হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : দ্বিতীয় পর্ব

২২৩২ পঠিত ... ২০:৪৩, এপ্রিল ০১, ২০২০

অলংকরণ: তাইসির

পাছায় বিরাট পাঁচটা লাঠির বাড়ি খেয়ে এই মুহূর্তে বসে আছি কাঁঠালবাগান ঢালের মুখে।

বাড়ি দিয়েছেন কলাবাগান থানার ওসি। অপরাধ, করোনা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আমি মাস্ক ছাড়া খালি পায়ে সুন্দরবন হোটেলের সামনে দাঁড়ানো জামাই-বউ চানাচুরের দোকান থেকে চানাচুর খাচ্ছিলাম। চানাচুর খেতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খাওয়া একটা দুঃখজনক ব্যাপার। তবে এই দুঃখের অবশ্য ভাগিদার পাওয়া গেছে। চানাচুরওয়ালার পাছায়ও দশটা বাড়ি পড়েছে লাগাতার। পাতলা কাপড়ের প্যান্ট। দাঁত মুখ খিচ দিয়ে 'উহ উহ' আওয়াজ করার জন্য বাড়ি আরও কয়েকটা বেশি খেয়েছে চানাচুরওয়ালা। এভাবে আওয়াজ করলে পুলিশ বাড়ি দিয়ে আরাম পায়। বাড়ি দেয়ার সময় পুলিশের চোখমুখের ভাব হয় অখিলবন্ধু ঘোষের গানের মতো- 'যেন কিছু মনে করোনা'। দূরদর্শী শিল্পী। কত আগের গান। তার কথার মাঝেও 'করোনা'।

নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে নাম পড়ার চেষ্টা করে 'পরি..' অবধি পড়তে পড়তেই ওসি সাহেব আমার পাছায় আরও দুটো বাড়ি দেয়ায় নামটা আর পড়তে পারি নাই। একজন ওসির নাম পরি হবার কোন কারণ নাই। পুলিশ আর পরি খুব বিপরীত দুইটা জিনিস। তাছাড়া পরিরা পাছায় এত জোরে বাড়ি দেবে না। জ্বিন দিতে পারে। আমি ওসির দিকে তাকিয়ে খুবই সরলভাবে বললাম, 'ওসি সাহেব আপনি কি মানুষ না জ্বিন?'

ওসি সাহেব কম কথার মানুষ বোঝা গেল। আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
: নাম কি?
: জ্বি, হিমু। আপনার নাম কী?

এইবারে ওসি সাহেব সরু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। করোনা ভাইরাসের মতো এই প্রশ্নও একেবারে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসেছে। এর জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু ওসি সাহেব উত্তর দিলেন।
: পরিতোষ চন্দ্র।
: ওহ। তাহলে আপনি চাইলেও জ্বিন হতে পারবেন না। আপনি কি তাহলে অসুর?
: মশকরা করেন? করোনা পু** দিয়া ভইরা দিব।
: জ্বি আচ্ছা।
: জ্বি আচ্ছা মানে?! আপনি তো ফালতু লোক। খালি পায়ে মাস্ক ছাড়া রাস্তায় হাঁটতেছেন। বাসা কই?
: বাসা নেই। আমি রাস্তায় রাস্তায় হাঁটি ওসি সাহেব....
: ওহ, হন্টন বাবা। কাজ কী করেন?
: গান গাই। আমি শিল্পী। আপনাকে একটা করোনা সঙ্গীত শোনাই।
আমি বিচিত্র সুরে হঠাৎ গেয়ে উঠলাম, 'আমরা করোনা লেইডি, আমরা মাস্ক পরি...'

পরবর্তী ঘটনা সংক্ষিপ্ত... ওসি সাহেব 'করোনা লেইডি' গান শুনে আমার পাছায় আরও দুটো বাড়ি দিতে না দিতে পাশ থেকে আরেক কনস্টেবল এসে পরিতোষ চন্দ্র ওরফে অসুর চন্দ্রকে থামালেন।
: স্যার, এনারে ছাইড়া দেন। পাগল লোক। আমি চিনি।
আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম। এই কন্সটেবলকে আমি চিনি না। লোকটার বয়স আছে। গোঁফ-দাঁড়িতে চেহারায় পুলিশের আইজিপি ভাব। কিন্তু আসলে হাবিলদার। বাকি পুলিশেরা সবাই চলে যাওয়ার পর এই কনস্টেবল আমার কাছে এলো।

: হিমু ভাই, আমারে চিনেছেন?
: না ভাই, আপনাকে চিনি নাই।
: আপনি মহাপুরুষ মানুষ। সাধক লোক। আমারে কেমনে মনে রাখবেন! আমি কনস্টেবল সালাউদ্দিন। আমার বাচ্চাটার জন্মের সময় ডাক্তার বলছিলো হয় ছেলে বাঁচবে নাইলে মা। আপনি রমনা থানার লকআপ সেলে বইসা দোয়া দিলেন যে মা ছেলে দুইজনই বাঁচবে। তাই হইলো।

আমার এই লোককে মনে পড়েছে। এই লোকের বাড়ি বরিশাল। এর চেহারায় দাঁড়ি গোঁফও ছিল না। চিমসে চেহারায় বরং একটা ঘুষখোর ভাব ছিল। এই লোকের চেহারায় এমন নূরানী ভাব কিভাবে আসলো!

: আপনাকে চিনেছি সালাউদ্দিন সাহেব। বাচ্চা ভালো আছে??
: জ্বি হিমু ভাই। নাম রেখেছি সালাউদ্দিন ২।
: বাচ্চার নামে ২ ভরে দিয়েছেন কেন?।
: আপনিই তো রাখতে বলেছিলেন। বলছিলেন যে আপনার দোয়ায় এই বাচ্চার দ্বিতীয় জন্ম হইলো। তাই যেন নাম সালাউদ্দিন ২ রাখি।

কি সর্বনাশ! আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না। আমি কৌতূহল আটকাতে পারলাম না। সালাউদ্দিন সাহেব আমাকে শুদ্ধ বাংলায় 'কিউরিয়াস' করে ফেলেছেন।

: বাচ্চার পুরো নাম কী রেখেছেন?
: এম ভি সালাউদ্দিন ২...
: মাই ফুউউউট!
: কিছু বললেন হিমু ভাই?
আমি খুবই অবাক। বিস্ময়ে কথাও বললাম ভেঙে ভেঙে।

: তেমন কিছু না। খালি পায়ে হাঁটি। তাই, মাই ফুট বললাম। বাচ্চার পুরো নাম এমন লঞ্চের নাম স্টাইলে রেখেছেন কেন।
: আপনি রসিক আছেন হিমু ভাই! কিছুই মনে নাই আপনার? এই নাম আপনিই রাখতে বলেছিলেন। বলেছিলেন বাচ্চার বাড়ি যেহেতু বরিশাল, তাই যেন নামের মধ্যে বরিশালের ছোঁয়া রেখে 'এম ভি সালাউদ্দিন ২' রাখি।

এই লোক বাড়াবাড়ি রোগগ্রস্থ। যা-ই করবে বাড়াবাড়ি করবে, অপমান করলেও বাড়াবাড়ি, ভক্তি করলেও বাড়াবাড়ি। আমার মনে হল আমার উপর তার অতিভক্তি এক ঝাড়িতে দূর করা দরকার।
: সালাউদ্দিন সাহেব।
: জ্বি হিমু ভাই।
: আমি যদি বলি আপনার এরপরের সন্তান হলে নাম রাখবেন 'নভেল করোনা ভাইরাস', সেটাই রাখবেন?
: জ্বি, রাখবো হিমু ভাই।

আমি অসহায় অনুভব করলাম। এই লোক আমার কন্ঠের বিদ্রূপ ধরতে পারে নাই। এরে যদি এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত বলি, 'করোনাভাইরাস আসলে কিছুই না, সামান্য সর্দি কাঁশি' এ তাই বিশ্বাস করবে। ভক্তির মাত্রা ইতোমধ্যেই অন্য পর্যায়ে চলে গেছে, এইটারে নামায়ে আনা কষ্টকর। আমি সালাউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম।

মাজেদা খালার বাসা থেকে আমাকে বিতাড়িত করা হয়েছে আজ ছয় দিন। সাথে শেষ পঁচিশ টাকা আছে। এই পঁচিশ টাকা দিয়ে আমি কি করবো জানি।
গ্রীন রোডে একটা সাইবার ক্যাফে আছে। আমি এখন সেই সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ফেসবুক লাইভে যাব।

আমার আইডির নাম, 'বিষণ্ন করোনা বালক'।

এই আইডি খুলে দিয়েছে আমার খালাতো ভাই বাদল, গেল মাসের শেষ সপ্তাহে। এই নাম নাকি লোকে খাবে বেশি, আর গণসচেতনতা তৈরিতে ফেসবুকের চাইতে ভালো জায়গাও নাকি হয় না! দেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীদের নাকি এখন ফেসবুক লাইভে পাওয়া যায়। কিয়েক্টাবস্থা! কিভাবে আইডি বুস্ট না কী করে যেন বাদল আমার আইডিতে ত্রিশ হাজার ফলোয়ারও বানিয়ে ফেলেছে। এরা কোন জন্ম থেকে আমাকে ফলো করে আমি তাও জানি না। প্রোফাইল পিকচারে আমার খালি পায়ের ছবি আর কাভারে বাদল একটা হলুদ ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর অনেকগুলো করোনা ভাইরাসের মত দেখতে কিছু একটা বসিয়ে দিয়েছে।

শুধু একটাই ঝামেলা।

করোনা সচেতনতা পোস্টগুলোর নিচে বাদলের ভাষায় অত্যন্ত 'বিশ্রী এবং সস্তা কমেন্ট' আসছে। প্রায়ই নাসরিন নামের এক মেয়ে তার ইমো নাম্বার দিয়ে কথা বলতে চায় 'ইমু চ্যাট এ ৫০০ টাকার বিনিময়ে'। আর রায়হান নামে আরেক ছেলে সেই কমেন্টের রিপ্লাইয়ে প্রায়ই উদ্ভট ভঙ্গীতে তার বুক খোলা নাচের ভিডিও দিচ্ছে। এছাড়া অবশ্য বাকি সব ঠিকঠাক।

আমি কাঁঠালবাগান বাজার হয়ে এই মুহূর্তে আমার গন্তব্যের দিকে হাঁটছি। পাছার বাড়িগুলো হালকা যন্ত্রণা দিচ্ছে। এই যন্ত্রণা নিয়ে লাইভে টানা কতক্ষণ বসতে পারবো কে জানে। তাছাড়া বাদল বলেছে, আজ নাকি সেফুদা নামে এক লোককেও সে আনছে আমার আইডি থেকে গেস্ট এপিয়ারেন্স দেয়ার জন্য। এতে নাকি আইডির টিআরপি বাড়বে। তাছাড়া এই লোক নাকি অস্ট্রিয়া থাকে, ফেসবুক লাইভে এসে গালাগালির জন্য নাকি কিংবদন্তী পর্যায়ের। পুরো নাম সেফাতউল্লাহ। গালাগালি করে ঘরে থাকতে বললে নাকি লোকজন আসলেই ঘরে থাকতে উৎসাহিত হবে। নেগেটিভ হোক, পজিটিভ হোক পাবলিসিটি তো পাবলিসিটি...

অস্ট্রিয়ার লোক দেশে এসে থাকবে কোয়ারেন্টাইনে! আমার সাথে তার লাইভে যেতে হবে কেন! তবু বাদল বলেছে 'ভয় পেও না হিমুদা, এই লোক কঠিন জিনিস।'
হিমুরা কঠিন জিনিস পছন্দ করে। আমি তাই জিনিস দেখতেই শুধু যাচ্ছি না। লাইভে জিনিসটা সবাইকে দেখাতেও যাচ্ছি।

কড়া রোদ উঠেছে আজ। পেটে বেশ পরিমাণ ক্ষুধা। মাথায় শুধু ঘুরছে গত রাতে বাদলের বলা দুটো উক্তি। লাইভে নাকি এগুলো সেফুদা'র সাথে বলতে হবে। একটা হল, 'হাত ধুবি, মানুষ হবি'...
আরেকটা হচ্ছে,
'করোনা,
পাছায় ট্রস ট্রস করে মেরো না!'
নাহ, পাছায় মারার একটা চক্র শুরু হয়ে গেছে আজ। এ থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।

কে জানে ফেসবুক লাইভে সেফাতউল্লাহ নামের এই জিনিসের সাথে আমার কপালে কী অপেক্ষা করে আছে।
(চলবে)

 

আরও পড়ুন: 

হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : তৃতীয় পর্ব

 

হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : চতুর্থ পর্ব

হিমু এবং কয়েকটি নীল করোনা : প্রথম পর্ব

২২৩২ পঠিত ... ২০:৪৩, এপ্রিল ০১, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top