লেখকঃ পাভেল রহমান
ইরানের প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানি ১৯৯৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সফরে এসে তাঁর কালো লিমুজিনের জানালা দিয়ে ঢাকার রাস্তায় চলা রিক্সা দেখে তিনি মুগ্ধ হন। লিমুজিনের কালো কাচের ভেতর থেকে তিনি দেখেছিলেন শহরটাকে। আর শহরের ভিড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া রঙিন এক চলমান শিল্প—রিক্সা। ফুল, পাখি, নায়ক-নায়িকা, স্বপ্ন আর লোকশিল্পে আঁকা তিন চাকার সেই বাহন তাঁর চোখে লেগে রইল। শুধু ভালো লাগা নয়—তিনি চাইলেন দুটি রিক্সা তেহরানে নিয়ে যেতে। রাজপ্রাসাদের আঙিনায়, প্রিয় সহধর্মিণীকে পাশে বসিয়ে, সেগুলোয় চড়বেন—এমনই তাঁর ইচ্ছা।
ঢাকায় তিনি অবস্থান করবেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন করতোয়ায়, যা বর্তমানে গণভবন নামে পরিচিত।
রিক্সার খোঁজে বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের চিফ অব প্রটোকল আবুল খায়ের মোহাম্মদ ফারুক দ্রুত লোকজন পাঠিয়ে দিলেন পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায়। নানা গ্যারেজ ঘুরে একটি রিক্সা গ্যারেজে পাওয়া গেল ঝকঝকে ব্র্যান্ড নিউ কয়েকটি রিক্সা। সাধারণত একটি প্যাডেল রিক্সা তৈরি করতে ১৫ দিন সময় লাগে। সৌভাগ্যক্রমে ছয়টি রিক্সার একটি অর্ডার চলমান থাকায় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সেখান থেকে দুটি পাওয়া গেল। নানা পরীক্ষা করে দেখা হলো—ডেকোরেশন সব ঠিক আছে কি না। তারপর ট্রাকে তুলে আনা হলো গণভবনে।
দুটি রিক্সাকে সযত্নে লাল কার্পেটের ওপর রাখা হলো প্রেসিডেন্ট হাশেমি রাফসানজানিকে দেখানোর জন্য।
রিক্সা শুধু রিক্সাই নয়, সঙ্গে আছেন দুজন রিক্সাচালকও। রঙিন রিক্সার মতোই তাঁদের পোশাক-পরিচ্ছদেও বেশ চাকচিক্য। রাতারাতি যেন ভাগ্য খুলে গেল দুজনের। অকল্পনীয় দ্রুততায় তৈরি হলো পাসপোর্ট, তাতে ইরানি দূতাবাসের ভিসা পড়ল। আজ থেকে তাঁরা প্রেসিডেন্ট রাফসানজানির ব্যক্তিগত স্টাফ, রিক্সার ড্রাইভার—রাতারাতি ভিআইপি বনে গেলেন! মধ্যবয়সে হঠাৎ পাওয়া আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ যেন বদলে দিল তাঁদের জীবন।
গণভবনের প্রাঙ্গণে প্রেসিডেন্টের গাড়ি পার্ক করার স্থানে লাল গালিচার ওপর দাঁড়িয়ে আছে নতুন দুটি রিক্সা। প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি এলেন—দীর্ঘদেহী, ঘিয়েরঙা শেরওয়ানি গায়ে, মৃদু পদক্ষেপে; মাথায় সাদা পাগড়ি। লাল কার্পেটের পাশে রিক্সা দুটি চোখে পড়তেই তাঁর চোখে যেন ঝিলিক খেলে গেল। রঙিন কারুকাজে ঝকঝকে রিক্সা—যেমনটি তিনি চেয়েছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে তৎকালীন সরকারের মিনিস্টার-ইন-ওয়েটিং মি. মোশাররফ হোসেন রিক্সার বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। প্রেসিডেন্টের মুখে প্রশান্তির হাসি।
তেহরানের রাজপ্রাসাদে এই রিক্সায় প্রিয় সহধর্মিণীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন—আনন্দঘন মুহূর্ত। প্রেসিডেন্ট রিক্সা দুটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন, কিন্তু একবারও স্পর্শ করলেন না। ছবির জন্য যেন তাঁর ছুঁয়ে দেখা আমার ছবির প্রয়োজন। ভাবলাম—হয়তো তিনি রিক্সায় উঠে বসবেন। না, তা হলো না। সিটে হাত বুলাবেন—তাও না। অন্তত ঘণ্টিটা যদি বাজাতেন!
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পরিদর্শন প্রায় শেষ। আমার উৎকণ্ঠা বাড়ছে। যা পেয়েছি, তা-ই যথেষ্ট—নিজেকে বোঝাই। তবু মনে হচ্ছিল, একটি নতুন ছবি এখনো বাকি।
শেষ পর্যন্ত নিজেই বললাম, “মহামান্য প্রেসিডেন্ট, আপনি কি রিক্সার ঘণ্টির শব্দ শুনেছেন?”
প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি আমার দিকে তাকালেন। শুধু তিনি নন, উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। তাঁর মুখে মৃদু হাসি ফুটল। বললেন, “না, আমি ঘণ্টির শব্দ শুনিনি।”
আমি বললাম, “তাহলে কি আপনি নিজেই ঘণ্টিটা বাজিয়ে শব্দটা শুনবেন, মি. প্রেসিডেন্ট?”
তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই।”
বলেই বেল টিপলেন। শব্দ উঠল—টুং টাং। সেই শব্দে তাঁর মুখে ফুটে উঠল প্রশস্ত হাসি। আমি ক্যামেরার শাটার টিপে বন্দি করলাম সেই মুহূর্ত।
পরিদর্শন শেষে প্রেসিডেন্ট দোতলায় উঠে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তেহরানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। ভেবেছিলাম, দুই রিক্সাচালকের নতুন জীবনের গল্প শুনব। কিন্তু বিধি বাম!
স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের একজন কর্মকর্তা আমাকে ভেতরে ডাকলেন। আমি যেতেই তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, “আপনার তো সাহস কম না! আপনি প্রেসিডেন্টকে কমান্ড করেন?”
আমি হতভম্ব। বললাম, “প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার অধিকার আমার আছে। সেই অধিকারেই আমি তথ্য মন্ত্রণালয়ের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডধারী।”
তিনি সম্ভবত মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা। আমার কথায় আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে গণভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখলেন। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।
আমি বন্দি হয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর শুনলাম প্রেসিডেন্টের মোটরকেড গণভবন থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছে। আরও কিছু সময় পর দরজা খুলে দিল এসএসএফ!



পাঠকের মন্তব্য