার রাজনীতি বহাল রেখেছেন। বাম রাজনীতি থেকে আসা সেলিম রেজা নিউটন, মনোয়ার মোস্তফা জলি আর ফারোহা সুহরোয়ার্দি এই তিন অগ্রজপ্রতিম বিশ্বনাগরিক হওয়ায় সামাজিক গণতন্ত্রকে পড়তে পারছিলেন। ফলে তাদের সঙ্গে কথা বলার ও জানার আরামটা অক্ষুণ্ণ রইলো।
বঙ্গভঙ্গের পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের ছেলেরা বাম রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে আজো বামের সাজ পোশাকে সেই জমিদারের মতো ইস্ত্রির পাটভাঙ্গা নিখুঁত ব্যাপারটা রয়েছে। কারাগারে থাকলেও একদা বাম ও পরে আওয়ামীলীগের ঘাম শাজাহান খান জমিদারের মতো চলেন, বলেন ও হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে হাসেন।
সম্প্রতি ড. ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, বামেরা দেশটাকে বনসাই করে রাখতে চায়। অমনি প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন মিলেনিয়াল ও জেন জি বাম। বামের গ্রাউন্ড রুল হচ্ছে, তারা শতমুখে অন্যদের সমালোচনা করবেন, আর কেউ তাদের সমালোচনা করলেই সে শ্রেণিশত্রু হয়ে যাবে। বাম তখন বান্ধবীর সঙ্গে বসে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে শুনতে তকমা দেবে, লোকটা প্রতিক্রিয়াশীল।
পুরো ভারতে অর্থনীতিতে সবচেয়ে দুর্বল পশ্চিমবঙ্গ; এর কারণ হচ্ছে বামের বাধার মুখে বিদেশি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন সেখানে অসম্ভব। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমালোচনা করতে করতে প্রণব মুখার্জি বাম থেকে কংগ্রেস, কংগ্রেস থেকে বিজেপির মন্দিরে গিয়ে চোখ বুঁজেছেন। নিজের মেয়েকে বিজেপির টিকিটে ইলেকশন করতে বলেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক বাম ভারতেরই টাটাকে শিল্পায়ন করতে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেননি। অথচ গত এগারো বছর ধরে কপালে তিলক এঁকে বিজেপিকে ঢোকাতে আলুথালু হচ্ছেন। এই হিন্দুত্ববাদী বামেদের চোখে মুখে মুসলিম বিদ্বেষ।
এরা নাহয় ফুরিয়ে যাওয়া লোক, ক'দিন পর এদের কালীঘাটে নিয়ে যেতে হবে; কিন্তু বাংলাদেশে মিলেনিয়াল ও জেনজি বাম চোখে পড়েছে; বিরাট প্রগতিশীলের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বসে আছে। কিন্তু কপালে তিলক এঁকে চন্দনচর্চিত হয়ে পুজো আর্চা করে, জামাই ষষ্ঠীতে বাইশ রকম ভর্তা ভাজি নিয়ে খালি গায়ে বসে ফটো সেশান করে; ইসকন কেন অত্যন্ত ভালো তা নিয়ে নিবন্ধ রচনা করে। কিন্তু ইসলামপন্থীদের যে কোনো ইস্যুতে শূয়োর বলার সুযোগ হাতছাড়া করে না।
আপনি ভাবতে পারেন, কথায় কথায় মানুষকে শূয়োর বলে ডাকা; পারিবারিক পরিবেশে মুসলমানদের শূয়োর বলার চল না থাকলে; শিশু কক্ষণো এই ভাষা শেখে না। আমাদেরও মিলেনিয়াল অনুজ প্রতিম রয়েছে, জেনজি সন্তান, ভাগ্নে, ভাইপো রয়েছে; তারা কক্ষণো এই ভাষায় কথা বলতে পারবে না।
বাংলাদেশের যে মিলেনিয়ালরা মনে করে মা' খাওয়া, হো মা সা বলা খুব ট্রেন্ডি, এরা হয়তো খেয়াল করেনি, অগ্রসর সমাজের মিলেনিয়ালরা বন্ধুদের আড্ডায় ঘন ঘন এফ ওয়ার্ড ব্যবহার করলেও; তাদেরকে কোনো ফর্মাল টিভি টকশোতে ডাকলে বা পারিবারিক আড্ডায় আমন্ত্রণ জানালে; তারা কক্ষণো সেখানে 'এফ' ওয়ার্ড ব্যবহার করে না। আমরা তো বাপু ঘর হৈতে আঙ্গিনা বিদেশ না যে সিপি গ্যাং টাইপের গালি শুনে এটাই এ যুগের রীতি বলে আনন্দে থৈ থৈ করব, কী স্মার্ট আমাদের ছেলে-মেয়েগুলো, কথায় কথায় মা' খাওয়া, হোমাসা আর সান্ডা বলে।
বামেরা পশ্চিমবঙ্গকে বনসাই করে রেখেছে বলে; বাংলাদেশকেও বনসাই করে রাখবে; এটাই হয়তো ভবিতব্য। দোহা ও দুবাই বিমানবন্দর বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা উপহার দেবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রযুক্তি প্রসারের সুযোগ নিয়ে পৃথিবীর অনেক সমুদ্র বন্দরই বানিজ্য প্রসার কেন্দ্র হয়ে উঠবে। আর আমরা আমাদের মফিজ, মোকসেদ, খালেক, ধনঞ্জয়ের গম্ভীরভাবে বসে থাকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ‘যে ডালে কাকও বসে না’ বৃক্ষ হয়ে রইব। এই বৃক্ষের নিচে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের মাজারে মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বেলে লুড়ুর বুড়ুর করবে পুরোনো বন্দোবস্তের পীর-ফকির ও খাদেমেরা। প্রগতি মানে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে গান গেয়ে বেড়ানো; প্রগতি মানে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার প্রগতি নয়।
একবার ট্রেনে করে ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীতে যাচ্ছিলাম। একটা সিটে বসে এক বৃদ্ধা শুধু উসখুস করছিলেন; আর একটা পলিথিন ব্যাগ লুকাচ্ছিলেন। ভদ্রমহিলার অশান্তি দেখে এক তরুণ প্রশ্ন করে, ও খালা পলিথিনে কী আছে যা নিয়া আপনি শান্তিতে বসতে বা চোখ বুঁজতে পারছেন না; কী চুরি যাবার ভয় পাচ্ছেন।
ভদ্রমহিলা দেখান, পলিথিনে একটা ছেঁড়া পান রয়েছে।
পরবর্তী স্টেশানে নেমে তরুণ এক আঁটি পান-সুপারি-চুন এনে ভদ্রমহিলাকে উপহার দেয়। তবু ঐ ছেঁড়া পানটি নিয়ে বৃদ্ধার টেনশন একইরকম থাকে।
পাঠকের মন্তব্য