একটু খেয়াল রাইখেন। ইয়াসমিনের মতো যেন এখনকার ইয়াসমিনদের নিয়ে আমাদের রাস্তায় নামতে না হয়…

২০৬০ পঠিত ... ১৩:৪৯, মার্চ ০৮, ২০২৬

 

 

রিকশাচালক বাবা মারা যাওয়ার পর শরীফা বেগমের সংসারে নেমে আসে অভাব অনটনের কালো ছায়া। একমাত্র মেয়ে ইয়াসমিন তখন পড়ত ক্লাস ফাইভে, দিনাজপুরের লালবাগের কোহিনূর স্কুলে। কিন্তু এমন পরিবারগুলোতে বাবা না থাকলে যা হয়, তাই হলো। ইয়াসমিনের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেল। অভাবের সাথে না পেরে ১২ বছরের ইয়াসমিনকে ১৯৯২ সালে ঢাকায় একটি বাসায় কাজ করতে পাঠায় তার মা।

ঢাকায় ধানমণ্ডির একটা বাসায় কাজ করত ইয়াসমিন। এই বাসার মালিকও ছিলেন দিনাজপুরের মানুষ। কিন্তু তিন বছরেও ইয়াসমিন একটা দিন ছুটি পায়নি যে মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে। সেসময় তো এত দ্রুত যোগাযোগেরও উপায় ছিল না। কিন্তু ইয়াসমিনের মন ছটফট করে মা কে এক নজর দেখার জন্য। বাসার মালিককে জানালে তিনি বলেন সামনের পূজার ছুটিতে বাড়ি যেতে।

কিশোরী ইয়াসমিন মাকে দেখার প্রবল টানে ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট, বাসার ছেলেটিকে স্কুলে দিয়ে আর সেই ঘরে ফেরে না। উঠে পড়ে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁওয়ের এক বাসে। রাত তিনটার দিকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামে ইয়াসমিন। তার সাথে নামে জয়ন্ত নামের একটি ছেলে যে বাসে ইয়াসমিনকে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিল। 

রাত তিনটায় চারিদিকে ফাঁকাই হবে। তবে খোলা ছিল কিছু চা-পানের দোকান। বাসের সুপারভাইজার এক পান দোকানি জাবেদ আলী, ওসমান গনি, রহিমসহ স্থানীয় মানুষদের কাছে ইয়াসমিনের দায়িত্ব দিয়ে অনুরোধ করেন যেন সকাল হলে তাকে দিনাজপুর শহরের কোনো গাড়িতে তুলে দেন তারা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আসে একটি টহল পুলিশের ভ্যান। সেখানে ছিল তিনজন পুলিশ, একজন এএসআই এবং দুইজন কনস্টেবল। তারা ইয়াসমিনকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চায়। ইয়াসমিন রাজি না থাকলেও পুলিশেরা জোর করে নিয়ে যেতে চায়। এসময় জয়ন্তও যেতে চাইলে তাকে পুলিশেরা নেয় না। এলাকাবাসীও পুলিশের সাথে ঝামেলা না করে ইয়াসমিনকে তাদের ভ্যানে তুলে দেয়।

তবে সেদিন রাতে পুলিশের ভ্যান ইয়াসমিনের গন্তব্যে যায়নি। গিয়েছিল দশমাইলের সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক স্কুলে। সেখানে এই পুলিশ সদস্যরা ইয়াসমিনকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে হত্যা করে। এরপর তার লাশ রাস্তার পাশে ফেলে রাখে। এরজন্য তারা নাটকও সাজায়। দশ মাইলের কিছু মানুষ রাস্তায় দেখে, এই তিনজন পুলিশ টর্চ দিয়ে কিছু একটা বা কাউকে খুঁজছে। এ সময় ওই স্কুলের দিক থেকে ধান বোঝাই দুটি রিকশাভ্যান আসছিল। পুলিশ তাদেরকে জিজ্ঞেস করে যে, তাদের পিকআপ থেকে যে মেয়েটি লাফ দিয়েছে তাকে তারা দেখেছে কি না? তারা জানায় তারা দেখেনি। ঠিক ওই সময় ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী আরেকটি বাস ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সেই বাসের হেডলাইটের আলোয় পুলিশ ও রিকশাভ্যান চালকেরা দেখতে পায়, ইয়াসমিন রাস্তার উপর পড়ে আছে। এরপর পুলিশেরা তাকে তাদের ভ্যানে তুলে নেয়। পরে আশপাশের এলাকার লোকজন সাধনা প্রাইমারি স্কুলের সামনে রাস্তায় রক্তের দাগ দেখতে পান। সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল ইয়াসমিনের জুতা, রুমাল, হাতপাখা ও ভাঙা চুড়ি। এসব দেখে তারা ঘটনাস্থল থেকে আবার দশমাইল মোড়ে ফিরে যান। এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর গোবিন্দপুর সড়কে ব্র্যাক অফিসের সামনে ইয়াসমিনের মৃতদেহ পাওয়া যায়।

পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। শুরুতেই ইয়াসমিনের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির উদ্দেশ্যে কোতোয়ালী থানার এসআই স্বপন কুমার প্রকাশ্যে জনতার সামনেই লাশ উলঙ্গ করে ফেলে, যা উপস্থিত জনতার মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ফলে দ্রুত ঘটনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে সবার মাঝে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ‘একজন অজ্ঞাতপরিচয় যুবতীর লাশ উদ্ধার’ বলে একটি ইউডি মামলা দায়ের করে। পরে তড়িঘড়ি ময়নাতদন্ত শেষ করে আঞ্জুমান-ই-মফিদুলের মাধ্যমে বালুবাড়ি শেখ জাহাঙ্গীর গোরস্থানে লাশ দাফন করা হয়। সেই দাফনে লাশের কোনো গোসল বা জানাজাও করা হয়নি।

ততক্ষণে জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের আগুন। বিভিন্ন সংস্থা, সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসতে থাকে ইয়াসমিনের হত্যার বিচারের জন্য।

১৯৯৫ সালের ২৫ আগস্ট দিনাজপুর শহরের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে ঘটনাটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী ও বিভিন্ন ধরনের খবর প্রকাশিত হয়। ফলে জনগণের মাঝে রহস্য, বিভ্রান্তি ও গুজব আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং বিষয়টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে নানা রহস্যময় কাণ্ড ঘটায়। এরই অংশ হিসেবে তারা কিছু স্থানীয় সাংবাদিককে প্রভাবিত বা কিনে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং নিহত ইয়াসমিনকে ‘পতিতা বানু’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালায়। আরও অভিযোগ ছিল, দরদামে সমঝোতা না হওয়া এবং কিছু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের নেপথ্য ইন্ধনে কয়েকটি সংবাদপত্র ঘটনাটিকে অস্বাভাবিক ও পরস্পরবিরোধীভাবে উপস্থাপন করে।

১৯৯৫ সালের ২৬ আগস্ট ঘটনার প্রতিবাদে রামনগর মোড়ে সভা আহ্বানের জন্য মাইকিং শুরু হয়। কিন্তু মাইকিং করা রিকশা কোতোয়ালি থানা এলাকা পার হওয়ার সময় পুলিশ মাইক ভেঙে দেয়। খবরটি রামনগরে পৌঁছালে আশপাশের এলাকার মানুষ সংগঠিত হতে শুরু করে। সেদিন সন্ধ্যায় রামনগর মোড়ে ইয়াসমিনের গায়েবি জানাজা হয়। জানাজা শেষে রাত দশটার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল নিয়ে কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে এবং অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদ, ন্যায্য বিচার ও শাস্তি দাবি জানায়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে, এতে আট–দশজন আহত হন এবং ছয় রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। গুলির খবর ছড়িয়ে পড়লে আরও শত শত মানুষ সেখানে যোগ দেয় এবং সারা রাত থানা অবরোধ করে রাখে।

একজন পরিচিত কিশোরীকে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ ও ‘পতিতা’ বানানোর চেষ্টা, জনসম্মুখে লাশ বেআব্রু করা, গোসল ও জানাজা ছাড়া গোপনে দাফন, কবর পাহারা দেওয়া এবং ‘বানু’ নামে আরেকজনকে হত্যা করে লাশ বদলের গুঞ্জন—এসব রহস্যময় আচরণ জনমনে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে।

২৭ আগস্ট সকাল থেকে শহর থমথমে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনতা জড়ো হয় এবং সকাল ১১টার দিকে ন্যায্যবিচারের দাবিতে বিশাল মিছিল বের হয়। মিছিল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়—ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ ঘটে। সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয় লিলিমোড় এলাকায়, যেখানে পুলিশ একজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে মারধর শুরু করলে জনতা তাকে ছাড়াতে যায়।

দুপুরের দিকে পুলিশ গুলি চালালে আব্দুল কাদের ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং জনতা তার লাশ নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর জেলরোড এলাকায় মেহেরাব আলী সামু গুলিবিদ্ধ হয়ে আইল্যান্ডে পড়ে থাকলে পুলিশ তাকে বুট দিয়ে লাথি মেরে টেনে পিকআপ ভ্যানে তোলে; লোকজন অনুরোধ করলেও তাকে না দিয়ে পা দিয়ে চেপে রাখে, পরে সামু মারা যান। একই সময় জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের দেয়ালে বসে থাকা আট–দশ বছরের এক শিশুকে পুলিশ ধরে পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে আছড়ে মারে বলে জানা যায়। থানার সামনে আরেক মিছিলে পুলিশের গুলিতে রিকশাচালক সিরাজ আহত হন; জীবিত অবস্থায় তাকে থানায় নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

বিকেলে উত্তেজিত জনতা ডিবি অফিসের দিকে মিছিল করলে পুলিশ সেখানেও গুলি চালায়। এতে রেলওয়ে স্টেশন বস্তির এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় এবং পরে সেই লাশও গুম করা হয়।

১৯৯৫ সালের আগস্টে ইয়াসমিনকে পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা এবং এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে আরও তিনজন (মতান্তরে সাতজন) নিহত হওয়ার ঘটনায় বিচার দাবিতে কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৬(৪) ধারায় সংশ্লিষ্ট এসআই মইনুল হক, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং ড্রাইভার অমৃতলাল বর্মণের বিরুদ্ধে ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়।

এবার আসি বিচারের কথায়। হ্যাঁ ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের রায় হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। এসআই মইনুল হক ও অমৃতলাল বর্মণের মৃত্যুদণ্ড ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কার্যকর করা হয়। ঘটনার ৯ বছর পর ইয়াসমিন বিচার পায়। তবে এই হত্যার বিচার চেয়ে আর পুলিশের এসব জঘন্য কাজের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যারা প্রাণ হারান, তাদের পরিবারের এখনও কোনো সুবিচার পায়নি।

তবে এই ঘটনা যখন ঘটে তৎকালীন সরকার ছিল বিএনপির। এবং সেই সরকার এই হাই প্রোফাইল কেসটি সামলাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বলা হয়, এর পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির হারের একটি বড় কারণ ছিল এই ইয়াসমিন রেপ কেস।

বর্তমান সরকারও বিএনপি সরকার। গত কয়েকদিনে আমাদের দেশের আনাচে কানাচে কয়েক মাস বয়সী শিশু, ৪/৫ বছরের শিশুকে রেপ করে গলা কেটে হত্যা, তরুণী, বৃদ্ধা— এমন কোনো বয়সের, পেশার নারী নেই যারা ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন বা খুনের চেষ্টার শিকার হচ্ছেন না। হঠাৎ করেই যেন রেপ করার মহোৎসব লেগেছে দেশে। তাই সরকারকে আমরা একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, আমাদের যেন আর কোনো ইয়াসমিন কেস দেখতে না হয়। আমাদের যেন এই লাশগুলো নিয়ে রাস্তায় নামতে না হয়। তার আগেই সুষ্ঠু বিচার আর ধর্ষকদের কঠিনতম শাস্তি যেন আমরা দেখতে পাই।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, দ্য ডেইলি স্টার।

২০৬০ পঠিত ... ১৩:৪৯, মার্চ ০৮, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top