সূর্যমুখী সবসময় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে কেন?

২৮২ পঠিত ... ১৩:৩২, জানুয়ারি ১৭, ২০২১

সূর্যমুখী ফুলের নাম থেকেই একটা ব্যাপার স্পষ্ট, এই ফুলটি সবসময় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। কিন্তু কেন এই বিশেষ ফুলটির ক্ষেত্রে এটি ঘটে, বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এর একটা স্পষ্ট উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পরিণত অবস্থার আগ পর্যন্ত দিনের বেলায় প্রতিটি সূর্যমুখী সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। কিন্তু পরিণত অবস্থায় পৌঁছার পর এই ফুলটি সেভাবে আর সূর্যকে অনুসরণ করে না, বরং সবসময় পূর্বদিকে মুখ করে থাকে। তরুণ সূর্যমুখী গাছের এভাবে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকাকে বলে ‘হেলিওট্রপিজম’, যা সার্কেডিয়ান রিদম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। উদ্ভিদের মধ্যে একটা বায়োলজিকাল ঘড়ির মতো প্রক্রিয়া আছে- যার ফলে সে দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং কখন সূর্য উঠে, কখন ‍সূর্য অস্ত যায়, সেটা বুঝতে পারে। এটার নামই সার্কেডিয়ান রিদম। মানুষের ভেতরও এই সার্কেডিয়ান রিদম আছে, যেটা ২৪ ঘন্টার একটা চক্র। একটি তরুণ সূর্যমুখী ফুল সকালে পূর্বদিকে মুখ করে থাকে এবং পরবর্তীতে দিন যত গড়াতে থাকে, ফুলটিও তত পশ্চিমদিকে ঘুরতে থাকে। রাতের বেলা এটি আবার পূর্বদিকে মুখ করে থাকার অবস্থানে ফিরে আসে এবং সকালে আবার নতুন করে চক্র শুরু করে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট বায়োলজির অধ্যাপক স্টেসি হারমার সূর্যমুখী ফুলের এই অদ্ভুত চক্রটি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর লেখা গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সূর্যের দিকে মুখ করে থাকলে গাছটার পক্ষে অনেক বেশি ফোটন কণিকা শুষে নেয়া সম্ভব হয়, আর আলো হচ্ছে গাছের জন্য খাদ্যের মতোই একটা জিনিস। তিনি গবেষণার অংশ হিসেবে টাইম-ল্যাপস ভিডিও দিয়ে পরীক্ষা করে সূর্যমুখী গাছের এই চক্রের (দিনের বেলা ক্রমাগত পশ্চিমদিকে আবর্তন এবং রাতের বেলা ক্রমাগত পূর্বদিকে অবর্তন) প্রমাণ পেয়েছেন।

একটা ফুলের ডাটা এভাবে দিক পরিবর্তন করতে পারে, অধ্যাপক হারমার তাঁর গবেষণায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। এটা বুঝতে গবেষক দল সূর্যমুখী ফুলের ডাঁটার  কোষের বিভাজনের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছেন। তাঁরা দেখেছেন, দিনের বেলা সূর্য পূর্বদিকে উঠে বলে সূর্যমুখীর ডাঁটার পূর্বদিকের কোষের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে, কিন্তু পশ্চিমদিকের কোষ ততটা বাড়ে না। তাই ভারসাম্যের কারণেই ডাঁটার মাথায় থাকা ফুলটা তখন ক্রমাগত পশ্চিম দিকে ঘুরতে থাকে এবং রাতের বেলা ঠিক উল্টোটা ঘটে। 

কিন্তু সূর্যমুখীর বেলাতেই কেন এই পরিবর্তন? এটা বোঝার জন্য অধ্যাপক হারমার ও তাঁর গবেষক দল টবে লাগানো সূর্যমুখী মাঠের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। তারপর সন্ধ্যায় যখন গাছটা পশ্চিমদিকে ঘুরে আছে, তখন পুরো টবটাকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে আবার পূর্বমুখী করে দিয়েছেন। ফলে পরদিন যখন সূর্য উঠছে, তখন ফুলটা যথেষ্ট সূর্যের আলো পাচ্ছে না- কারণ সে আসলে উল্টো দিকে ঘুরে আছে। গবেষকরা দেখেছেন যে মাটিতে লাগানো গাছগুলোর তুলনায় এই টবের গাছগুলোর ওজন কমে গেছে এবং তার পাতার আকৃতি ছোট হয়ে গেছে। গবেষকরা সূর্যমুখীকে সূর্যের বিপরীত দিকে মুখ করে বেঁধে রেখেও পরীক্ষা করে দেখেছেন। ফলাফল একই। এতে গাছের পাতা ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে গেছে এবং গাছের ওজন কমে গেছে। 

পরিণত সূর্যমুখী আবার ভিন্ন আচরণ করে। কারণ, গাছটার যখন বৃদ্ধির গতি কমে যায়, সকাল বেলায় এটি সূর্যের আলো অনেক বেশি শোষণ করে নেয়, যার ফলে বিকেলের দিকের তার অতটা সূর্যের আলোর প্রয়োজন হয় না। এই কারণেই গাছটার সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম দিকে আবর্তনের দরকার হয় না। 

শেষে ছোট আরেকটি তথ্য- সূর্যমুখী ফুল কিন্তু একটি ফুল না, বরং অনেকগুলো ছোট ছোট ফুলের সমষ্টি। এই ছোট ছোট ফুলগুলোকে বলা হয় ‘ইনফ্লোরুসেন্স’ এবং অনেকগুলো ইনফ্লোরুসেন্স মিলে যখন একটি বড় ফুলের মত সৃষ্টি করে, তখন সেটির নাম Capitulum।

২৮২ পঠিত ... ১৩:৩২, জানুয়ারি ১৭, ২০২১

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top