বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন যারা

১২৪ পঠিত ... ২০:৪৩, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’- বিবিসের ২০০৪ সালে করা এক নামকরা জরিপ। সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ বিশজন বাঙালির তালিকায় ১৫তম স্থানে কোন একজন ব্যক্তির নাম আসেনি। বলা যেতে পারে এসেছিল একটি চেতনার নাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর- এঁদের একযোগে 'ভাষা শহীদ' হিসাবে মনোনীত করেছিলেন অসংখ্য শ্রোতা।   

একাত্তর সালে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম, তবে স্বাধীনতার বীজটি কিন্তু বোনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। মুক্তিযুদ্ধের যে দীর্ঘ বিস্তৃত পটভূমি, তাকে উপেক্ষা করে বা হিসাবে না রেখে এ দেশের ইতিহাস হবে খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ। বায়ান্নর ভাষাশহিদেরাই আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের পথচলার শুরুটা করে দিয়েছিলেন এবং নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে একটা সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা আলাদা রাষ্ট্র পেয়েছি। 

বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি নিয়ে অনেক লেখাজোকা হয়েছে। আরও হবে। আমরা পাঁচজন শহিদের নাম বেশি বেশি শুনতে পাই: সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর। এঁদের মধ্যে বরকত ও জব্বার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রফিক ছিলেন বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে। এঁরা তিনজন নিহত হন ২১ তারিখে। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মারা যান রিকশাচালক সালাম এবং হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের ভাষ্যে জানা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারি ভিক্টোরিয়া পার্কের (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক) আশপাশে, নবাবপুর রোড ও বংশাল রোডে গুলিতে কতজন মারা গেছেন, তার সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। আহমদ রফিক তাঁর একুশ থেকে একাত্তর বইয়ে নিহতদের মধ্যে আবদুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ ও সিরাজুদ্দিনের নাম উল্লেখ করেছেন।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’সংকলনে অন্তর্ভুক্ত কবির উদ্দিন আহমদ তার ‘একুশের ইতিহাস’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘আটজনের মৃত্যুর কথা সন্দেহাতীতভাবে জানা যায়।’এই সূত্র ধরে এম আর আখতার মুকুল আটজন ভাষাশহীদের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। তালিকাটিতে ২১ ফেব্রুয়ারি রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম এবং ২২ ফেব্রুয়ারি শফিকুর রহমান, আব্দুল আউয়াল, অহিউল্লাহ ও অজ্ঞাত বালককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ভাষাশহিদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন পাঁচজন—আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম ও শফিউর রহমান। ২০০০ সালে তাদের রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে।

151218444_179474956961635_8835241267652445800_n

চলুন, এই পাঁচ ভাষাশহিদের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জেনে নেয়া যাক-

রফিক উদ্দিন আহমদ (১৯২৬-১৯৫২): ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৯৪৯ সালে বায়রা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে অধ্যয়নকালে তিনি পড়াশুনা বন্ধ করে ঢাকায় চলে আসেন এবং বাবার মুদ্রণশিল্প ব্যবসায়ে নিয়োজিত হন।

বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সারা ঢাকায় ধর্মঘট আহবান ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। সরকার ঐদিন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করে। রফিক উদ্দিনও মিছিলে অংশ নেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেল প্রাঙ্গণে মিছিলের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে এবং ঘটনাস্থলেই রফিক উদ্দিন শহীদ হন। পুলিশ তাঁর লাশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যায় এবং রাত ৩টায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় ঢাকার আজিমপুর গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়।

শফিউর রহমান (১৯১৮-১৯৫২):   শফিউর রহমান ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুর জনপদের কোন্নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাহবুবুর রহমান ছিলেন ঢাকার পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। তার মাতার নাম কানেতাতুন নেসা। কলকাতা গভর্ণমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে শফিউর রহমান চব্বিশ পরগনা সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানীর চাকরি গ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের পর পিতার সঙ্গে ঢাকায় এসে ঢাকা হাইকোর্টে হিসাব রক্ষণ শাখায় কেরানী পদে যোগ দেন।

১৯৫২‌ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটার দিকে ঢাকার রঘুনাথ দাস লেনের বাসা থেকে সাইকেলে করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন শফিউর। সকাল সাড়ে দশটার দিকে নওয়াবপুর রোডে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্বদিনের পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ পুণরায় গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলি শফিউর রহমানের পিঠে এসে লাগে। ১৯৫৪ সালের শহীদ সংখ্যা সাপ্তাহিক সৈনিকে তার সম্পর্কে প্রকাশিত বিবরণ থেকে জানা যায়, ঐদিন সকাল ১০টায় তিনি সাইকেলে চড়ে নবাবপুর রোড হয়ে অফিসে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি রাইফেলের গুলি তার পৃষ্ঠভেদ করে বের হয়েছে এবং এতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সরকারি এ্যাম্বুলেন্স যোগে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ডা. এ্যালিনসন অপারেশন করেন। ঐদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় তিনি মারা যান। গুলিতে শহীদ শফিউরের কলিজা ছিঁড়ে গিয়েছিল। অপারেশনের সময় সফিউরের মাতা, পিতা, স্ত্রী, মেয়ে শাহনাজ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

মৃত্যুর পর পুলিশ আত্মীয়দের কাছে লাশ হস্তান্তর করেনি। ১৪ মার্চ ১৯৫২ তারিখের দৈনিক আজাদে প্রকাশিত সরকারি তথ্য বিবরণী অনুসারে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট তার জানাজা পড়ান। জানাজায় তার পিতা ও ভাই উপস্থিত ছিলেন। তারপর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তার কবরের পাশেই রয়েছে পূর্বদিন মৃত্যুবরণ করা আবুল বরকতের কবর

আবদুল জববার (১৯১৯-১৯৫২): ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে ১৩২৬ সনের ২৬ আশ্বিন (১৯১৯ খ্রি) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় পাঠশালায় কিছুকাল অধ্যয়নের পর দারিদ্রের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে তিনি বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেন। পনেরো বছর বয়সে বেশি রোজগারের আশায় একদিন সবার অজান্তে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রেনে চলে আসেন বাণিজ্যকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে। সেখানে জাহাজঘাটে তিনি এক ইংরেজ সাহেবের সান্নিধ্যে আসেন এবং তারই সহায়তায় আবদুল জববার একটি চাকুরি নিয়ে বার্মায় চলে যান। বার্মায় অবস্থানকালে তিনি ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন। প্রায় বারো বছর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

১৯৫২ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য তিনি স্ত্রীসহ ঢাকায় আসেন (২০ ফেব্রুয়ারি) এবং শাশুড়িকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ব্যাপক জনসমাবেশ ঘটে। আবদুল জববারও ওই সমাবেশে যোগ দেন। সে সময় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালালে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই রাতেই তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

আবুল বরকত (১৯২৭-১৯৫২) : তিনি ১৯২৭ সালের ১৩ জুন (মতান্তরে ১৬ জুন) মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম আবাই।

তাঁর পিতার নাম সামসুজ্জোহা এবং মাতা হাসিনা বিবি। আবুল বরকতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় বাবলা বহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি ১৯৪৫ সালে তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৭ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন এবং এম.এ শেষ পর্বে ভর্তি হন।

বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নেয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রাত আটটায় হাসপাতালে তিনি শাহাদত বরণ করেন। তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আবদুস সালাম (১৯২৫-১৯৫২) : সালাম ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামানুসারে পরবর্তীতে গ্রামের নামকরণ করা হয় সালামনগর। তার পিতার নাম মোহাম্মদ ফাজেল মিয়া ও মাতার নাম দৌলতের নেছা। ফাজেল মিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ইরাকের বসরায় কর্মরত ছিলেন। সালাম কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর তৎকালীন মাতুভূঁই কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে (বর্তমানে মাতুভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়) অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আতাতুর্ক মডেল হাই স্কুলে (তৎকালীন দাগনভূঞা আতাতুর্ক হাইস্কুল) ভর্তি হন এবং সেখানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। আর্থিক অনটনে পরবর্তীতে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

সালাম লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পর কলকাতা গমন করেন এবং সেখানে মেটিয়াবুরুজে তার বড় বোনের স্বামী আবদুল কাদেরের মাধ্যমে কলকাতা বন্দরে কাজ শুরু করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং আজিমপুরে (পলাশী ব্যারাক) ৩৬বি নং কোয়ার্টারে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগের 'পিয়ন' হিসেবে কাজ শুরু করেন।

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বায়ান্নোর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ এলোপাথাড়িভাবে গুলি চালালে অন্যদের সাথে আবদুস সালামও গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৫২ সালের ৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

 

তথ্যসূত্র:

আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ঢাকা, ১৯৭৫;

আবদুল হক, ভাষা-আন্দোলনের আদি পর্ব, ঢাকা, ১৯৭৬;

বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ১ম খণ্ড, ঢাকা, ১৯৭৯।

১২৪ পঠিত ... ২০:৪৩, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top