আমার বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর

২৯১০ পঠিত ... ১৩:৩১, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

আঁকা: সুংগা পার্ক
বাংলাদেশ ছেড়েছি সেই কবে! দিনটির কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। দিনটি ছিলো সোমবার। টার্কিশ এয়ারওয়েজে বিকেল চারটায় আমার ফ্লাইট। ধানমন্ডিতে থাকি। রাস্তার জ্যামের কথা ভেবে সকাল ১০টাতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম বাসা থেকে। বিজয় সরণির জ্যামে ঘন্টাখানেক কাটিয়ে একটু ঝিমুনিমতো হয়েছে, হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম তালতলার কাছাকাছি। ড্রাইভার জানাল, ভিআইপি রোডে আজকে নাকি সারাদিন ভিআইপি মুভমেন্ট থাকবে তাই বিজয় সরণির জ্যাম সন্ধ্যার আগে ছুটবে না। পুলিশ সব গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছে মিরপুরের দিকে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি বেলা একটা। আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেছে। সেই ১০টায় বেড়িয়েও চারটার ফ্লাইট মিস করবো? অসম্ভব কিছু না। আমার পরিচিত অনেকেরই এই অভিজ্ঞতা আছে। অর্ধস্বচ্ছ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, পাশেই টিনের ঘেরা দিয়ে চলছে মেট্রো রেলের কাজ। ধুলায় ধূসরিত চারদিক। এর মাঝেই লোকজন ছুটছে--বাসে, রিকশায়, ভ্যানে, টেম্পুতে, সিএনজিতে। আহারে মানুষের কষ্ট। সরকার কথা দিয়েছে এই মেট্রোরেল হলেই নাকি মিরপুরবাসীর কষ্ট এক লাফে সব দূর হয়ে যাবে। মানুষ সরকারের কথা খুব মেনে চলে, বিশ্বাসও করে। আশায় আছে, নিশ্চয়ই একদিন তাদের সব দুঃখ কেটে যাবে।

আমি টেনশন কমাতে মোবাইল খুলে ফেসবুকে নজর দিলাম। মাস দেড়েক হয় ফেসবুক খুব কম ঢুকছি। এত ক্যাওয়াস, খুব অস্থির হয়ে পড়ি অল্পতেই। নিজের উপরই আমার নিজের কড়া নির্দেশ, ফেসবুকের টেনশন নেওয়া যাবে না। তাই যতটা পারি এভয়েড করি। ইচ্ছে আছে প্লেনে উঠেই প্রথম যে কাজটা করবো সেটা হলো, ফেসবুকটা অ্যাপসমেত ডিলিট করে দেওয়া। বিদেশ বসে বাংলাদেশের টেনশন নেওয়ার আর কোনো মানে হয় না। ফেসবুকের কারণে অযথাই অনেক টেনশন করেছি। এত স্টুপিড কথাবার্তা, মন্তব্য চারদিকে! এছাড়া আমি সিয়াটলেবাসী হচ্ছি একটা বিশেষ কাজে। সেই কাজে মাথা খুব ঠান্ডা রাখতে হবে। তবুও শেষবারের মতো বাংলার মাটিতে বসে দেখি কী চলছে ফেসবুকে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। লিটফেস্ট নিয়ে খুব আলোচনা চলছে দেখলাম। একদল নারী স্টেজে কেন নাচানাচি করছে সেটা নিয়ে দেশ উদ্ধার করছে একদল। ফোকফেস্টের বেশ কিছু সেলফি চোখে পড়লো। একজন দেখলাম ক্লাসিকালের সাথে ফোক ফেস্ট গুলিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে, এইবারের গানগুলো নাকি সহজ আছে, বুঝতে পারছে সে। পেঁয়াজ নিয়েও দেখলাম ব্যাপক ক্যাচাল। দাম বেড়ে ২৫০ হয়ে গেছে। সরকার প্রধানরা বলছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে জনগনকে উপদেশ দিয়েছে, পেয়াজ আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য নয়, আপনারা সবাই পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করুন, আমি তো পেঁয়াজ ছাড়াই ২৭ পদ তরকারি খাই, আজ থেকে আপনারাও আর পেঁয়াজ খাবেন না। লোকজন সরকারের কথা শুনে পেঁয়াজ ছাড়া তরকারি ফেসবুকে আপ দিচ্ছে, রেসিপি শেয়ার করছে। চ্যানেল আইয়ে কেকা ফেরদৌসী পেঁয়াজমুক্ত রেসিপির রান্নার অনুষ্ঠান করছেন। এটিএন বাংলার একটা ক্লিপ দেখলাম, টকশোতে এক ডাক্তার এসে বলছেন, পেঁয়াজ কীভাবে আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় সেই কথা। জয়া আহসান পেঁয়াজ খায় না বলেই এখনো এত ইয়াং আছে সেই কথাও জানা গেল একজনের স্ট্যাটাস থেকে। একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ জানাচ্ছেন, সরকারের কথাই ঠিক আছে, মহাস্থানগড় থেকে শুরু করে দেশের কোনো পুরাকীর্তিতেই বাংলার মানুষের পেঁয়াজ খাওয়ার কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। 'আমরা পেঁয়াজ খাই না' নামে বেশ কয়েকটি হ্যাশট্যাগও জনপ্রিয় হয়েছে দেখলাম। আমি আর নিতে পারলাম না। ফোন পাশের সিটে ছুড়ে ফেলে দিয় চোখ বন্ধ করলাম। ড্রাইভারের ডাকে চোখ খুলে দেখি পৌঁনে তিনটা বাজে, পৌঁছে গেছি এয়ারপোর্ট। পড়িমড়ি করে ছুটলাম কাউন্টারে। 

২.
সিয়াটলের সামার খুব সুন্দর। ঝকঝকে নীল আকাশ। সবুজ পাতা গাছে গাছে। বাতাস এত তাজা, বুক ভরে একবার নিঃশ্বাস নিলে মনে হয়, শরীরে প্রয়োজনের চাইতে বেশি অক্সিজেন নিয়ে ফেললাম বুঝি। ঘন্টাখানেক আগে লেক ওয়াশিংটনের পাশে একটা পার্কে এসেছি আমাদের কুকুর স্টেলাকে নিয়ে। টেনিস বল নিয়ে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করে লেকের পানিতে তাকে সাঁতার কাটালাম। ক্লান্ত হয়ে সে এখন জিভ বের করে মাঠে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে পায়ের কাছে এসে কুই কুই করছে ট্রিটের লোভে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ১২টার মতো বাজে। পার্কের বেঞ্চ থেকে জিনিসপত্র গুছিয়ে রওনা দিলাম। স্টেলাকে বাসায় রেখে যেতে হবে ডাউনটাউনের একটা রেস্টুরেন্টে। অনেক দিনের পুরোনো এক কলেজ বন্ধু এসেছে সিয়াটলে। জিতু। তার সাথে সর্বশেষ দেখা হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় ৭ বছর আগে। যেদিন ঢাকা ছাড়ি তার আগের দিন। এরপর আমার আর ঢাকা যাওয়া হয়নি, তার সাথে দেখাও হয়নি। সে তখন এনজিও করে আর ফেসবুক-পত্রিকায় সরকারের সকল বিষয়ে সমর্থন দিয়ে বুদ্ধিজীবী ভাব ধরে বেড়ায়। সরকারের অন্ধ সমর্থক বলে আমরা সবাই তাকে খুব ক্ষেপাতাম। নামই দিয়েছিলাম 'সহমত জিতু' বলে। ও এখন সরকারের একটা বড় পদে আছে। গতকাল ১৮ সদস্যের একটা দলের অংশ হিসেবে সিয়াটলে এসেছে মাইক্রোসফটের হেড অফিসে থেকে তার দপ্তরের জন্য 'মাইক্রোসফট অফিস' কিনবে বলে।  

৩.   
সিয়াটলে আমার কাজের এত চাপ! দেশের খবর খুব একটা রাখা হয় না। ফেসবুকেও ঢুকি না কত বছর হবে কে জানে! দেশের নাকি অনেক উন্নতি হয়েছে, ঢাকায় এখন হাজার খানেক ফ্লাইওভার, জিডিপি বেড়েছে কোটি কোটি। সরকারি উন্নয়নে মানুষ খুবই খুশি। দেশের মেয়েরা এখন আর গার্মেন্টসে কাজ করে না, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি সব চলে গেছে সব ভিয়েতনামের দিকে। তাই কাপড়-চোপড়ের দাম একটু চড়া। কিন্তু মানুষের হাতে টাকা আছে বলে কোনো সমস্যা নাই। জিতুর কাছে এসব ফিরিস্তি শুনতে শুনতে তাকে মেন্যুটা এগিয়ে দিলাম। সে চোখ বুলিয়ে বলল, দোস্ত দুইদিন ধরে ভাত খাই না। ভাতের জন্য মনটা আনচান করছে। একটা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যা না। আমি বললাম, আরে ব্যাটা এটা লেবানিজ রেস্টুরেন্ট, এদের কাবাবটা খুবই ভালো খেয়ে দেখ। কিন্তু জিতুর একটাই কথা, সে ভাত খাবে। কি আর করা, আমি তাকে নিয়ে তিন ব্লক দূরের একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলাম।

৪.
টেবিলে খাবার আসতেই চমকে উঠে জিতু। ওয়েটার সাদা চামড়া। পার্ট টাইম কাজ করে রেস্টুরেন্টে। বাংলা কোনোমতে বুঝতে পারলেও বলতে পারে না। সে ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করে, এই আলু ভর্তায় কি মরিচ দিয়েছেন? ওয়েটার বলে, হ্যাঁ। পেঁয়াজ দিয়েছেন? হ্যাঁ। আলুও দিয়েছেন নাকি? হ্যাঁ। আরে করেছেন কি, করেছেন কি! আমি তো এসব দিলে খেতে পারি না। ওয়েটারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে জিতু আমাকে ফিসফিস করে বলে, এসব ছাড়া তরকারি, আলুভর্তা খাওয়া বাদ দিয়েছি তো আমরা সেই কবে থেকেই। ২০১৯ সালে দেশে যখন উন্নয়নের সর্বশেষ ধাক্কাটা লাগলো তখন থেকেই তো বাংলাদেশিরা আর কেউ পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা এইসব খায় না। এবার সে ওয়েটারকে বলে, আপনি পেঁয়াজ-মরিচ-আলু ছাড়া আলুভর্তা দেন।

ওয়েটার জিতুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি পরিস্থিতি শান্ত করতে বলি, আচ্ছা থাক আপনাকে আলুভর্তা দিতে হবে না। বাংলাদেশ থেকে আসছে তো! এসবে অভ্যাস নাই। আপনি এইসব ছাড়া কী তরকারি আছে নিয়ে আসেন। আলুভর্তার বাটিটা ওয়েটার নিয়ে যেতেই জিতু ভাতের প্লেটটা ওয়েটারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা শোনেন এই ভাতটাও নিয়ে যান। চাল ছাড়া তৈরি ভাত নাই আপনাদের কাছে?

ওয়েটার আবার কি বলবে বুঝতে পারে না। জিতু আমার দিকে তাকিয়ে বলে, এসব কী *লের রেস্টুরেন্টে আনলি আমাকে, ফালতু। বাংলাদেশি খাবারের রেস্টুরেন্ট নাই, খাঁটি বাংলাদেশি খাবারের?  

ছবি: স্তানিস্লাভ স্তাননভ

৫.
জিতুর কথা আমার মাথায় ঢোকে না। আমি তাকিয়ে আছি রেস্টুরেন্টের টিভি সেটটার দিকে। কতদিন বাংলাদেশি টিভি দেখি না। এটিএন নিউজের খবর চলছে সেখানে। বাংলাদেশের বস্ত্রমন্ত্রী আমজাদ খান সূতাবিহীন কাপড় পরে লস অ্যাঞ্জেলস আসার প্লেনে চড়তে গিয়েছিলেন। তাকে উঠতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি গলার রগ ফুলিয়ে বলছেন, এসব পশ্চিমা চক্রান্ত আমরা মানি না। আমাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হোক সেটাই তো তারা চায়...কাপড়ের দাম চড়া হলেও আমাদের জিডিপি এখন এত...আমাদের এতগুলো ফ্লাইওভার...আমরা উন্নয়নের রোলমডেল...! 

২৯১০ পঠিত ... ১৩:৩১, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top