ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বর্নাঢ্য জীবনের কিছু টুকরো ঘটনা

১১৬৬ পঠিত ... ১৫:২০, অক্টোবর ২৪, ২০২০

‘বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনতে পেরেছি। তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও ওয়ান-ইলেভেনের সময় জেল থেকে মুক্ত করে এনেছি। আবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়াকেও জেল থেকে মুক্ত করতে পেরেছি। এটাই বড় পাওয়া। এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।’

উক্তিটি ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের। সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক শুধু প্রতিথযশা আইনজীবীই ছিলেন না, সমাজসেবক হয়ে দেশের নানা সংকটে ভূমিকাও রেখেছেন বলিষ্ঠভাবে। 

প্রয়াত এই আইনজীবির বিভিন্ন টুকরো ঘটনা তুলে ধরা হলো eআরকির পাঠকদের জন্য-


 

একই সাথে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী ছিলেন তিনি

২০০৭ সালের পর ফখরুদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিএনপি নেতা খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা সহ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেই মামলা করে তৎকালীন সরকার।

সেসময় রফিকুল হক শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়ের স্বপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় না থাকার কারণেই দুই দলের নেত্রীর পক্ষে আইনজীবী হতে পেরেছিলেন তিনি।

"বাংলাদেশের বাস্তবতায় যে কোনো সিনিয়র আইনজীবীর কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকে। যেই অল্প কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না, রফিকুল হক ছিলেন তাদের একজন।"

‘বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনতে পেরেছি। তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও ওয়ান-ইলেভেনের সময় জেল থেকে মুক্ত করে এনেছি। আবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়াকেও জেল থেকে মুক্ত করতে পেরেছি। এটাই বড় পাওয়া। এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।’

 

অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে এক টাকাও বেতন নেননি

১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক উল হক। এ সময়ে তিনি কোনও সম্মানী নেননি। প্রতীকী সম্মানী এক টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এক টাকা তুলতে দুই টাকার স্ট্যাম্প লাগাতে হবে, সে কারণে তাও নেননি।

বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘তিনি একাধারে নির্লোভ, নীতিবান ও সৎ মানুষ ছিলেন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে কোনও বেতন নেননি। অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে তিনি নিজেকে সরকার নয়, জনগণের সেবক মনে করতেন। তার মৃত্যুতে আইন অঙ্গনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।

 

উপার্জনের একটা বড় অংশ খরচ করেছেন জনহিতকর কাজে

আইন পেশায় সফলতা হিসেবে অনেক অর্থ উপার্জন করেছেন প্রবীণ এই আইনজীবী; যার বড় অংশই খরচ করেছেন সমাজসেবায় ও মানুষের কল্যাণে। প্রতিষ্ঠা করেছেন বেশ কয়েকটি হাসপাতাল, এতিমখানা, মসজিদ ও মেডিকেল কলেজ।

নিজে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে। তাই গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় প্রবল টান ছিল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এখন একটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ হচ্ছে। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন সুবর্ণ ক্লিনিক। ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা ছিল এই আইনজীবীর।

বারডেম হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ও নূরজাহান ওয়ার্ড, আহছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল এবং আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান রফিক-উল হক। অন্তত ২৫টিরও বেশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন।

ব্যারিস্টার রফিক বলতেন, ‘আমি আমার উত্তরসূরিদের জন্য একটি টাকাও ব্যাংকে রেখে যেতে চাই না। মানবতার সেবায় সব কিছু ইনভেস্ট করে চেতে চাই।’

 

তুঙ্গস্পর্শী ছাত্র জীবন আর ক্যারিয়ার কাটিয়ে গেছেন

রফিক-উল হক ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯৫১ সালে। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। তিনি ১৯৬১ সালে ব্যারিস্টার (বার-এট-ল) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে লিংকনস ইন-এ ডাক পান।

এরপর আইনজীবী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে যোগ দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফৌজদারি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।

ওই বিষয়ে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদকও পেয়েছিলেন। এরপর বার-অ্যাট-ল করতে গিয়েও তিনি ব্রিটেনে সাড়া জাগিয়ে ফেলেন। খুব ভালো ফল করে তাঁক লাগিয়ে দেন সবাইকে। হিন্দু আইন নিয়ে বার-অ্যাট-ল করেছেন। সেখানেও প্রথম স্থান অধিকার করেন। তারপর তিনি জাতীয়তা পরিবর্তন করেন।

তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যখন শুনলেন রফিক-উল হক ব্যারিস্টারিতে হিন্দু ল-তে ফার্স্ট হয়েছেন, তখন তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়ে নিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু আইন পাঠ্য হয় তখনই। রফিক-উল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পরীক্ষক (একজামিনার) ছিলেন। তাঁর সময় ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক হোসেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, রেহমান সোবহানের স্ত্রী সালমা সোবহান ছিলেন। ড. এম জহির পরে আসেন। সবাই খুব নামকরা ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কাজ করে খুব তৃপ্তিতে থাকতেন ব্যারিস্টার রফিক।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী রফিক-উল হক ৮৫ বছর বয়সে ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে মারা যান।

১১৬৬ পঠিত ... ১৫:২০, অক্টোবর ২৪, ২০২০

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top