মাহফুজের মেহেফিল

৩৩৭ পঠিত ... ১৬:২০, মে ১৫, ২০২৫

24thumb

৫ আগস্টের পর আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রথম মাহফুজ আলমের একটি বক্তৃতা শুনি, যেখানে উনি বলছেন, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম মূল শক্তি যে মেহনতী মানুষ; তারা উপস্থিত নেই এই সেমিনারে।

বাংলাদেশ মিডিয়া হাসিনার ১৫ বছরে পৃথিবীর বৃহত্তম প্রধানমন্ত্রী, তাক লাগিয়ে দেওয়া মাদার অফ হিউম্যানিটি, বাগদাদের আউলিয়ার আর্য পুত্রী, তিনিই পারেন তিনিই পারবেন ইত্যাদি অতিশয়োক্তির প্রশিক্ষণে অস্থির হয়ে ৫ আগ স্টের পর মাহফুজকে জুলাই বিপ্লবের মাস্টারমাইন্ড বলে ঘোষণা দেয়।

মাস্টারমাইন্ড শব্দটা এত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যে, ঢাকাবাসী ও প্রবাসী মিলে থোকায় থোকায় মাস্টারমাইন্ডের জোনাক জ্বলতে থাকে জুলাই বৃক্ষে। কে কীভাবে কোনখানে গুরুতর অবদান না রাখলে এই অলৌকিক বিপ্লব সাধিত হতে পারত না; তার চলিষ্ণু অটোবায়োগ্রাফি অফ মাস্টারমাইন্ড শুনতে শুনতে কানটা ঝালাপালা হয়ে যায়।

ড ইউনূস যেভাবে পজিটিভ এনার্জি নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের নূরজাহান বেগমকে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন; সেই একই শৌর্যে এমেরিকার এক আলো ঝলমলে মঞ্চে মাহফুজকে পরিচয় করিয়ে দেন, ব্রেন বিহাইন্ড দিস মেটিকুলাসলি ডিজাইন্ড রেভোলিউশান বলে।

১৫ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মালিক লীগ জিয়া, খালেদা জিয়া, তারেক জিয়ার কাসুন্দিতে ব্যস্ত ছিল; তারা নতুন শত্রু খুঁজে পায়; অল্প বয়েসী একটি তরুণ মাহফুজ। অমনি ফেসবুকে ‘মেটিকুলাস’ শব্দটি নিয়ে হাকালুকি করতে থাকে আর মাহফুজের মাথায় জিন্না টুপি পরিয়ে ফটোশপ রগড় নিয়ে তা তা থৈ থৈ করতে থাকে।

মাহফুজ ‘মাস্টারমাইন্ড’ শব্দটিতে আপত্তি জানালেও কে শুনবে কার কথা; হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির তেলের বোতল টইটুম্বুর; ফলে তেলাঞ্জলিতে নেমে পড়ে তেলের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির লোকেরা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ একটু ক্ল্যারিফাই করার চেষ্টা করেন, সামষ্টিক এই আন্দোলনে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে মাহফুজের একটি ভূমিকা রয়েছে। আন্দোলনের ধাপ কী হবে, কর্মসূচির নাম কী হবে; এসব নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাহফুজের ইনপুট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ভারতে নির্বাসিত লেখক মোদি প্রগতিশীল তসলিমা নাসরিন মাহফুজকে ইসলামি জঙ্গী বলে তকমা দিলে; সেই প্রোপাগান্ডা ঘাড়ে নিয়ে দৌড়াতে থাকে আনন্দবাজার পত্রিকা। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি প্রথম থেকেই জুলাই বিপ্লবকে জিহাদি বিপ্লব বলে তকমা দিয়ে রেখেছিলেন।

মাহফুজ ছাত্রজীবন থেকেই ইতিহাস ও দর্শন নিয়ে পাঠচক্র, বিতর্ক, প্রকাশনা চর্চা করে আসছেন। তাই ১৯৪৭ সালে বৃটিশের পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে পূর্ব বঙ্গকে মুক্ত করেছিলেন যারা, সেই নেতাদের ছবি ফেসবুকে দিয়ে তাদের শ্রদ্ধা জানান।

অমনি ফেসবুকের এতিম লীগ ড ইউনূস, মাহফুজ, আসিফ, নাহিদ, সার্জিস, হাসনাতের মাথায় ফটোশপ করে জিন্না টুপি বসিয়ে রগড় করে, পা-কি-স্তা-ন। ক্ষমতা হারিয়ে লীগের ইঁদুরেরা পা-কি-স্তা-ন পা-কি-স্তা-ন করতে থাকে। ফেসবুকে হড় হড় করে বমি করতে থাকতে ললিতা ও শিবব্রত। কেউ কেউ পা-কি-স্তা-ন শব্দটা উচ্চারণের পর ভারতের টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল বৈষম্যমুক্ত সমাজ, সামাজিক সুবিচার, প্রতিটি মানুষের মর্যাদা। সেই অঙ্গীকার পূরণের ধারে কাছে না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চুইংগাম বানিয়ে চিবিয়ে হৈ চৈ বাধিয়ে চুপিসারে দেশের সম্পদ ভারত-দুবাই ও পশ্চিমের দেশগুলোতে পাচার করেছে আওয়ামীলীগের পালোয়ানেরা। ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় যাবার ঐ একই মহা চুইংগাম।

মাহফুজ তার ইতিহাস চর্চার অংশ হিসেবে প্রাচীন বাংলার একটি মানচিত্র ফেসবুকে শেয়ার করলে ভারত চোখ রাঙ্গিয়ে দেয়; আর বাংলাদেশে ভারতের কাঁচামালেরা মাহফুজরে খাইয়া ফেলুম বলে হুঙ্কার দেয়। রিপাবলিক টিভিতে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে রংপুর ও চট্টগ্রাম কেটে নেবার গ্রাফিকস প্রদর্শিত হচ্ছিলো ৫ আগস্টের পর থেকে; সেইখানে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত দখল কৌশল নির্ধারক হিসেবে। এসব দেখে তখন আমোদে চোখ মুদে আসতো কাঁচামালদের। কিন্তু ভারতকে পালটা কিছু বললেই প্রবল গোস্বা হয় তাদের।

ভারতের মিডিয়ায় ‘বাংলাদেশ ইসলামপন্থী’দের খপ্পরে এই মিথ্যাটা একশোবার শুনে বাংলাদেশে নির্বাচনে দুই-চারটা সিট পাবে কিনা ঠিক নাই; এইরকম ইসলামপন্থীরা সাপের পাঁচ পা দেখে মাজার ভাঙ্গা ও নারী পোশাক পুলিশিতে মনোযোগ দেয়। তখন আফসোস লীগ আবার পা-কি-স্তা-ন বলে রব তোলে। অথচ পাকিস্তানে মাজার সংস্কৃতি একটি ডমিনেন্ট ডিসকোর্স; আর নারীর পশ্চিমা পোশাকের চল পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশক থেকে আজ পর্যন্ত একইরকম। শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার পাকিস্তানের ওপর দিয়ে বিমান যেতে মানা করে দেয়ায়, কী আওয়ামীলীগ কী জামায়াত; কল্পনার এক পাকিস্তান নিয়ে বেচায়েন।

মাহফুজ কিন্তু ৫ আগস্টের পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ৫ আগস্টের আগে যেমন আওয়ামীলীগের রুদ্ররোষে পড়েছিলেন তিনি; ভবিষ্যতে ইসলামপন্থীদের রুদ্র রোষে পড়লে অবাক হবেন না। সেই মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে তার।

জামায়াতের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বদেশের মানুষের বিপক্ষে গিয়ে মানবতা বিরোধী অপরাধে জড়িয়ে পড়ার দায় অস্বীকার আর আওয়ামীলীগের ২০০৯-২৪ (আগস্ট ৫) স্বদেশের মানুষের বিপক্ষে গিয়ে মানবতা বিরোধী অপরাধে জড়িয়ে পড়ার দায় অস্বীকার আইডেন্টিক্যাল। যেমন আইডেন্টিক্যাল একাত্তরের অপরাধের মাস্টারমাইন্ড গোলাম আজমের ছেলে আযমীর তার পিতাকে নির্দোষ হিসেবে দাবি করা; আর ২০০৯-২৪-এর অপরাধের মাস্টারমাইন্ড শেখ হাসিনার পুত্র জয় তার মাতাকে নির্দোষ বলে দাবি করা।

আযমী ৫ আগস্টের পরপরই আয়নাঘর থেকে বেরিয়ে তার অলৌকিক গামছা ঘাড়ে নিয়ে ‘জাতীয় সংগীত’ অবমাননা করলে; আফসোস লীগ দেশ ও বিদেশে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করে। প্রণব মুখার্জির চরণ স্পর্শ করে দেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের হাতে সঁপে দিলেও জাতীয় সংগীত-পতাকার মতো দেশপূজার সরঞ্জাম ও রিচুয়াল আওয়ামী ধর্মের জরুরি অনুসঙ্গ।

আওয়ামী নিষিদ্ধের দাবিতে যমুনার সামনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের বিক্ষোভ কর্মসূচিটি ঠিকই ছিল। কিন্তু শাহবাগে আসতেই দাড়ি-টুপির কস্টিউম পরা কিছু তরুণ গোলাম আজমের বাংলাদেশ কল্পনা করে স্লোগান দিয়ে ও জাতীয় সংগীত গাইতে মানা করায় আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চুইংগাম এসে পড়ে কালচারাল উইং-এর মুখে। তারা আওয়ামীলীগের প্লে বুক ফলো করে জাতীয় সংগীতের সুনামি বইয়ে দেয়।

শাহবাগে কতিপয় দাড়ি টুপির ঐ স্লোগান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছেলে-মেয়েদের বিব্রত করে। মাহফুজ তখন আওয়ামীলীগের প্লে বুক অনুসরণ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্লে বুক থেকে রাজাকার, পাকিস্তান এসব তকমা নিয়ে হাজির হন। যেসব তকমা হাসিনার পতন ঘটিয়েছে।

শৈশব থেকে শুনছি, হাসিনা বলেন, বিএনপি পাকিস্তানপন্থী । অথচ হাসিনার পনেরো বছরে বিএনপির প্রায় চার হাজার নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন, লাখ লাখ কর্মী কারাবরণ করেছেন; কিন্তু কেউ জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেননি। অন্যদিকে ৫ আগস্ট হাসিনা পাখিও ভারতে উড়ে গেলে হাজার হাজার আওয়ামী নেতা-কর্মী ভারতে আশ্রয় নেন। এ থেকে বোঝা যায়, নিজেদের ভারত দুর্বলতার কারণে প্রতিপক্ষকে পাকিস্তানপন্থার ট্যাবুর মালা পরিয়ে গান্ধা কইরা দেওয়ার ভিলেজ পলিটিক্স এটা। তা নাহলে ৫৪ বছর আগের দূরতম ভূগোল; বিস্মৃত অতীতকে আওয়ামীওলীগ কেন ভিজিয়ে রাখবে দুই নয়নের ছলে।

আমার পরামর্শ হচ্ছে সেভেন্টি ওয়ান ডিনাইয়াল 'ল' করে দেওয়া। একাত্তর অস্বীকার বেআইনি হলে জামায়াত কিংবা দাড়ি টুপির কস্টিউমে কাঁচামালের দিনমজুরেরা ‘গোলাম আজম’ বিষয়ক স্লোগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চুইংগাম তুলে দিতে পারবে না আওয়ামীলীগ ও কালচারাল উইং-এর মুখে। তখন নন ইস্যুকে ইস্যু করার হৈ চৈ এর আড়ালে দেশ লুণ্ঠনের হাত সাফাই-এর খেলাটা বন্ধ হয়ে যাবে।

মাহফুজ হিন্দুত্ববাদী আওয়ামীলীগ ও ইসলামপন্থী জামায়াতের রুদ্ররোষে পড়েছেন। তার মানে উনি ঠিক পথেই আছেন। নতুন বন্দোবস্ত মানে অন্তর্ভূক্তিমূলক বৈষম্যমুক্ত সমাজ। গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছিপছিপে তরুণ মাহফুজের মাথায় পানির বোতল ছুঁড়ে মেরেছে। জীবন বাজি রেখে ৫ আগস্টে যারা দেশকে রাক্ষসমুক্ত করেছে; তাদের প্রতি কৃতঘ্ন হওয়াটাও আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি।

ফেসবুকে দেখি তো, বুড়ো হাবড়ারা পারলে জুলাই বিপ্লবীদের জল দিয়ে জ্যান্ত গিলে খায়; সেখানে ঐ ছিপছিপে তরুণ তো একটা পানির বোতল ছুঁড়ে মেরেছে। ফ্রান্সের ম্যারখঁ, ক্যানাডার জাস্টিন ট্রুডো, এমেরিকার বারাক ওবামার মাথায় এমন বোতল ছুঁড়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। তারা যেহেতু এনলাইটেনমেন্টের মানুষ; তাই হামলাকারীকে শূলে চড়াননি। অন্যদিকে গত পনেরো বছরে আমরা দেখেছি, ফেসবুকে একটা অপছন্দের বাক্য ছুঁড়ে মারার অপরাধে লেখক মুশতাককে কারাগারে হ*ত্যা করা হয়েছে। সেই অন্ধকার অপশাসন থেকে মুক্তির আনন্দই তো জুলাই বিপ্লবের প্রাপ্তি।

আমি আনন্দিত যে, যে কালচারাল উইং নয় মাস ধরে মাহফুজকে পালনবাদের পালং শাক, মৌলবাদি ইত্যাদি বলে গঞ্জনা করেছে; তারা মাহফুজের মাথায় বোতল ছুঁড়ে মারায় কাল সারারাত শুধু কেঁদেছে, অপরাধী ছিপছিপে তরুণকে হায়নাঘরে নিয়ে যাবার ও উটের ডিম দেবার লীগের প্লে বুক পরামর্শ রেখেছে আকুল হয়ে।

মাহফুজের পথচলা আলোকসম্ভবা হোক; রাজনীতির বন্ধুর পথে হেঁটে বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার লড়াইয়ে যদি জীবনব্যাপী যোদ্ধা হতে পারেন তিনি; তাহলে এইসব কথাকলির আসরে মাহফুজের মেহেফিল জীবনদায়ী হবে।

 

৩৩৭ পঠিত ... ১৬:২০, মে ১৫, ২০২৫

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top