গরম গরম ভাত পাতে বেড়ে দেওয়া হয়েছে। খেতে বসেছে শিউলি আর বিল্লাল। বিল্লালের পাত থেকে কিছু ভাত মাদুরে পড়ে গেছে। শিউলি আবার সেগুলো ছোটোভাইয়ের প্লেটে তুলে দিল।
এইদিকে মাংসের ডেগচির ঢাকনা তুলেছে মা। গরুর গোশতের সালুনের অদ্ভুত ঘ্রাণে ঘরটা ভরে গিয়েছে। বিল্লালের পাতে মা নরম দেখে দুই টুকরা তুলে দিলো। এরপর শিউলির পাতে দিলো সিনার মাংসের কচকচা একটা মাংস। আলু দিয়ে ঝোল মাখিয়ে নুন ছিটিয়ে শিউলি খানিকটা ভাত আগে খেয়ে নিলো। এরপর মাংসের টুকরাটা তুলে দিলো একটা কামড়। আহ... কী স্বাদ... কী স্বাদ... জিভে-টাকরায় মাংস মিশে মিশে যাচ্ছে, আর তৃপ্তিতে শিউলির চোখ একেবারে বন্ধ হয়ে আসছে।
জোর করে চোখ খুলল শিউলি, আর চোখ খুলেই বুঝল, এতক্ষণ স্বপ্ন দেখেছে ও। ধুস... এই স্বপ্নটা ভাংতে গেল ক্যান? জোর করে চোখ খুলতে যাওয়ার কী দরকার ছিল?
মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ওইদিকে ফিরে দেখল হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে বিল্লাল। মাত্র ৪ বছর বয়স, এইটুকু মানুষ। কিন্তু তারপরও, সে বুঝতে পেরে গিয়েছে রোজা শেষে ইদ আসলে বাসায় মাংস আনা হয়। বাবা এখন মাংস সমিতি করে।
মাংস সমিতির কথা মনে পড়ায় আবার মন ভালো হয়ে গেল শিউলির। দুইবছর আগে আব্বার বন্ধু জব্বার কাকা এই সমিতি শুরু করেছিল। আব্বাকেও জোর করে নিয়েছিল। ভ্যান চালিয়ে আব্বা একটু কষ্ট হলেও সপ্তাহে ১০০ টাকা করে দিয়ে যেত। আর ইদের আগে ঘরে ঢুকেছিল তিন পোঁটলা মাংস নিয়ে। আব্বাকে ঘিরে শিউলি আর বিল্লালের কী খুশি!
এইজন্য এইবার ইদ কাছে আসার সাথে সাথে শিউলি একেবারে মাংস খাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে! ভালো, সকালবেলায় যখন স্বপ্নটা দেখেছে, সেইটা তো সত্যি হবেই! স্বপ্নে বিল্লালও ছিলো, এইজন্য ঘুমন্ত ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো একটু।
একটু দূরে মাকে দেখা গেলো ইফতারের জন্য ছোলা ভেজাচ্ছে। শিউলি গলা চড়িয়ে ডাকল, আম্মা, আইজকা না গরু কিননের কথা? আব্বা যাইব না?
মা ছোলায় পানি ঢালতে ঢালতে জবাব দিলো, তোর আব্বা আইজকা একটা বাসা বদলানির কাম পাইছে, হ্যায় যাইব না। জব্বার মিয়ারা গিয়া কিইন্যা ফালাইব।
শিউলি মন দিয়ে শুনলো। আব্বা না যাক, জব্বার কাকারা গেলেই হইলো। আগেরবার কালো রঙের একটা গরু পাইছিলো, ঘাড়ের কাছে সাদা রঙের ফুটকি ফুটকি। এইবারও ভালো গরু পাবে। শিউলি হাসিমুখে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে গেল।
২
দুপুরবেলা। মহল্লার মাঠের সামনে শিউলি বিল্লালের হাত ধরে আগে আগেই চলে এসেছে। জব্বার কাকারা গরু নিয়ে এসে পড়ার কথা এরমধ্যে। এই তো, পাড়ার কসাই হোসেন কাকা তার ভাতিজা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জবাই থেকে কাটাকাটি গতবার তারাই করেছিলো। এইবারও মনে হয় তারাই করবে।
পাশের বস্তির হেনাকেও দেখলো ওখানে দাঁড়িয়ে। ওর সাথেই ক্লাস টু-তে পড়ে। শিউলিকে দেখে হাত দিয়ে কাছে ডাকলো।
কীরে, তোগো গরু কই?
গরু তো কিনতে গেছে। আইবো অহনই।
আইবো না। মহল্লার লোকজন কইতাছে জলিল কাকা সমিতির ট্যাকা নিয়ে ভাইগ্যা গেছে গা!
শিউলির মাথাটা একটা চক্কর মারলো! জলিল কাকা ভাইগ্যা গেছে মানে? এইবার ইদে গরুর গোস্তো তাহলে খাওয়া হবে না? হাত ধরে রাখা বিল্লাল কী বুঝলো কে জানে, ভ্যাঁক করে কেঁদে উঠলো।
হেনা আবার আংগুল তুলে দেখালো, দ্যাখ হোসেন কাকা কী কয়! এইবার ভালা হইছে আব্বা মাংস সমিতি করে নাই। আমরা কুরার গোস্তো দিয়া ভাত খামু ইদের দিন।
শিউলির হেনার কথা শোনায় আর মন নেই। হোসেন কাকা আঙ্গুল নাড়িয়ে কী যেন বলছে। ওইদিকে আগালো বিল্লালের হাত ধরে।
হোসেন কসাই একটু গলা চড়িয়েই বলছে, আন্দাজ না থাকলে গরু কিনতে গেছে কোন আক্কেলে? ট্যাকা শর্ট পড়ছে নাকি ট্যাকা নিয়া ভাগছে ক্যাডায় জানে? আমারে এইহানে খাড়া করায়া রাখছে, আরেক সমিতির গরু ছাইড়া এইডায় আইলাম গতবার কাটছি দেইখ্যা!
আশেপাশের লোকজন ফিসফাস শুরু করেছে, জব্বার মিয়া ভাগলো নাকি? ফোনও ধরতেছে না সকাল থিকা।
শিউলিদের পাশের ঘরের শামসু কাকা দাঁড়িয়ে ছিল সামনেই। শিউলিকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো, কীরে, তোর বাপ কই?
আব্বা তো বাসা বদলের খ্যাপে গেছে আজকে।
কইছিলাম তোর বাপরে সমিতি-মমিতিতে না ঢুকতে। হ্যায় তো ধরা খাইছেই, আমারেও খাওয়াইলো!
বিল্লালটা সুর তুলে তুলে কাঁদছেই। শিউলির আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না। চুপচাপ ভাইয়ের হাত ধরে ঘরের পথ ধরলো। খাবে না গোশত। না খেলে কী হবে? সারা বছরে কুরবানির ইদে টুকাইন্না মাংস সস্তায় বাজারে বিক্রি হয়, তখন ওরা কিনে খায়। টুকাইন্না মাংস খেতে ভাল্লাগে না, এইবার কুরবানির ইদ আসলে মন ভরে টুকাইন্না গোশতই খাবে।
...
ঘরে ঢুকতেই মা বললো, ইফতারিতে কী খাইবি?
শিউলি খুব মন খারাপ করে বলল, খামু না।
আয় হায়, এই পোলা কান্দে ক্যান? দে দেখি, আমার কোলে দে।
বিল্লালকে কোলে দিলো মায়ের। খুব মন খারাপ করে বিছানায় হেলান দিলো শিউলি। তারপর বিল্লালের কান্না শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে গেল।
৩
হুট করে ঝাঁকুনি খেয়ে শিউলি কিছুক্ষণ ধরতে পারল না সে কই! ইফতারির সময় নাকি হয়ে গেছে। বাবা এসেছে তিন পোঁটলা মাংস নিয়ে। বিল্লালটাও হাততালি দিচ্ছে আব্বাকে ঘিরে।
শিউলি কিছু জিজ্ঞেস করার আগে আম্মা জিজ্ঞেস করল, এইবার গোস্তো আনতে দেরী হইলো ক্যান?
কইয়ো না, জব্বারে গেছিলো গরু আনতে। এইখানে না পাইয়া বহুত দূরের হাট থিকা আনছে। এরমইধ্যে তার ফোন হইয়া গেছে বন্ধ! সাড়ে তিনটায় আনছে গরু, আমিও কাম শ্যাষ কইরা মাঠে গেছিলাম, অহন ভাগা নিয়া আইলাম।
কে বলবে শিউলি বিল্লালের ৩ বছরের বড়? সেও উঠে আব্বাকে ঘিরে হাততালি দেওয়া শুরু করলো।
...
ইদের দিন। মাদুরে বসেছে দুই ভাইবোন। গরম গরম ভাত। বাতাসে মাংসের ম-ম ঘ্রাণ।
পাঠকের মন্তব্য