সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনন্য জীবনের কিছু অজানা কাহিনী

৩০৫ পঠিত ... ১৫:০৬, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২১

জনপ্রিয় বাঙালি কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জন্মেছিলেন ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৪ সালে অধুনা বাংলাদেশের মাদারীপুরে। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান, তারপর জীবন কাটিয়েছেন ছিলেন প্রিয় শহ কলকাতাতেই। চলুন আজ জেনে নেয়া যাক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের কিছু অজানা বা 'কম জানা' ঘটনা ও তথ্য। 

Sunil-ojana-kahini (1)


• ১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ সংখ্যার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সুনীলের কবিতা। তখন কবির বয়স ছিল ১৭। ‘একটি চিঠি’ শিরোনােমের ওই কবিতায় কবির নাম ছিল সুনীল কুমার গঙ্গোপাধ্যায়। এভাবে কুমার নাম নিয়েই চলতে থাকে তার লেখালেখি। তবে ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৫ সালে ‘কুমার’ শব্দটি খসে পড়ে কবির নাম থেকে। নাম হয় শুধুই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

• বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সাহিত্যিক জীবনের সূচনার কথা বলতে গেলে তাঁর মনে পড়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরের কথা। হাতে তখন অঢেল সময়। তাঁর বাবা চাইতেন ঘরে আটকে রাখতে। টেনিসনের কালেকটেড ওয়ার্কস থেকে প্রতিদিন দু'টি করে কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে বাবাকে দেখানো, এই ছিল সুনীলের প্রতি তাঁর নির্দেশ। প্রথমদিকে তিনি ডিকশনারি দেখে বেশ কষ্ট করে অনুবাদ করতেন। পরে তিনি খেয়াল করলেন, তাঁর বাবা ইংরেজি কবিতার লাইনসংখ্যা দেখে নিয়ে তা বাংলা অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে টিকচিহ্ন মেরে ছেড়ে দেন। তখন তিনিও আর অনুবাদে না গিয়ে ইচ্ছেমতো বানিয়ে কবিতা লিখে দিতেন...!

• সুনীল প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন পছন্দের মেয়েটির মন পাওয়ার জন্য। ততদিনে তিনি রীতিমতো প্রেমে পড়ে গেছেন। চিঠি দিয়ে প্রেম নিবেদন করা বহু মুশকিল। তাই একটি কবিতা লিখলেন, 'একটি চিঠি' নাম দিয়ে। ১৯৫১ সালের কোনো এক মাসে কবিতাটি পাঠিয়ে দেন ‘দেশ’ পত্রিকায়। এর প্রায় চার মাস পর একটা বাদামী খামে তার একটি ভারি খামে চিঠি আসে। খুলে দেখেন, ‘দেশ’ পত্রিকার একটি সংখ্যা। সেখানে ছাপা হয়েছে ‘একটি চিঠি’...
বন্ধুবান্ধব এবং এমনকি সেই কিশোরীও তাঁকে বলেছিল, 'দেখেছো, দেশ-এ একজন একটা কবিতা লিখেছে। ঠিক তোমার সঙ্গে নাম মিলে গেছে...' তিনিই যে ওটা লিখতে পারেন কেউ কল্পনাও করেনি। তিনিও কাউকে বলেননি...

• প্রথম লেখা সেই কবিতাটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো বইয়ে নেই। পরবর্তীতে সে কবিতা এত দুর্বল মনে হয়েছে যে, কোনো বইয়ে রাখা হয়নি।

• ২০০২ সালে প্রকাশ পায় তাঁর উল্লেখযোগ্য বই ‘অর্ধেক জীবন’। তিন দশক ধরে চলা আত্মজীবনীমূলক ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে এই বইতে। ‘অর্ধেক জীবন’ যেন নিজের উপরই করা কোনো এক্সপেরিমেন্ট!
‘দেশ’ পত্রিকায় যখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পায় এই বইটি, পাঠকরা অভিযোগ তোলেন এর নাম নিয়ে। তাদের কথা হলো, তিনি কেন এর নাম ‘অর্ধেক জীবন’ দিয়েছেন। তিনি তো নিজের আয়ুরেখা মেপে নেননি, এমনই অভিযোগের সুর ওঠে পাঠকসমাজে। এর উত্তরে লেখক বলেন যে, এর নামের সাথে তার আয়ুর কোনোই সম্পর্ক নেই। এখানে তিনি তার জীবনের নির্দিষ্ট একটা সময়কে তুলে ধরতে চ্যেছেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সময়টুকুকে। সাহিত্যে নোবেল পাওয়া ভি এস নাইপলের ‘হাফ অফ লাইফ’ বইয়ের সাথে কাকতালীয়ভাবে নাম মিলে যাওয়াতে খানিকটা অপ্রস্তুতও বোধ করেছিলেন লেখক, এমনটাই বলা হয়েছে বইটির প্রস্তাবনায়...

• রবীন্দ্রনাথকে উঁচু দরের সাহিত্যিক মনে করতেন সুনীল এতে সন্দেহ নেই, তবে প্রথম জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর মনোভাব খুব ইতিবাচক ছিল না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন: ‘তিনজোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোশে’। সুনীরবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছ থেকে তাকে বহু নিন্দা সহ্য করতে হয়েছে এজন্য। তবে মূল ব্যাপারটি ছিল অন্যরকম।
তারাপদ রায় ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধু। তিনি ছিলেন অবিবাহিত। রাত হয়ে গেলে প্রায়ই তাঁর বাড়িতে থেকে যেতেন সুনীল। শুতে খুব অসুবিধে হত। চারদিকে রবীন্দ্র রচনাবলীতে ভর্তি। তাই লাথি মেরে জায়গা করে নিতেন। তিনি বলেছেন, 'ওটা একটা স্টাইল হিসেবে লেখা। চারদিকে রবীন্দ্রভক্তি দেখে দেখে আর তাঁর নাম শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। গা জ্বলে যেত। বিরক্ত হতাম খুব। যার ফলে বহু কটুক্তি করেছি...'

পরবর্তীতে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর মনোভাব বদলে যায়....

• বাংলাদেশের অনেক সাহিত্যিকের ওপরেই সুনীলের লেখার প্রভাব রয়েছে৷ তা তাঁরা স্বীকারও করেন৷ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, সুনীলের লেখা আত্মস্থ করেই তিনি সাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন৷

• বিশ্বসাহিত্যের প্রিয় লেখকের কথা বলতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, তিনি দস্তয়ভস্কির সবই পড়েছেন। বহুবার পড়েছেন। প্রতিবারই মুগ্ধ হয়েছেন। ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’ বইটা তাঁর কাছে মনে হয়েছে বেদের মতো অবশ্যপাঠ্য। বেদ যেমন হিন্দুদের জন্য, ঐ বইটা ঠিক তেমনই ভক্তির ছিল তাঁর জন্য। বন্ধুবান্ধবদের ধরে ধরে বলতেন, 'পড়েছিস? পড়িসনি? পড়ে নে। সাহিত্যিক হতে হলে অবশ্যই ওটা পড়া দরকার...'

• তাঁর একটা অদ্ভুত ধারণা হয়েছিল- কবি হতে হলে শেক্সপিয়রকে বুঝতে হবে। এত নাম-ডাক, নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে।
এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'শেক্সপিয়রের ইংরেজি পড়ে তো বোঝা যায় না। নিচে সব নোটস-ফোটস থাকে। ঐসব ধরে ধরে পড়তাম। সুবিধে হয়েছিল এই যে, আমার একটা বন্ধু ছিল যার ইংরেজি জ্ঞান ছিল আমার চেয়েও কম। ও আমাকে বলে, তুমি আমাকে শেক্সপিয়র পড়াবে? যদি পড়াও তবে তোমাকে সিগরেট খাওয়াব। সিগরেট খাওয়া তখন আমার কাছে বিলাসিতার কাজ। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ঐসব নোটস-ফোটস থেকে ওকে শেক্সপিয়র বোঝাবার চেষ্টা করুতম। নিশ্চয়ই তাকে অনেক ভুলভাল বুঝিয়েছি। নিজেই কি সব বুঝেছি?'

• কলকাতায় ম্যান্ডভিলা গার্ডেন্সের বহুতল ‘‌পারিজাত’–‌এ এ ২/৯ ফ্ল্যাটে বহু বছর বাস করেছেন তিনি। সুনীল-পত্নী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, এই বাড়িতে বসেই কত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস, গল্প, কবিতা লিখেছেন সুনীল। কত লেখক, কবি, সম্পাদক এসেছেন ওঁর কাছে।
তাঁর লেখনীর স্মৃতিতে অম্লান করে রাখতেই ম্যান্ডভিলা গার্ডেন্স রোডের নাম রাখা হয়েছে ‘কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সরণি”...

৩০৫ পঠিত ... ১৫:০৬, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২১

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top