হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : তৃতীয় পর্ব

১৮২৬ পঠিত ... ১১:৪৩, এপ্রিল ০৩, ২০২০

অলংকরণ: তাইসির

 

১.
মাজেদা খালার বাসায় আবার ডাক পড়েছে আমার।

ঘর থেকে বের করে দেয়ার দশ দিনের মাথায়ই ডাক পড়বে ভাবিনি। কেন ডাক পড়েছে সেই প্রশ্ন দূর হলো বাসায় ঢুকে মাজেদা খালার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই।
: এই গাধার বাচ্চা!
মাজেদা খালার নানা রূপ আমি দেখেছি। কিন্তু এমন অদ্ভুত নামে আগে কখনো খালা ডাকেননি।
: চিহি চিহি চিহি৷
: মানে?
: গাধার ডাক খালা। চেহারায় গাধার মত না হতে পারি, তোমার ডাকের সম্মান রেখে কন্ঠস্বরে গাধার মত হয়ে গেছি।
: সবসময় ফাজলামো করবি না হিমু। বাদলকে যে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে জানিস?

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বাদলকে পুলিশ ধরা মানে এই টেনশন খালার হওয়ার কথা না। এই টেনশন পুলিশের। পুলিশ বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে যাবে। পুলিশকে ঘাবড়ে দেয়ার নানান রকম নিনজা টেকনিক আমি বাদলকে শিখিয়ে দিয়েছি। তবু এগুলো তো খালাকে আর বলা যায় না। আমি গলায় বেশ গদগদ টেনশন নিয়ে খালাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কিভাবে খালা? কেমন করে হল এসব?'

হঠাৎ রুমে যেন বজ্রপাত হলো। খালার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে হাইমাই করে চিৎকার দিয়ে উঠলেন খালু। খালু মনে হয় হালকা ইয়ে, মানে মদ্যপ। তার মুখের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
: হাউ স্টুপিড! এক টাকলার বাচ্চা টাকলা। বলে কিনা 'মদ খাবি, মানুষ হবি'! আর এমন এক টাকের বাচ্চা টাকের সাথে ফেসবুক লাইভে গেছে আমার ছেলে! মদ খেয়ে কেউ কোনদিন মানুষ হয়? আর এই মদারুর বাচ্চার সাথে ফেসবুক লাইভে এসে সরকারকে গালাগালি করেছে আমার ছেলে!

আমি প্রচন্ড বিস্ময় নিয়ে খালুর আত্মঘাতী কথাটা শুনলাম। মাজেদা খালা এতদিন সংসার করে বোধহয় খালুর এসব স্ববিরোধী কথা শুনে অভ্যস্ত। খালা তাই খালুর এই ব্রহ্মতেজ এড়িয়ে সরাসরি প্রসঙ্গে আসলেন।

: শোন হিমু। বাসায় পুলিশ এসেছিল, বাদলকে ধরে নিয়ে গেছে। কি না কি ফেইসবুক লাইভে এসে নাকি সেফাতুল্লাহ নামে এক সরকারি ওয়ান্টেড লিস্টে থাকা ক্রিমিনালকে নিয়ে ফেসবুক লাইভে এসেছিল। এসে সরকারকে গালাগালি করেছে।

: বাম বাম বোলে...!
(আমার মুখ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল বিস্ময়ে। সেদিনকার ফেইসবুক লাইভের ঘটনা এতদূর গড়িয়েছে!)
: সেটা আবার কী?
: কিছু না খালা, বলে যাও...
: বাদল নাকি লাইভে এসে সরকারবিরোধী কথা বলেছে। বলেছে কোন এক শাহজাদীকে নাকি সরকার বসিয়েছে করোনা দূর করার জন্য।
: শাহজাদী না খালা, মীরজাদি। এইটা একটা টাইটেল।
: মীরজাদি না পীরজাদি সে তুই জানিস। তোকে বকা দেই আর যাই করি তোর বুদ্ধি আছে। আমি জানি বাদলকে এই ঝামেলা থেকে তুইই বের করতে পারবি।
: ওওও.... (আমি গভীর চিন্তায়)
: আর শোন...
: জ্বি খালা
: এই দুইটা গাধার বাচ্চার সাথে আরো এক গাধার বাচ্চা ছিল, তার চেহারা দেখা যায় নাই। সেই বদমাইশ নাকি একটা পিপিই পরে বসে ছিল। নাক মুখে মাস্ক পরা। পুলিশ মূলত এই হারামজাদাটাকে খুঁজছে।
: আই সি...

আমার মুখে আর কথা নেই। পুলিশ তাহলে আমাকেই খুঁজছে! যদিও পিপিই পরে লাইভে আমি বসতে চাইনি, বাদলের জোরাজুরিতেই বসা। মানুষকে পিপিই'র ভার বোঝাতেই নাকি এটা করতে হবে। তাছাড়া পিপিই পরলে আলাদা একটা ভাবও নাকি আসে। এই পিপিই খালুর এক সরকারি অ্যাডমিন ক্যাডার বন্ধু তাকে উপহার দিয়েছে। অদ্ভূত উটই এখন দেশের পিঠে চড়ে বসেছে... পিপিইও নাকি উপহার দিতে হয়!

ঝামেলা হতো না। ঝামেলা করেছে সেফু কাকা। হঠাৎ করে লাইভে বলে উঠেছে 'এই গরিবের বাচ্চা গরিব, অসভ্যওও, ইতওওর। মূর্খ। যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রতিটা ডাক্তারের পিপিই নিশ্চিত করিস তোরা, ততক্ষণ পর্যন্ত যে কয়টা চাষার দল পিপিই পরবি, পরে ছবি দিবি সবগুলো শু*** বাচ্চা। যেমন, আমার পাশে এই যে এই ইতর বসে আছে পিপিই পরে, ও একটা শু***বাচ্চা।' পুরো ভিডিওতে এই একটাই ছিল আমার রোল, সেফুদা একটু পরপর আমাকে বলবেন 'এই শুয়োরের বাচ্চা, নন-ডক্টর পিপিই পরা চাষা' আর আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাবো!

এইখানেই ঝামেলাটা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে তো পিপিই নেই। যা আছে হয় কিছু ডাক্তার না হয় কিছু সরকারি কর্মকর্তার কাছে। এই যেমন খালুর সরকারি যে বন্ধু এই পিপিই খালুকে দিয়েছে, তার ফেসবুক কাভার ফটোতে তিনি পিপিই পরে অফিসে বসে ভীষণ জরুরি কোন ফাইল সাইন করছেন এমন ছবি। ক্যাপশনে হ্যাশট্যাগ দিয়ে লেখা '#করোনাযোদ্ধা'।
তাছাড়া ফেসবুক লাইভে পিপিই'র গায়ে সরকারি সিল দেখা গেছে! কঠিন বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।
: খালা। চিন্তা কইরো না। থানায় যাচ্ছি। কোন থানায় নিয়েছে?
: কলাবাগান থানার ওসি এসেছিলেন।
: এই সর্বনাশ!
: কী হয়েছে?
: কিছু না।

কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ ওরফে অসুর পরিতোষের সাথে আমার অতীত 'মধুর' সম্পর্ক আর তার দ্বারা আমার পূর্ববর্তী পাছায় বাড়ি খাওয়ার কথা আর খালাকে জানালাম না।
খানিকক্ষণ ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে খালা হঠাৎ বললেন, 'পিপিইটা একটু দেখিস তো ফেরত পাওয়া যায় কিনা।'
আমি ভীষণ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'কেন খালা!!'
: তোর খালুর খুব শখের পিপিই। পেয়েছে, কিন্তু পরে একবারও পরতে পারেনি!
: ও ও ও ও... খুবই দুঃখের কথা...

পিপিই আমার কাছেই আছে।
ইন ফ্যাক্ট মেসের পাশের টং দোকানের মফিজুরকে আমি পিপিইটা দিয়েছি। মফিজুর এখন পিপিই পরে চা বানায়।
চায়ের নাম সে দিয়েছে 'এন্টি করোনা চা'। দোকানে এরপর থেকে উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু এই ঘটনা তো আর খালাকে বলা যাবে না। আমি হালকা করে বললাম, 'পিপিই উদ্ধার হবে খালা। তুমি রেস্ট নাও আর ঘি দিয়ে চপচপ করে একটু ডিম পোলাও রান্না করো। সন্ধ্যায় আমি বাদলকে নিয়ে ফিরে এসে আরাম করে ডিম পোলাও খাব।

আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন খালু, 'ডিম আমি ওর পাছা দিয়ে ভরবো।'

এবার মাজেদা খালা খালুর দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিলেন। অগ্নিদাহ হয়ে খালু চুপ করে গেলেন।
: হিমু, তুই যা। বাদলকে একটু নিয়ে আয় বাবা।

শুরুতে গাধার বাচ্চা থেকে এখন বাবা! বাহহ। নিজেকে সত্যি মহাপুরুষ মনে হচ্ছে। আমি থানার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলাম।

 

২.
সন্ধ্যায় যখন বাদলকে নিয়ে বাসায় ঢুকলাম, বাসায় ঈদের আনন্দ।

কিভাবে থানা থেকে বাদলকে বের করা হলো, সে ঘটনা ইতিহাস হয়ে যেত। তবে এত ইতিহাস রচনা করতে হয়নি। রূপাকে দীর্ঘদিন পরে একটা কল দিয়েছিলাম। রূপার বাবা মহাপাওয়ারফুল লোক, এই তথ্য তো আমি জানিই। ওটাই শেষ ভরসা।

: হ্যালো রূপা।
: কেন কল দিয়েছো?
: বাদল জেলে।
: জেলে আছে, ভালো হয়েছে। তুমি বাইরে কেন, জেলে যাওনি?
: এখনও যাইনি।
: কেন, পুলিশ নেয়নি?
আমি চুপ।
: কী করতে হবে আমি জানি। বাবাকে কল দিচ্ছি। কাজ হওয়ার কথা।
: তোমার বাবার কি অনেকগুলো পিপিই?
: মানে?!
: মানে যত পাওয়ার তত পিপিই!
: সবসময় ফাজলামো না হিমু।
: আচ্ছা।

রূপা কল কেটে দিল। তারপরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। আমি থানায় যাবার পর ওসি পরিতোষ উপরমহলের এক ফোন পেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে, উপরন্তু আমাকে দেখে আরও ঘাবড়ে গিয়ে বাদলকে ছেড়ে দিয়েছে। এবং সেই সুসংবাদ পেয়ে খালুর মন গলে গেছে। এই আনন্দ উল্লাসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে আরও একজন। সেফাতউল্লাহ সাহেব। খালুর বিশেষ অনুরোধেই সেফাতউল্লাহ সাহেবকে বাড়িতে আনা হয়েছে। খালু বারবার অনুযোগ করছিলেন আমার কাছে, 'শোন হিমু, একজন বয়স্ক লোক, নাহয় একটু মদ খান আর ফেসবুক লাইভে এসে গালাগালি করেন। তাই বলে আমার ওভাবে রিয়্যাক্ট করা ঠিক হয়নি। তুমি তাকেও নিয়ে এসো। একাকী থাকে লোকটা...'

নিয়ে আসার পর খালু এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, খাল কেটে কুমির না, একেবারে নীলতিমি আনা হয়েছে। সেফাতুল্লাহর গালাগালির তোপে ঘরে আপাতত টেকা যাচ্ছে না। বাসা পর্যন্ত আসতেই আমার আর বাদলের কান থেকে রক্ত পড়ার অবস্থা হয়েছে। গ্যাস 'পু*** দিয়ে' ভরে দেয়ার হুমকি দেয়ায় সিএনজিওয়ালা পান্থপথ সিগন্যালে একবার আমাদের নামিয়ে দিয়েছে। তবে সেফাতউল্লাহ আসায় একমাত্র আনন্দিত ব্যক্তি জমিলা। এতদিনে সে একজন মনের মতো চাচা পেয়েছে। জমিলা আর সেফাতুল্লাহর কথোপকথনের হালকা সেন্সরড অংশ আমি শুনেছি একটু আগে-

: চাচাজান, স্লামালিকুম। (বলেই সেফাতউল্লাহর পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো জমিলা)
: এই গরিবের বাচ্চা গরিব। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করিস কেন?
জমিলা এতেই মজা পেয়ে গেছে। দ্বিগুণ উৎসাহে সে বললো,
: আরো খারাপ গালি দেন চাচা। তাও সালাম করবো। আপনি যে কত বড় মাপের গালি দেন। আল্লায় বাঁচাইয়া রাখুক।
: মশকরা চো*স?? এই ফকিরনির বাচ্চা?
: চাচা, এই বাসার সবাই ফকিরনির বাচ্চা।
: তোর মালিক খা**র ছেলেটা কোথায়?
খালু তখন পাশেই দাঁড়িয়ে ইতস্তত মুখে। এমন ভয়ংকরভাবে তিনি কখনো কাউকে গালাগালি করতে শোনেননি।
: জ্বি, ইয়ে, আমি এখানে সেফাতউল্লাহ সাহেব।
: চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন মদখোরের মতো, এই স্টুপিডের বাচ্চা? কথা বলিস না কেন!

খালু কথা বা গালি কিছুই খুঁজে না পেয়ে অত্যন্ত অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। খালুর অবস্থা দেখে আমি এগিয়ে গিয়ে সেফাত সাহেবের সাথে কথা শুরু করলাম।
: আসলে সেফুদা......
: চোওওপ বিটলার বাচ্চা...
সেফুদার বিরাট চিৎকার। এবার আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম, 'এই, তোরে কিন্তু বান্দর দিয়া চো*** নাটকির পোলা!'

আমার এই আকস্মিক পরিবর্তনে সবাই ঘাবড়ে গেলো। ইনক্লুডিং মাইটি সেফুদা! ভদ্রলোক চুপ। টনিকে কাজ হয়েছে। বল এখন আমার কোর্টে। সহসা গালি খেয়ে সেফুদার মাথা হ্যাং হয়ে গেছে।

আমি আবার গলার স্বর অত্যন্ত মোলায়েম করে বললাম, 'আসলে সেফুদা, খালু আপনার প্রিয় "কাপুচিনো" বানিয়ে রেখেছে। আর সাথে রাতের খাবারও রেডি। এজন্য ডাকতে এসেছিলেন ডাইনিং রুমে।

সারা বাড়ি ভর্তি জাফরান দেয়া বাসমতি চালের পোলাও এর সুবাস।
কথা শেষে সবাই আমার দেখানো পথে চুপচাপ ডাইনিং রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলো। শুধু বাদল এক পাশে ফিসফিস করে বললো, 'হিমুদা, তুমি ম্যাজিক জানো।'
আমি হালকা হেসে বাদলকে বললাম, ম্যাজিক তো কেবল শুরু। রাতে দেখবি আসল ম্যাজিক।
: তুমি যখন বলেছো, ম্যাজিক অবশ্যই হবে হিমুদা।
আমি বাদলের দিকে তাকালাম। ছেলেটা আসলেই আমাকে অতিরিক্ত পছন্দ করে।

ডাইনিং টেবিলে খাওয়া-দাওয়ায় বেশ একটা আবেগঘন আড্ডা গেল। ওই আবেগঘন পরিবেশে একটু ঝামেলা করে দিলেন সেফাতউল্লাহ। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বললেন, 'এই ইলিশ মাছ কে রান্না করেছে?'
মাজেদা খালা মুখে হাসি ধরে রেখেই বললেন, 'আমি রান্না করেছি সেফাত সাহেব। কেন?'
: এই খা** মা*, লবণ কম দিছিস কেন তরকারিতে?
আমি প্রমাদ গুনলাম। খালু তার স্ত্রী গালি খাওয়া সত্ত্বেও চুপ করে আছেন। আমি নিশ্চিত সেফাতউল্লাহকে খালু এই মুহূর্তে দেবতা জ্ঞান করছেন। নিজে খালাকে জীবনে একটা বকাও দিতে পারেন নাই। এই ভারি পরিস্থিতি হালকা করলো জমিলা। বিরাট হাসিতে ভেঙে পড়ে বললো, 'হায়রে... চাচাজান কি যে মজার মানুষ!'
সবাই আমতা আমতা করে হাসতে লাগলো। সবার চেয়ে জোরে হাসলো বাদল!!

মাজেদা খালা ভুল বলে না। ছেলেটা কিছু ক্ষেত্রে আসলেই বিরাট গাধা হয়েছে। নাহলে মায়ের এমন গালি খাওয়ার সময় কেউ এভাবে হাসতে পারে

 

৩.
আমরা সবাই এখন বাড়ির ছাদে।
বাদল, আমি, খালু এবং সেফাতউল্লাহ সাহেব।
সেফাতউল্লাহ সাহেবের সম্মানে আজ মদের বোতল দুটি। মাজেদা খালা অবশ্য বারবার সাবধান করে দিয়েছেন, বাড়ির পানির ট্যাংকিতে যদি আজ হুইস্কি ঢালা হয় তাহলে উনি নিজ দায়িত্বে আমাদের আবার থানায় দিয়ে আসবেন। আমি খালাকে আশ্বস্ত করে এসেছি, নো হুইস্কি ঢালাঢালি। তবে ভদকা ঢালা হতেও পারে। এটা খালাকে বলি নাই।
বাসার ছাদের উপর এই মুহূর্তে অদ্ভুত এক সুররিয়েলিস্টিক দৃশ্য। চারটা মানুষ আমরা, একটা গোলটেবিল ঘিরে পিপিই পরে বসে আছি। পিপিইগুলোর রঙ হলুদ।
টেবিলের উপর মদের বোতল।
খালুর সরকারি বন্ধুর গিফট করা পিপিই, যেটা আমি এলাকার চা দোকানদার মফিজুরকে দিয়েছিলাম ওটা আবার নিয়ে এসেছি। সেটা দিয়ে বিকট বোঁটকা গন্ধ আসছে, যার জন্য মফিজুরের ঘাম আর সিগারেট দুটোই দায়ী বলে মনে হয়। খালু আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছেন, 'হিমু, পিপিইটা দিয়ে যেন কেমন বদ গন্ধ আসছে!'
: খালু, পিপিই তো মজার পোশাক না। এটা দিয়ে এমন গন্ধই আসে।
: ওওও, হাহাহা, you are funny হিমু, I like you.
: আমি জানি খালু। আপনি এখন শুরা পান করুন।

আমার বলার অবশ্য প্রয়োজন ছিল না। খালু শুরা পান করছেন এবং প্রচুর পান করছেন। বাদল নিজ হাতে সবাইকে দেদারসে মদ দিচ্ছে। এই পিপিই পরে মদ খাওয়ার আইডিয়া বাদলেরই। একটা পিপিই তো ছিলই, এক ঘন্টার মধ্যে আরও তিনিটা পিপিই সে কোত্থেকে জোগাড় করলো এই রহস্য আমি ঘাঁটাতে যাইনি।
সেফাতউল্লাহ সাহেব ছাদে উঠে প্রথমে কিছুক্ষন নরমাল থাকলেও এখন রীতিমতো ঝামেলা শুরু করে দিয়েছেন। ধুমিয়ে খালুকে গালাগালি করে যাচ্ছেন।

: এইইই বাস্টার্ড, ইউ ডগ.... মদের সাথে স্প্রাইট মেশাস কেন গরিইইইইবের বাচ্চা...?
খালু জবাবে কিছুই না বলে হাসছেন, এবং ভীষণ হাসছেন। আমার সেদিকে মনোযোগ নেই। আমার মনোযোগ আকাশের চাঁদের দিকে।
বিরাট চাঁদ উঠেছে। অন্ধকার নিরিবিলি আইসোলেটেড শহরে বিল্ডিংয়ের গায়ে গায়ে পড়ে চাঁদ বহুদিন পর আরাম পাচ্ছে।

করোনার দিনগুলোতে এই একটা ভালো বিষয় হয়েছে, প্রকৃতিকে মানুষ যেন নতুন করে খুঁজে পাচ্ছে। আবার সেফাতউল্লাহর মত লোকের সাথে দেখা হওয়াটাও মন্দ বিষয় না। ভদ্রলোক আমার পাশের চেয়ারে বসে আছেন। এই মাত্র তিনি কোনোরকমে টেনেহিচড়ে পিপিইটা খুলে বিরাট পেট বের করে হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় বসলেন। চোখে চশমা, হাতে মদের পেগ। আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কাপুচিনো হাসি দিচ্ছে। আর এই প্রথম গালাগালি বাদ দিয়ে ভিন্ন কিছু বলছে সেফাতউল্লাহ সাহেব, 'আনন্দ, উল্লাস, চিয়ার্স...!'

হঠাৎ আমার ভেতরে কিছু একটা হলো। আমি হাত ইশারায় সেফুদাকে ডাকলাম। সেফুদা আমার দিকে তাকাতে বেশ জোরেই বললাম, 'পা** মেরে দেব বদমাইশের বাচ্চা!'

সেফুদা বিরাট ঘাবড়ে মুখ থেকে পুচ করে মদ ফেলে দিলেন।
খালু বিরাট হাসিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন আর বলছেন, 'হিমু, মাই সান। ইউ আর ফানি!'
একমাত্র বাদল গাধাটা হাসছে না। আমি একটু মনঃক্ষুন্ন হলাম। গালিটা বিফলে গেছে। বাদল অবশ্য জানে, হিমুরা কখনো পা* মারে না...
(চলবে)

 

আরও পড়ুন: 

হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : চতুর্থ পর্ব

হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : দ্বিতীয় পর্ব

হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : প্রথম পর্ব

১৮২৬ পঠিত ... ১১:৪৩, এপ্রিল ০৩, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top