ঢাকার আকাশটা সেদিন অদ্ভুত নীল আছিল। চৈত্র মাসের কড়া রোদ, কিন্তু মানুষের গায়ে ওই রোদের তাপ যেন ঠিকমতো লাগতেছিল না।রমনা রেসকোর্স ময়দানে তিল ধরার জায়গা নাই। লাখ লাখ মানুষ চুপচাপ দাঁড়ায়া আছে। মনে হয় যেন সবাই কোনো এক জাদুকরের খেলা দেখার লাইগা অপেক্ষা করতেছে।
তারপর সেই জাদুকর আইলেন। তবে তার হাতে কোনো জাদুর কাঠি নাই। গায়ে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি, তার উপর কালো কোট। তিনি যখন মঞ্চের সামনে দাঁড়াইলেন, তখন পুরো মাঠ এমন চুপ হইয়া গেল যে মনে হইতেছিল একটা সুচ পড়লেও শব্দ শোনা যাইত। তিনি কথা বলা শুরু করলেন। হাতে কোনো কাগজ নাই, কোনো লিখা নাই, কোনো রিহার্সালও নাই। কিন্তু প্রতিটা কথা সোজা মানুষের বুকের ভিতর গিয়া লাগতেছিল।
তিনি কইলেন, "ভাইয়েরা আমার....."
এই একটা ডাকেই যেন জাদু আছিল। ওই লাখ লাখ মানুষের প্রত্যেকজনের মনে হইতেছিল লোকটা বুঝি তারেই ডাকতেছে। এদিকে পাকিস্তানের জেনারেলরা দূর থেইকা দূরবীন দিয়া দেখতেছিল আর ভাবতেছিল আজকে এই লোকটা কি সরাসরি স্বাধীনতার কথা কইয়া বসবে? যদি কইয়া ফেলে, তাইলে কি আমরা এখনই গুলি চালামু?
কিন্তু ওই জাদুকর আছিল অনেক চালাক। তিনি স্বাধীনতার সব কথাই কইলেন, কিন্তু সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন না। তিনি কইলেন, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। শুনতে কেমন জানি লাগে। বাঙালির ঘর তো খড় টিনের, ওইখানে আবার দুর্গ কেমনে হয়? কিন্তু ওই মুহূর্তেই মানুষের মনে হইল, তাদের এই মাটির ঘরই আসলে একেকটা কেল্লা।
পশ্চিম পাকিস্তানের বড় সাহেবরা তখন ঘামতেছিল। তারা ভাবছিল বাঙালি মানে শুধু ভাত আর ইলিশ মাছ। কিন্তু এই মানুষগুলা যে এমন আগুনের মতো কথা কইতে পারে, তা তাদের মাথাতেই আসে নাই। সেদিন যখন মানুষ রেসকোর্স ময়দান থেইকা ফিরতেছিল, তখন তাদের চোখে মুখে অন্যরকম এক আলো আছিল। তারা বুঝে গেছে সামনে রক্ত আছে, কিন্তু ওই রক্ত দিয়াই ইতিহাস লেখা হইব।
রেসকোর্স ময়দানে যখন তিনি তার তর্জনীটা উঁচা করলেন, তখন মনে হইছিল লাখ লাখ মানুষের বুকের ধুকপুকানি এক মুহূর্তের লাইগা থাইমা গেছে। তিনি যখন কইলেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম," তখন মনে হইল ঢাকার আকাশ বাতাস একসাথে বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। সব কথা কইয়া দিলেন, কিন্তু এমনভাবে কইলেন যে পাকিস্তানের জেনারেলরা ধরার মতো কোনো অজুহাতই পাইলো না। তারা শুধু ভাবতেছিল লোকটা সব কইয়া দিল, কিন্তু আমরা গুলি চালামু কিসের অজুহাতে?
ভাষণ শেষ হইলে বিকেল গড়ায়া সন্ধ্যা নামতেছিল। কিন্তু ওই সন্ধ্যা আর সাধারণ কোনো দিনের মতো আছিল না। মানুষ যখন বাড়ি ফিরতেছিল, তাদের হাঁটার ভঙ্গিই বদলাইয়া গেছে। রিকশাওয়ালার প্যাডেলে জেদ, ছাত্রদের কণ্ঠে অদ্ভুত সাহস। কেউ নিচু গলায় কইতেছিল ভাই আজ থেইকা আর ট্যাক্স দিমু না। আরেকজন কইতেছিল ট্যাক্স তো দূরের কথা, আজ থেইকা ওদের হুকুমও মানব না।
এরপরের আঠারোটা দিন ছিল একেবারে অদ্ভুত সময়। দেশ আছে, কিন্তু অফিস আদালত ঠিকমতো চলে না। সচিবালয় বন্ধ, কিন্তু দেশ চলতেছে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর বাড়ির নির্দেশে। মনে হইতেছিল পুরো বাংলাদেশ যেন অদৃশ্য এক সুতোয় ওই বাড়ির সাথে বাঁধা। কেউ কেউ মজা কইরা বলতেছিল পুরো দেশটাই এখন এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছে, আর এই ঘোরের নাম স্বাধীনতা।
কিন্তু ওই ঘোরের পেছনে লুকায়া আছিল ভয়ংকর অন্ধকার। পঁচিশে মার্চের সেই কালো রাত। পাকিস্তানি সেনারা ভাবল বন্দুক দিয়া একটা জাতির গলা চেপা দেওয়া যাবে। তারা বঙ্গবন্ধুকে ধরল, মনে করল খেলা শেষ। কিন্তু তারা জানত না সাতই মার্চের ওই আঠারো মিনিটের ভাষণ বাঙালির মাথার ভিতরে এমন এক আগুন লাগাইয়া দিছে, যার কোনো ওষুধ নাই।
সেই রাতে যখন সার্চলাইটের আলোয় ঢাকা শহর জ্বলতেছিল, তখন প্রায় প্রতিটা বাঙালির কানে বাজতেছিল সেই বজ্রকণ্ঠের কথা; "আমি যদি হুকুম দেওয়ার না পারি...”
হুকুম ছাড়াই তখন মানুষ ঘর থেইকা বাইর হইয়া আইল। কারো হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, কারো হাতে লাঠি, কিন্তু বুকের ভিতর ছিল একটাই জিনিস, স্বাধীনতার স্বপ্ন। ইতিহাস পরে প্রমাণ দিছে, তর্জনী দিয়া শুরু হওয়া স্বপ্ন কামান দিয়া থামানো যায় না।



পাঠকের মন্তব্য