হুমায়ূন আহমেদের চোখে খাদ্যবিলাস!

৪২৪৬ পঠিত ... ২২:১২, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

যদি বলি বাঙালির খাদ্য এবং গদ্য রুচির ভিন্নতা আনয়নে হুমায়ুন আহমেদের বিশেষ অবদান আছে তবে অনেকেই হৈহৈ করে উঠবেন। তবে যতই হৈহৈ করে উঠেন না কেন ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সাথে এক চামচ ঘি, মচমচে বেগুন ভাজা, সবুজ কাঁচামরিচ থেকে শুরু করে বাসি পোলাওয়ের সাথে ডিমভাজা-- এই সামান্য খাবারকে বাঙালির কাছে অসামান্য করে তুলেছেন যিনি তাকে কিন্তু খাদ্যরসিক হিসেবে সেভাবে আমরা মনে রাখিনি। 

তবে যেহেতু তারায় তারায় রটিয়ে দেয়া আছে 'তোরে ভুলে যাওয়ার লাগি আমি ভালোবাসিনি...' তাই আমরাও সে সুযোগ দিচ্ছি না। আজ eআরকি করতে করতেই আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই হুমায়ূন সাহিত্যে খাদ্যপ্রীতির কথা। 

আপনি টেবিলে খাবার পেলে কপকপিয়ে খান নাকি আসলেই খাবার বোঝেন বা খাবার নিয়ে ভাবেন তার একটা ছোট্ট পরীক্ষা হয়ে যাক! আতাহারকে মনে আছে? ‘কবি’-তে যে তার বন্ধু সাজ্জাদের বোন নীতুকে যতটা ভালোবেসেছিল হয়তো তার থেকেও বেশি ভালোবেসেছিল নীতুর হাতের নাশতাকে। আহামরি কিছু নয় সে নাশতা। এই একটু আগুন-গরম পরোটা, ডিমভাজা আর গরুর মাংস। মচমচে সেই পরোটা একটা খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই চলে আসবে দ্বিতীয়টা। দ্বিতীয়টা শেষে তৃতীয়টা। খাওয়া শেষে এক কাপ চা বা কফি। 

মনে নেই? তাহলে তো মনে হচ্ছে আতাহারের বাবাও আপনার থেকে বেশি ভোজন রসিক ছিলেন। উনি অন্তত বাসর রাতে স্ত্রীর হাতে এক গ্লাস লেবুর শরবত খেতে চাওয়ার মতো সাহসী কাজ করেছেন। 

আতাহারকে না হয় ভুলে গেলেন কিন্তু 'লীলাবতী'তে লীলার জন্য যে আয়োজন করে তার মা রান্না করেছিল কাঁঠালের বিচির সাথে মুরগির সালুন সেটা নিশ্চয়ই মনে আছে? আহা, মুরগীর মাংসের সাথে কাঠালের বিচি! স্বাদ তো অপূর্বই হওয়ার কথা। যারা জানেন না তারা সালুন মানে যে ঝোল সেটা নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন। কিন্তু মুরগির মাংসের সাথে যে কাঁঠালের বিচি রসায়নটা যে এত চমৎকার হতে পারে সেটা হুমায়ূন ছাড়া এই শহুরে প্রজন্মকে কেই-বা জানিয়েছে সেভাবে!  

তেঁতুল বনে জোছনার কথা মনে আছে? যেখানে ডাক্তার আনিসকে মতি বেশি করে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে ঝালঝাল করে মরা ডাহুক পাখি রান্না করে খাওয়াতে চায়? না যা ভাবছেন তা নয়, ডাহুক অন্য পাখির মত শক্ত নয়। হুমায়ূন ভাষ্যে এর মাংস নাকি অত্যন্ত মোলায়েম।

জোছনা ও জননীর গল্পে যুদ্ধের দিনগুলোতে বিয়ে আর এরপর খুব একচোট প্রেম করেছিল নাইমুল আর মরিয়ম। নাইমুলের পছন্দ একদম চিকন করে কাটা আলু ভাজি। সাথে কাঁচা টমেটো পুড়িয়ে ভর্তা। এখানেই শেষ নয়। মরিয়ম নিজে রান্না করেছে নতুন আলু দিয়ে মুরগীর মাংসের ঝোল।  

কালোজিরা চাল কী? এই প্রশ্ন করলে অনেকেই ফার্মগেট বা সদরঘাটে বিক্রি করা কালিজিরার তেল (যা জীবন ও যৌবন দুইটাই কানায় কানায় পূর্ণ করে) ভাবতে পারেন। ব্যাপারটা এমন ভুল ভাববেন না যাদের মনে আছে 'মাতাল হাওয়া'র কথা। মন উতলা করা বর্ণনা আছে সেই বইয়ে কালিজিরার চালের ভাতের সাথে মুরগীর মাংসের। আর ‘মধ্যাহ্ন ২’তে আছে কালিজিরার চালের ভাতের সাথে খাসির মাংস, পেঁয়াজ। তবে তখনও পেঁয়াজের কেজি একশো ত্রিশ টাকা ছিল কিনা তা তিনি লিখে দিয়ে যাননি! 

এদিকে ‘মধ্যাহ্ন ২’ উপন্যাসে তিনি দিয়েছেন আরও কিছু অপূর্ব কিছু খাবারের বর্ণনা, ‘শরিফা অতি দ্রুত খাওয়ার ব্যবস্থা করল। গরম ভাত। খলিসা মাছের ঝোল, পাট শাক, ডাল।’ ‘মাওলানা খেতে বসেছেন। শরিফা সামনে বসে গরম ভাতে পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। আজকের আয়োজন ভালো। করিমের পছন্দের পাবদা মাছ। হাওরের লাল মুখো বড় পাবদা। ঝোল ঝোল করে রান্না। শরিফা পাতের কোণায় আদা সরিষা বাটা দিয়ে রেখেছে। তরকারির সাথে এই জিনিস মিশিয়ে খেতে খুবই ভালো লাগছে।’ 

‘পিতা ও কন্যা দুজনকেই খাবার দেয়া হয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ভর্তি ভাত। ভাতের উপর গাওয়া ঘি। একপাশে ডিমের সালুন। আলাদা বাটিতে ডাল। ঘিয়ের গন্ধে জায়গাটা ম ম করছে।’ 

‘সবুজ কলাপাতায় ধবধবে সাদা ধোঁয়া উঠা গরম ভাত। ঝিঙ্গা দিয়ে রাঁধা লাবড়া, সঙ্গে মাছের ঝোল। খেতে খেতে লাবুসের মনে হলো, জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ ভরপেট খাওয়ায়। এইজন্যেই হয়তো বেহেশতে খাওয়া-খাদ্যের বর্ণনায় এতো জোর দেয়া হয়েছে।’ 

এই শীতে আপনার জিভের দৈর্ঘ্য এক হাত লম্বা এবং মুখের লালায় সাগর সমান হয়ে উঠবে এই লাইনেই, ‘হেমন্তে নতুন ধান খেয়ে হাঁসের গায়ে চর্বি হয়, সেই হাঁস নতুন আলু দিয়ে ভুনা করে শীতের সকালে চালের রুটি দিয়ে খাওয়ায় যে কী স্বাদ।’ আহা, একজন আদর্শ খাদ্যপ্রেমিকের কাছে ‘এবং হিমু’ পড়াটা সার্থক হয় তো সেখানেই!  

'সে আসে ধীরে' বইতে কাঁচামরিচ, সরিষার তেল, পিয়াজ দিয়ে মাখানো চালভাজাকে বেহেশতি কোন খানা হিসেবে বর্ণনা করার পর 'নিষাদ'-এ আমরা পাই 'মিসির মিকচার' নামে জিভে জল আনা এক রেসিপি--’নতুন ধরনের রান্না। আমিই তার আবিষ্কারক। নাম হচ্ছে মিসির মিকচার। চাল, ডাল এবং আলু একসঙ্গে মিশিয়ে দু চামচ ভিনিগার, এক চামচ সয়া সস, একটুখানি লবণ, দুটো কাঁচা লঙ্কা এবং আধা চামচ সরিষা বাটা দিয়ে সেদ্ধ করতে হয়। সেদ্ধ হয়ে যাবার পর এক চামচ বাটারওয়েল দিয়ে দমে দিতে হয়-অপূর্ব একটা জিনিস নামে। খেয়ে দেখ।’ 

'মিসির আলীর চশমা' চোখে দিয়ে তিনি রেসিপি দিয়েছেন এক অদ্ভুত ইলিশ মাছ রান্নার--’ইস্ত্রি ইলিশ: ইলিশ মাছ সর্ষে বাটা, কাঁচামরিচ এবং লবণ দেয়ার পর লাউপাতা দিয়ে মুড়তে হবে। তারপর গরম ইস্ত্রির নিচে বসিয়ে দিতে হবে। কিছুক্ষণ পর মাছ উল্টে আবার ইস্ত্রি চাপা দেয়া।’ এই রেসিপি কেউ ট্রাই করেছে কিনা এখনো পর্যন্ত না জানা গেলেও 'মিসির আলী! আপনি কোথায়?' বইয়ে জানা গেলো কৈ মাছেরও নাকি ভর্তা হয়। তাও আবার যেই সেই ভর্তা না, কৈ মাছের ভর্তার পাশে নাকি অন্য ভর্তা দাঁড়াতেই পারবে না। 

'পুফি' পড়তে গিয়ে আমরা পাই টোস্ট বিস্কিটের সাথে পনির খাওয়ার এক নতুন উপায়--’পনিরের ওপর এক ফোঁটা রসুনের রস। গার্লিক টোস্ট উইথ চিজ।’ আহা খেয়ে দেখতে হবে একদিন। এদিকে 'মিসির আলী UNSOLVED'-এ আমরা পাই আরেক গল্প, ‘আজ সে রাঁধবে কলার মোচা এবং চিংড়ি দিয়ে এক ধরনের ভাজি। কাঁচামরিচ এবং পেঁয়াজের রস দিয়ে মুরগী।’ তবে 'এবং হিমু' উপন্যাসে যে বর্ণনা পাই আলু ভাজার সেটার তুলনা নাই--’চাক চাক করে কাটা আলু ঘিয়ে ভেজে তার সাথে ভাজা শুকনা মরিচ মাখিয়ে ভাতের সাথে খাওয়া।’ খেতে যে স্বর্গীয় স্বাদ হবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই।  

আচ্ছা, এবার বলুন তো ভেড়ার মাংসকে সজারুর কাঁটা দিয়ে কেঁচার কথা কোন উপন্যাসে লেখা আছে? বা ‘শিং মাছের ডিমের সঙ্গে সামান্য মশলা দেবেন। কাঁচামরিচ লাগবে। পিঁয়াজ দেবেন না। কলাপাতা দিয়ে ডিম মুড়িয়ে ভাতের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে। মনে থাকবে তো?’ রেসিপিটি কোন উপন্যাসের? অথবা ‘আস্ত ময়ূর পশম/পেখম না ফেলেই রান্না করে টেবিলে এমন ভাবে সাজাতে হবে যেন মনে হয় ময়ূরটি এখনো জীবিত। তারপর ছুড়ি দিয়ে কেটে কেটে খেতে হবে।’ এটি কোন উপন্যাসের? 

বলতে পারলে তো পারলেনই। আর না পারলে এই যে এটা খোঁজার জন্যই যে আপনাকে আবার তার বইগুলো ঘাটতে হবে, ঘাটতে গিয়ে আবার কোনো এক নিলু-বিলু-আনিস-বাদলের গল্পে তন্ময় হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারবেন, এই আনন্দ আপনি আর কোথায় পাবেন বলুন?

৪২৪৬ পঠিত ... ২২:১২, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

Top