কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর জীবনের ৮টি ঘটনা যা বাঙালি নারীদের জীবনপথ বদলে দিয়েছিল

৭২৮ পঠিত ... ২০:১৭, জুলাই ১৮, ২০২১

kadombini debi

১# কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকে তার বাবা ১৪ বছর বয়সে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েদের একটি বোর্ডিং স্কুলে। বাবা ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রদূত। তাই কিশোর বয়স থেকেই কাদম্বিনীদেবী পড়াশুনা নিয়ে হয়ে উঠেছিলেন সচেতন। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার কোন চল সেসময় ছিল না, ফলে মেয়েদের পড়ার জন্য কোন কলেজই ছিল না। কাদম্বিনীর লেখাপড়ার জন্যই বেথুন স্কুল প্রথমে এফ.এ. (ফার্স্ট আর্টস- বর্তমানের উচ্চ মাধ্যমিক সমমান) ও পরে বি.এ. ক্লাস চালু করে। বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বেথুন স্কুলকে কলেজে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্তে বাংলায় সাড়া পড়ে যায়।

তার সাথে বি.এ পড়তে যোগ দেন চন্দ্রমূখী বসু। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে দু'জন প্রথম নারী গ্র‍্যাজুয়েট হিসেবে বিএ পাশ করে ইতিহাস গড়েন। একটি সাধারণ স্কুলে শুধুমাত্র তাঁর প্রচেষ্টায় শুরু হয় কলেজ এরপর স্নাতক ডিগ্রি দেওয়ার প্রচলন। 

 

২# স্নাতক হবার আগেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেডিকেল পড়বেন। কিন্তু তার সামনে বাঁধার পাহাড় হয়ে দাড়ায় সমাজ, মেডিকেল কাউন্সিল এমনকি খোদ শিক্ষক ও অন্যান্য ছাত্ররা। নারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়বে এটা সেসময় সমাজ ভাবতেও পারত না। বিশেষ করে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে মেয়েদের সামনে বিস্তারিত আলোচনা ও পাঠদান তখন শিক্ষকদের জন্য ছিল খুবই অস্বস্তিকর। আর ক্লাসে একমাত্র ছাত্রী ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলি। বহু প্রতিরোধের দেয়াল ডিঙিয়ে এবং রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত কাদম্বিনী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। 

‘দ্য উইম্যান্স হেরাল্ড’ নামে ইংরেজি একটি পত্রিকায় অগাস্ট ১৮৯৩ সালে কাদম্বিনীর শিক্ষাজীবনের সংগ্রাম নিয়ে এক নিবন্ধে লেখা হয়, কাদম্বিনীকে ডাক্তারি না পড়ার কারণ হিসাবে বলা হয়েছিল ডাক্তারি পড়তে গেলে পুরুষদের কাছ থেকে তাকে অপমান সহ্য করতে হতে পারে। পত্রিকায় লেখা হয়, কাদম্বিনী বলেছিলেন তিনি সবরকম অপমান সহ্য করতে প্রস্তুত আছেন। ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী এক বছর ক্লাসে তিনি ২০০ জন পুরুষের মধ্যে ছিলেন একমাত্র নারী।

 

৩# পেশার জন্য তার চরিত্রের ওপরও ছাঁপ ফালানোর চেষ্টা করা হয়। সে সময়কার একটি পত্রিকা বঙ্গবাসী কাগজে একটি কার্টুন প্রকাশিত হয়, যাতে দেখানো হয়েছিল, কাদম্বিনী তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাকে দড়ি বেঁধে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। তার নীচে লেখা ছিল কুরুচিকর নানা মন্তব্য। (তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার)। আবার একটি ঘটনার খবর প্রসঙ্গে তার রাতে রোগী দেখতে যাওয়ার বিষয়ে কটাক্ষ করে তাকে "নটী" উল্লেখ করে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা হয় "তিনি কি ডাক্তারি করেন না কি বেশ্যাবৃত্তি করেন?" (সূত্র: বিবিসি বাংলা) 

তবে তেজস্বিনী নারী কাদম্বিনী পত্রিকার সম্পাদককে ছেড়ে দেননি। তিনি ও তার স্বামী দ্বারকানাথ আদালতে অভিযোগ জানান । বিচারে সম্পাদকের ছয় মাসের জেল ও জরিমানা হয় এবং মানহানির ক্ষতিপূরণ হিসাবে কাদম্বিনীকে দেয়া হয় তিন হাজার টাকা। একজন নারীর এই সাহস সমাজে রীতিমত তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। 

 

৪# মেডিকেল কলেজের একজন অতি রক্ষণশীল বাঙালি অধ্যাপক যিনি গোড়া থেকেই কাদম্বিনীর ডাক্তারি পড়ার বিষয়ে খোলাখুলি প্রতিবাদ করেছিলেন, তিনি কাদম্বিনীকে পরীক্ষা পাশের জন্য প্রয়োজনীয় নম্বর দেননি বলে কথিত আছে। মাত্র এক নম্বরের জন্য ফেইল করিয়ে দেন তিনি। এরপর তাকে এলএমএসের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালে। কিন্তু দু'বছর এলএমএস পড়ার পরে ফাইনালে ফের কাদম্বিনীকে অকৃতকার্য দেখানো হয়। এরপর অধ্যক্ষ কোটস নিজের অধিকার প্রয়োগ করে কাদম্বিনীকে 'গ্র্যাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ' বা জিবিএমসি উপাধি দেন, যার ফলে ডাক্তার হিসাবে প্র্যাকটিস করার ছাড়পত্র পান কাদম্বিনী গাঙ্গুলি। 

 

৫# ডাক্তারি পড়া শেষে ইডেন হাসপাতালে প্র‍্যাকটিস শুরু করেন। কিন্তু সেখানে ডাক্তার হিসাবে তাকে গণ্য করা হত না, সেখানে তাকে নার্সের মর্যাদা দেওয়া হত। রোগ নির্ণয় বা অস্ত্রোপচার করতে দেওয়া হত না।

এরপর লেডি ডাফরিন হাসপাতালে তার চিকিৎসার সুযোগ হয় ১৮৯০ সালে। সেই কাজ পেতে কাদম্বিনীর জন্য তদ্বির করেছিলেন স্বয়ং ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গল। কিন্তু সেখানে ইংল্যান্ডের ডাক্তারদের প্রতিপত্তির কারণে সুযোগ পায়না কাদম্বিনীদেবী। 

 

৬# স্নাতক হবার কিছুদিনের মধ্যেই তার থেকে বয়সে অনেক বড়, বিপত্নীক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলিকে কাদম্বিনী বিয়ে করেছিলেন, যিনি ছিলেন একজন ব্রাহ্ম সমাজ সংস্কারক, এবং নারী শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম একজন কর্ণধার। তাদের এই বিয়ে নিয়েও সমাজে নানা কথাবার্তা উঠেছিল, তৈরি হয়েছিল তুমুল আলোড়ন। 

 

৭# আট সন্তানকে কলকাতায় রেখে স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় কাদম্বিনী ১৮৯৩ সালে ইংল্যান্ডে যান চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা নেবার জন্য। এক বিদেশি মহিলার সঙ্গিনী হয়ে জাহাজে একা বিদেশযাত্রা করেন।

ক্লাস করতেন তিনি স্কটল্যান্ডে। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে স্কটিশ কলেজের তিনটি ডিপ্লোমা অর্জন করে তিনি দেশে ফিরে যান। দক্ষিণ এশিয়ায় তিনিই প্রথম মহিলা ডাক্তার, যিনি ডাক্তারি শাস্ত্রের তিন-তিনটি বিলিতি ডিগ্রি লাভ করেন!  

 

৮# এশিয়ার প্রথম এই পেশাজীবী নারী চিকিৎসক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পুরুষশাসিত সমাজে আত্মমর্যাদা পেতে লড়াই চালিয়ে গেছেন, নিজের যোগ্যতা প্রমাণে শেষ দিন পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়ে গেছেন। কদিম্বিনীর প্রপৌত্র রাজীব গাঙ্গুলি বলছিলেন: "ঠাকুমার কাছে শুনেছি, কঠিন কেসে সফলভাবে প্রসব বা অস্ত্রোপচারের পর কাদম্বিনীকে যখন খেতে দেয়া হয়েছে, তাকে ঘরের ভেতর আসন দেয়া হয়নি। এমন একটা বাড়িতে কাদম্বিনীর সাথে গিয়েছিলেন আমার ঠাকুমা।

"কাদম্বিনীকে বাইরে বসে খেতে বলেছিল, থালাবাটি ধুয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে দিয়ে যেতে বলেছিল। অপমানে আমার ঠাকুমার চোখে জল এসেছিল। তখন কাদম্বিনী ইংল্যান্ড ফেরত ডাক্তার।"

 

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার ও বিবিসি বাংলা থেকে সংগৃহীত

৭২৮ পঠিত ... ২০:১৭, জুলাই ১৮, ২০২১

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top