ফিক্সিংয়ের শিকার হয়ে একটি ‘ঐতিহাসিক’ টেস্ট ম্যাচ যেভাবে ‘নাটক’ হয়ে গেলো

৮২২ পঠিত ... ২১:২৮, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরা অনেক পুরনো এককটা ব্যাপার। বাজির হাত ধরে একসময় ক্রিকেটে চলে আসে ফিক্সিং। নব্বইয়ের দশকজুড়ে ক্রিকেটে, বিশেষ করে উপমহাদেশে, ফিক্সিং ছিল বেশ আলোচনার বিষয়। ২০০০ সালে এসে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ হতে থাকে ক্রিকেটবিশ্বে। প্রকাশিত হতে থাকে ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত তারকা খেলোয়াড়দের নাম। তাদেরই একজন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়ে। ক্রোনিয়ের বিরুদ্ধে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হবার মাধ্যমে অন্য অনেক কিছুর সাথে মিথ্যে হয়ে যায় একটি ‘ঐতিহাসিক’ টেস্ট ম্যাচ। সেটিরই গল্প শুনুন!   

২০০০ সালের জানুয়ারি মাস, দক্ষিণ আফ্রিকায় চলছে গ্রীষ্মকাল। দক্ষিণ গোলার্ধ্বের ক্রিকেটীয় দেশগুলোতে এই সময়টায় ক্রিকেটারদের প্রচণ্ড ব্যস্ততা থাকে। উত্তরের দলগুলোর বিপক্ষে ঘরের মাটিতে বেশ বড়সড় সিরিজ খেলতে হয়। প্রায় ৪ মাস দীর্ঘ সফরে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল তখন দক্ষিণ আফ্রিকায়। ৫ টেস্ট ম্যাচ সিরিজের প্রথম ৪ ম্যাচ শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেই নিয়েছে। 

১৪ জানুয়ারি সেঞ্চুরিয়নে শুরু হলো শেষ ম্যাচ। টসে জিতে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোয় ওস্তাদ ইংলিশ অধিনায়ক নাসির হুসেইন দক্ষিণ আফ্রিকাকেও পাঠালেন ব্যাট করতে। ব্যাটিংয়ে নেমেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে বিপদে প্রোটিয়া দল। খানিক বাদে অধিনায়ক ক্রোনিয়েও ডাক মারলেন। প্রথম দিনের ৪৫ ওভার খেলা শেষে ইংল্যান্ডের অপেক্ষাকৃত দুর্বল বোলিংয়ের বিপক্ষে আফ্রিকার স্কোর যখন ১৫৫/৬ তখনই শুরু হলো বৃষ্টি। যেন তেন বৃষ্টি নয়, একেবারে যেন ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড’ উপন্যাসের মাকুন্দো গ্রামের সেই বৃষ্টি।

বৃষ্টিতে ভেসে গেল বাকি দিন। পরের দুই দিনও তুমুল বৃষ্টি। চতুর্থ দিন এসে বৃষ্টি একেবারে কমে আসল। কিন্তু আগের দুই দিনে মাঠের বারোটা বেজে গেছে, খেলা সম্ভব নয়। আবহাওয়া অফিস জানাল, পঞ্চম দিন আকাশ থাকবে মেঘমুক্ত। আর কিউরেটর জানালেন, সেদিন মাঠও হয়ে উঠবে একেবারে খেলার উপযোগী। এই খবর জেনে প্রোটিয়া কাপ্তান ক্রোনিয়ে করে বসলেন এক অভাবনীয় কাণ্ড। এমন কিছু যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এর আগে কখনো দেখেনি। পরবর্তী সময়েও আর এমনটা দেখেনি ক্রিকেট। 

ম্যাড়ম্যাড়ে পরিণতি পেতে যাওয়া নিশ্চিত ড্র টেস্ট ম্যাচে তিনি উত্তেজনা নিয়ে আসার ইচ্ছা পোষণ করেন। শেষ দিনের আগের রাতে ক্রনিয়ে এক অদ্ভুত প্রস্তাব পাঠান ইংলিশ দলের কাছে। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকা ১ম ইনিংস আগের অবস্থাতেই ডিক্লিয়ার দিয়ে দিবে। ইংল্যান্ডকেও ০ রানে ডিক্লিয়ার দিতে হবে ইনিংস। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকা ২য় ইনিংসও ডিক্লিয়ার দিয়ে দিলে, দুই দলের আপোষে ঠিক করা একটি টার্গেট নিয়ে শেষ দিন ব্যাট করতে নামবে ইংল্যান্ড। শুরুতে এই প্রস্তাবে নিজ দলের খেলোয়াড়রাই সম্মতি দেননি। পরে কিছু সিনিয়রের মধ্যস্থতায় তারা রাজি হলে প্রস্তাবটি পাঠানো হয় ইংল্যান্ড দলের কাছে।

এমন আচমকা প্রস্তাবে স্বাভাবিকভাবেই ইংল্যান্ড মোটেই সম্মতি দেয়নি। বিশেষ টানা ৩ দিনের বৃষ্টির পর পিচের অবস্থা কী, তা না জেনেই খেলতে নেমে পড়া তো আত্মহত্যারই সামিল। নাসের হুসেইনের স্পষ্ট উত্তর ছিল, ‘না’। হ্যান্সি ক্রোনিয়ে আবার ইংল্যান্ডের জন্য ৭৩ ওভারে ২৭০ রানের টার্গেট প্রস্তাব করলেও নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে ইংল্যান্ড। 

তবে হেরে যাওয়া সিরিজে একটা শেষ সুযোগ এবং একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ক্রিকেটিয় স্পিরিটকে চাঙ্গা করে তুলতে, ইংল্যান্ডও আংশিক রাজি হয় তাতে। তারা পাল্টা দাবি করে, পঞ্চম দিনের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নামতে হবে ব্যাটিংয়ে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা যদি অলআউট নাও হয়, ক্রোনিয়ে একটা চ্যালেঞ্জিং স্কোরের মুখে দাঁড়িয়ে ডিক্লিয়ার দিবেন। সেই কথাই রইল!

শেষ দিনের খেলা শুরু হলো। আগের রাতে একটু বেশি পান করে ফেলা ইংলিশ বোলার ড্যারেন গফ তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি হ্যাংওভার। ঘটনাটি বুঝতে পেরে অধিনায়ক তাকে দিয়েই অনেক ওভার বল করালেন শাস্তিস্বরূপ। হ্যাংওভারে থাকা বোলারকে পিটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা অল্প কিছু ওভার খেলেই রান যখন নিয়ে গেল ৮ উইকেটে ২৪৮-এ। তখনই একটু  তাড়াহুড়ো করেই যেন ইনিংস ঘোষণা করে দিনেল ক্রোনিয়ে। 

আগের কথা মতো, মুহূর্তের মধ্যে মাঠে কোন বল না গড়িয়েই ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার ১টি করে ইনিংস ডিক্লিয়ার হয়ে গেল। ইংল্যান্ডের সামনে তখন ২৪৯ রানের লক্ষ্য। দিনের তখনো প্রায় পুরোটা বাকি। এর মাঝে বিস্মিত নাসের হুসেইন দেখলেন, ক্রোনিয়ে কোন ওভারের লিমিটও বেঁধে দেননি ইংল্যান্ডকে। ইংল্যান্ডের সামনে তখন অনন্ত সময়। খুশি মনেই খেলতে নামে ইংল্যান্ড এবং দিনের একেবারে শেষ ওভারে ৫ বল বাকি থাকতে ম্যাচটি জিতেও যায় ২ উইকেটে।

আইসিসি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছিল ক্রোনিয়ের ভূমিকাকে। হেরে যাওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক ক্রিকেটারও বেশ সমালোচনা করেছিল অধিনায়কের। তবে বাকি পুরো ক্রিকেটবিশ্ব প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছিল ক্রোনিয়েকে। দর্শকদের কথা চিন্তা করে তার এমন সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করেছিলেন অনেকে। একটা মরা খেলাকেও যে এভাবে বাঁচিয়ে তোলা যায়, সেটিরই যেন এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন ক্রোনিয়ে।

পরের গল্পটা কলঙ্কের। আগের কয়েক বছর ধরেই ভারত-পাকিস্তানের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটও ছিল আইসিসির আতশ কাচের নিচে। ঐ বছরের মার্চেই ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জেতে প্রোটিয়ারা। সেই সিরিজ চলাকালেই এক জুয়াড়ির সাথে ক্রোনিয়ের ফোনকলের টেপ পায় দিল্লী পুলিশ। ক্রোনিয়ে খুঁড়তে গিয়ে একে একে বেরোতে থাকে ভারতীয় অধিনায়ক আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, হার্শেল গিবস, নিকি বোয়েসহ আরও নাম। 

স্বীকারোক্তি দেন ক্রোনিয়ে। জানা যায়, আগেও অনেকবার জুয়াড়ির প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিলেন। এবং মাস দুয়েক আগেই সেঞ্চুরিয়নের সেই ‘ঐতিহাসিক’ টেস্ট ম্যাচটি ছিল পাতানো। দলকে হারিয়ে দিতেই অত কাহিনী করেছিলেন তিনি। ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ হন ক্রোনিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে যিনি চলে যাচ্ছিলেন এক লিজেন্ডের কাতারে, তাকেই স্বর্গচ্যুত হয়ে নেমে আসতে হলো মাটিতে। এর ১৮ মাস পরে এক রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণটাও হারাতে হলো। 

ক্রিকেটে ফিক্সিং বা পাতানো তখনো নতুন কিছু ছিল না। তবে ক্রোনিয়ে-আজহারউদ্দিন কান্ড দিয়েই বিষয়টি কাঁপিয়ে দিয়েছিল ক্রিকেটবিশ্বকে। এরপর আবার বিশ্বব্যাপী আলোচনায় এসেছিল ২০১০ সালে মোহাম্মদ আমিরের নো বল কেলেঙ্কারিতে। আর বাংলাদেশে মোহাম্মদ আশরাফুলের বিপিএল ফিক্সিং দিয়ে। 

৮২২ পঠিত ... ২১:২৮, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top