রক্তের ছদ্মনাম
রক্তের বন্যায় ভেসে যেতে থাকা অন্যায়!
কিংবা, শহীদের রক্তে পাওয়া স্বাধীনতায়… মাতৃভাষায়
নাহয়, রক্তের বদলা রক্ত নেবার শপথটাতে
আবার হতেও পারে, পত্রিকার প্রথম পাতার অনেকটা জুড়ে থাকা
রক্তাক্ত ছবি, গতকালের বোমা হামলার এক্সক্লুসিভ ফটো সিরিজ তিন নম্বর পৃষ্ঠায়!
সিনেমায় মা-মরা নায়কের প্রতিশোধের রক্তে ভেজা সাদা জামায়
আরও ঘণ্টা দুয়েক আগে নায়কের মা যে,
তারে জন্ম দিতে গিয়ে রক্তে ভেসে মরেই গেছে।
কোথাও হয়তবা মুমূর্ষু রোগীর জন্যে রক্তের জরুরি প্রয়োজনে!
মোড়ে মোড়ে ক্লিনিক আর তার প্রতি কোণে রক্তের কত চিহ্ন।
হেথায় সেথায় কসাইখানা আর মুরগির দোকানকে ভাসিয়ে দিচ্ছে রক্ত।
বৃষ্টিস্নাত বকরি ঈদে পৌরসভায় বয়ে গেলো একটা আস্ত রক্তের নদী।
আর এদিক ওদিক দিয়ে রক্তমাখা তরবারি এবং রক্তে লাল পাঞ্জাবি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে
মাদ্রাসার কিশোরেরা, জাতিসংঘের চোখে যারা কিনা শিশু!
হতেও তো পারে, ফেটে যাওয়া রক্তাক্ত কপাল নিয়ে বিহ্বল বসে আছে কোনো বউ
মাছওয়ালার আঙুল ও রুই মাছের মাথার যুগপৎ বিচ্ছেদে ছিটকে পড়লো মিলিত রক্ত, উভয়ই লাল!
বাবুটার ফর্সা গালটা অল্পতেই লাল হয়ে যায়, তার থেকেও লাল হয়ে ফোটে মরে যাওয়া মশার রক্ত।
স্বাধীনতার বছরের কোনো এক মাসে কোনো এক গ্রামে, নদীর পাড়ে মরে পড়ে রইলো গ্রামবাসী
আর নদী এসব রক্ত বয়ে নিয়ে গেলো দক্ষিণের গ্রামে গ্রামে, ইতিহাসের পাতায়!
রক্তের সাথে আমাদের প্রচুর যোগাযোগ।
রেগে গেলে রক্তচক্ষু হয়, নির্ঘুম রাতের শেষেও… .
শিমুল আর পলাশেরা রক্তলাল হয়েই
শেকড় ভুলে বসা শহরবাসীর সাথে করে আইডেন্টিটি পলিটিক্স!
কোনো কোনো সন্ধ্যায় আকাশ রক্তাভ হয়ে উঠলে
উদ্যানের কোথাও কোনো বর্ষাপীড়িত জবা কিংবা কোনো উড়ুক্কু তরুণের চোখেও সেই রক্ত প্রতিফলিত হয়!
নতুন বউকে পরতে হয় রক্তের রঙ, কারো সারা শরীরে, কাউকে আবার কপালটাতেও…
পূবের দিগন্তে সূর্য উঠলে তারেও বলে রক্তলাল!
রক্ত আমাদের সিনেমায়, স্ক্রিনে, পাতায় পাতায়…
রক্ত আমাদের গানে, কবিতায়, স্লোগানে… কই নাই!
অবশ্য সব রক্ত সমান নয়।
ফুলমণি যে রক্ত প্রথম দেখেছিল এগারোতে
কামরুন্নাহার যে রক্ত শেষ দেখেছিলো বাহান্নতে…
যে রক্ত মিলিকে লুকাইতে হইছে খুব ভীড়ে
যে রক্ত প্রথম দেখে জেরিন কুঁকড়ে গেছিলো ভয়ে
যে রক্তের জন্যে আশা কিংবা সোফিয়ার জন্য পাত্রের খোঁজ শুরু হয়
যে রক্তে ভেসে যায় সালমার পড়ালেখা
সামান্থা যে রক্ত দেখে নাই মাঝে বছর কয়েক…
গ্রিক পুরাণ এবং কুরান মতে এই অদেখা রক্তেই নাকি ওর সন্তানের জন্ম!
সেই রক্তের কোনো চিনপরিচয় নাই আমাদের কারো কাছে।
এই রক্তের অস্তিত্ব আমরা স্বীকার করি না কোনোদিন।
পাছে কেউ শুনে ফেলায়, তাই লোকাল বাসে আফরোজা আর উর্মি,
কোচিংয়ের ক্লাসে শিউলি আর তৃণা, গার্মেন্টসের লাইনে লতা আর তারান্নুম, এবং আরও লাখ লাখ মেয়েরা
পায়জামার নিচে রক্তাক্ত উরুসন্ধি নিয়ে একইসাথে বেঁচে থাকে, চুপ হয়ে!
চারপাশে রক্তের এত পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকা আমরা কখনো রক্তের কথা বলতে গিয়ে মাসিকের কথা বলি নাই, বলি না।
অথচ, ছুরি আবিষ্কারেরও বহু বহুকাল আগে থেকেই
অলকানন্দা জলের মতোই মাসিকের রক্ত বয়ে যাচ্ছে…
এই মাসিক মূলত রক্তের প্রাচীনতম উৎস
মাসিকই হইলো রক্তের ছদ্মনাম!



পাঠকের মন্তব্য