বাংলা সিনেমার তিন কাল: সেকাল, একাল ও আকাল

৮৫৮ পঠিত ... ১৬:৩১, জুন ০২, ২০২১

গত শতাব্দীর শুরু থেকে বাংলা সিনেমার বিভিন্ন সময়, যুগ বা কালকে অনেক দিক দিয়েই ভাগ করা যায়। তবে এখানে প্রধানত তিন কালে ভাগ করেছেন বাংলা সিনেমার 'কামিং অফ এজ' বিশেষজ্ঞ আবদুল মতিন সোহাগ। তিন কালে বাংলা সিনেমার ব্যাসিক কাহিনীর স্ট্রাকচার জেনে নিন।

bangla-cinemar-3-kal

 

১. সাদা-কালো যুগ

সে যুগে নায়ক-নায়িকাদের প্রেম হতো নদীর ঘাটে, পুকুর পাড়ে কিংবা নায়কের বাঁশির সুরে নায়িকা প্রেমে পড়তো অথবা নায়িকার চাঁদের মতো রূপ দেখে নায়ক ‘টাশকি খেয়ে’ নায়িকার প্রেমে পড়তো। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। দেখা হতো রাতের বেলা বাঁশ বাগানের ধারে, নদীর পাড়ে কিংবা জনমানবহীন কোনো নির্জন জায়গায়। নায়কের শিক্ষাগত যোগ্যতা সর্বোচ্চ পঞ্চম শ্রেণী পাশ। নায়ক-নায়িকার বাবাদের একজন থাকতেন কৃষক আর অন্যজন গাঁয়ের মোড়ল কিংবা জমিদার (রাজা-বাদশাও হতে পারে )। দুই পরিবারের লড়াই হয় জমি দখল, চর দখল ইত্যাদি নিয়ে। নায়ক-নায়িকারা এক কাপড়েই গান গেয়ে শেষ করেন। কদাচিত্‍ একজন আরেকজনের হাত ধরেন।
নায়ক কখনো বিরহ যাতনায় ভুগলে দেখা যেতো যে, নায়ক কোনো ভাঙা ঘরে বসে সাধনা ঔষদের বোতলে বাংলা মদ (যেটা দেখতে ভাতের মাড়ের মতো) তা গিলছে! নায়কের প্রধান অস্ত্র থাকতো নায়কের দাদার রেখে যাওয়া বৃটিশ আমলের তেল মাখানো চকচকে লাঠি। এই লাঠি দিয়েই তিনি তাবদ রকম বালা-মুসিবত দূর করতেন ছবি শেষ হওয়া পর্যন্ত! এই লাঠি দিয়ে শত শত মাটির কলসি এবং পাতিল ভাংচুর করতে দেখা যায়। নায়ক-নায়িকারা যদি অসুখে পড়তেন তবে তাদের বাসায় কবিরাজ ডেকে আনা হতো।
নায়িকাকে যদি কোন বজ্জাত কুমতলবে আক্রমন করতো, তবে নায়িকা বলতো: আমাকে ছুঁবেন না ভাই, আল্লার দোহাই। নয়তো আপনার উপর গজব পড়বে!
তারপর অনেক ঝামেলার পর নায়ক-নায়িকাদের প্রেম তাদের মা-বাবা মেনে নেন। কুটিল চরিত্ররা সুশিল চরিত্রের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। নায়ক বিয়ের সানাই বাঁজিয়ে নায়িকাকে বৌ করে পালকি করে নিয়ে আসেন। শেষ দৃশ্যে পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না!

 

২. রঙিন যুগ

এই যুগে নায়ক-নায়িকাদের প্রেম হয় কলেজের সিঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে কিংবা নায়িকাকে কোনো বজ্জাতের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে, কিংবা নায়কের টেক্সি ভাড়া দিতে গিয়ে যখন নায়িকা দেখে তাঁর কাছে সবই পাঁচশত টাকার নোট- ভাংতি নেই! এক্ষেত্রে নায়কের শিক্ষাগত যোগ্যতা হলো: তেঁজগাও কলেজ থেকে বিএ পাশ। উনাদের যোগাযোগের মাধ্যম হলো মোবাইল ফোন । উনারা প্লান প্রোগ্রাম করে নায়কের মোটর বাইক কিংবা নায়িকার গাড়িতে করে পার্কে দেখা করতে আসেন। আচমকা উনারা গানে চলে যান। চৈত্র মাসের গনগনে রোদেও উনাদের গানে ঝড়-বাদল শুরু হয়ে যায়। এতো অধিকসংখ্যক বার পোশাক বদলান যে, আপনার মনে হতেই পারে যে, গার্মেন্টস শিল্পে বিশ্বে আমরাই প্রথম! এই যুগের নায়ক-নায়িকারা একটু স্মার্ট। উনারা গানের ইমোশনের সাথে একজন আরেকজনকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরেন। উনাদেরকে কদাচিত্‍ চুমু খেতে দেখা যায়। এখানে নায়ক-নায়িকার বাবাদের একজন থাকেন চেয়ারম্যান কিংবা শিক্ষক। অন্যজন থাকেন বিরাট শিল্পপতি। মূল কাহিনি হলো: ত্রিশ বছর আগে নায়কের বাবার হত্যার বদলা নেয়া। নায়ক সাথে তেমন কোনো ভারী অস্ত্র বহন করেন না। তিনি একাই খালি হাতে ২০/২৫জনকে শায়েস্তা করতে সক্ষম। নায়ক কিংবা নায়িকা অসুস্থ হলে উনাদেরকে ‘রাবেয়া ক্লিনিক’ এ নিয়ে যাওয়া হয়।
কোনো বজ্জাত যদি নায়িকাকে আক্রমণ করে তখন নায়িকা জবাব দেয়: ছেড়ে দে শয়তান, তুই আমার শরীর পাবি কিন্তু মন পাবি না!
যদি নায়ক কখনো বিরহে ভুগেন তবে বারে গিয়ে লাল রংয়ের মদ খেয়ে টাল হয়ে থাকেন । নায়ক-নায়িকাদের অনেক কাঁঠ কয়লা পুড়িয়ে প্রেমের মিলন ঘটাতে হয় । কদাচিত্‍ লক্ষ করা যায় যে, অনেক সময় নায়ক-নায়িকা কিংবা ছবির শুরুতে উনাদের মা-বাবারা নিজেরাই নিজ দায়িত্বে বিবাহের কাজ সম্পাদন করে গাড়ি চড়ে বাড়িতে আসেন । শেষ দৃশ্যে নায়ককে অনেক লড়াই করতে হয় । এতে প্রচুর গুলি এবং বোমা ব্যবহত হয়। ব্যাপক ডানোর ডিব্বা এবং ড্রাম নষ্ট হয়। ভিলেনের পক্ষে গোটা দশেক আহত এবং দু'একজন নিহত হলেও নায়ক এবং উনার পরিবার বহাল তবিয়তে থাকেন (যদি একের অধিক নায়ক-নায়িকা থাকে তবে ভিলেনের ক্রস ফায়ারে একজনের মৃত্যু অবধারিত)। ভিলেনকে হত্যার পূর্ব মুহূর্তে পুলিশ এসে উপস্থিত হয় !

 

৩. ডিজিটাল যুগ

এটা বর্তমান যুগের সিনেমার কাল। এখানে নায়ক-নায়িকার পরিচয় হয় ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগ সাইটে রিএকশন দেয়া-নেয়া নিয়ে। তারপর চ্যাটিং। সেখান থেকেই প্রেম। চা নাস্তা করার জন্য নায়িকা নায়কে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানায়। নায়ক দেখা করতে যান। এক সময় উনারা গানের ভুবনে হারিয়ে যান। তাদের গানের স্থান হয় দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব জায়গা। তাদের পেছনে নাচানাচিতে থাকে ছেঁড়া কাপড় পরা একদল বিদেশি ম্যাম।
নায়ক ঠোঁটে লিপস্টিক, কানে দুল এবং হাতে চুড়ি পরেন। নায়ক-নায়িকার লেখাপড়া সব সময়ই বিলেত পাশ হয়। তাদের দুজনের বাবাই মন্ত্রী হন। বাধ সাধে তৃতীয় পক্ষ। নায়ক-নায়িকা অসুস্ত হলে উনাদের প্রাইভেট বিমানে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়। নায়িকাকে দুষ্ট লোকে আক্রমণ করলে নায়িকা বলেন: ভাই, তুই আমার দেহ মন সব নিয়ে নে, কিন্তু ভিডিও করিস না!
মাঝেমধ্যে ব্যাকগ্রাউন্ডে রিয়াল লোকেশনের বদলে উইন্ডোজ এক্সপির স্ক্রিন সেভার ধরনের অ্যামেচার গ্রাফিক্স দেখা যায়। এখানে কথায় কথায় গুলি চলে। অটোমেটিক সব অস্ত্র। সূর্যের আলোতে বুলেট তৈরি হয়। যা কখনো ফুরোয় না- টাস টাস টিসিয়া! লাখে লাখে লোক মরতে থাকে কিন্তু নায়কের একটা চুলও ছেঁড়া পড়ে না। সিনেমা দেখার পর আপনি মনে করতে পারবেন না, ছবি শুরুতে কাহিনি কী ছিল আর কোথায় এসে শেষ হয়েছে...!

আর এভাবেই যুগ যুগ ধরে সেকাল-একাল পেরিয়ে আমাদের বাংলা সিনেমা সোনালী সময় অতিক্রম করে এখন আকালে নেমে এসেছে!

 

৮৫৮ পঠিত ... ১৬:৩১, জুন ০২, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top