বাংলা সাহিত্যে ‘ননসেন্স রাইম’-এর প্রবর্তক সুকুমার রায়। ইউরোপীয় সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হলেও তিনি বাংলা ভাষায় এটিকে সম্পূর্ণ নিজস্ব রূপ, ছন্দ ও লোকজ মেজাজে রূপান্তর করেন।
তার হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে ‘হাঁসজারু’ বা ‘বকচ্ছপ’-এর মতো অদ্ভুতুড়ে সব কাল্পনিক প্রাণী। এসেছে ‘হুঁকোমুখো হ্যাংলা’র মতো অমর চরিত্র। সাধারণ ছড়ার আড়ালে ভাষার অভাবনীয় প্রয়োগে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নিখাদ আনন্দ।
তবে এই ননসেন্স কেবল আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আবোল তাবোল বা একুশে আইন-এর মতো সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সমাজ, অন্ধবিশ্বাস ও নানা সামাজিক অসংগতির ওপর এক সূক্ষ্ম অথচ তীব্র ব্যঙ্গ ফুটিয়ে তুলেছেন, যা বাংলা শিশুসাহিত্যকে দিয়েছিল এক কালজয়ী ও অনন্য রূপ।
আজ থাকল তার কিছু বিখ্যাত ননসেন্স রাইম, যেগুলো আমাদের বাবা-মায়েদের আনন্দ দিয়েছে, আমাদের দিচ্ছে আর আমাদের পরবর্তী সব জেনারেশনকেও দেবে!
খিচুড়ি
হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না)
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে—“বাহবা কী ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কী গো খাবে কাঁচা লঙ্কা?
ছাগলের পেটে ছিল না জানি কী ফন্দি,
চাপিল বিছার ঘাড়ে, ধড়ে মুড়ো সন্ধি!
জিরাফের সাধ নাই মাঠে ঘাটে ঘুরিতে,
ফড়িঙের ঢং ধরি’ সেও চায় উড়িতে।
গরু বলে, “আমারেও ধরিল কি ও রোগে?
মোর পিছে লাগে কেন হতভাগা মোরগে?”
হাতিমির দশা দেখ—তিমি ভাবে জলে যাই,
হাতি বলে, “এই বেলা জঙ্গলে চল ভাই।”
সিংহের শিং নেই, এই তার কষ্ট—
হরিণের সাথে মিলে শিং হল পষ্ট।
মাসী গো মাসি
মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্—
হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা
কাগের বাসায় বগের ডিম্।।
আবোল তাবোল
এক যে ছিল রাজা—(থুড়ি,
রাজা নয় সে ডাইনি বুড়ি)!
তার যে ছিল ময়ূর—(না না,
ময়ূর কিসের? ছাগল ছানা)।
উঠানে তার থাকত পোঁতা—
(বাড়িই নেই, তার উঠান কোথা)?
শুনেছি তার পিশতুতো ভাই—
(ভাই নয়তো, মামা-গোঁসাই)।
বল্ত সে তার শিষ্যটিরে—
(জন্ম-বোবা, বল্বে কিরে)!
যা হোক, তারা তিনটি প্রাণী—
(পাঁচটি তারা, সবাই জানি)!
থও না বাপু খ্যাঁচাখেঁচি
(আচ্ছা বল, চুপ করেছি)।
তারপরে যেই সন্ধ্যাবেলা,
যেম্নি না তার ওষুধ গেলা,
অম্নি তেড়ে জঁটায় ধরা—
(কোথায় জঁটা? টাক যে ভরা)!
হোক না টেকো, তোর তাতে কী?
গোম্ড়ামুখো মুখ্য ঢেঁকি!
ধরব ঠেসে টুটির পরে
পিট্ব তোমার মুণ্ডু ধরে।
এখন বাছা পালাও কোথা?
গল্প বলা সহজ কথা?
অবাক কাণ্ড
শুন্ছ দাদা! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে,
সে নাকি রোজ খাবার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে?
শুন্ছি নাকি খিদেও পায় সারাদিন না খেলে?
চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে?
চল্তে গেলে ঠ্যাং নাকি তার ভূয়েঁর পরে ঠেকে?
কান দিয়ে সব শোনে নাকি? চোখ দিয়ে সব দেখে?
শোয় নাকি সে মুণ্ডটাকে শিয়র পানে দিয়ে?
হয় না কি হয় সত্যি মিথ্যা চল্ না দেখি গিয়ে!
কুম্ড়ো পটাশ
(যদি) কুম্ড়ো পটাশ নাচে—
খবরদার, এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে, চাইবে নাকো পাছে;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমূলার গাছে।
(যদি) কুম্ড়ো পটাশ কাঁদে—
খবরদার! খবরদার! বসবে না কেউ ছাদে।
উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে:
বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে’।
(যদি) কুম্ড়ো পটাশ হাসে—
থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে;
ঝাপসা গলায় ফার্সি ক’বে নিশ্বাসে ফিস্ফাসে;
তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে!
(যদি) কুম্ড়ো পটাশ ছোটে—
সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানলা বেয়ে ওঠে;
হুঁকোর জলে আলতা গুলে লাগায় গালে ঠোঁটে;
ভুলেও যেন আকাশ পানে তাকায় না কেউ মোটে!
(যদি) কুম্ড়ো পটাশ ডাকে—
সবাই যেন শাম্লা এঁটে গামলা চড়ে থাকে;
ছেঁচকি শাকের ঘন্ট বেটে মাথায় মলম মাখে;
শক্ত ইঁটের তপ্ত ঝামা ঘষতে থাকে নাকে!
তুচ্ছ ভেবে এ-সব কথা করছে যারা হেলা,
কুম্ড়ো পটাশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা।
দেখবে তখন কোন্ কথাটি কেমন করে ফেলে,
আমায় তখন দোষ দিও না, আগেই রাখি বলে।
বোম্বাগড়ের রাজা
কেউ কি জান সদাই কেন বোম্বাগড়ের রাজা—
ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে আমসত্ত্ব ভাজা?
রানীর মাথায় অষ্টপ্রহর কেন বালিশ বাঁধা?
পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকে কেন রানীর দাদা?
কেন সেথায় সর্দি হলে ডিগবাজি খায় লোকে?
জোছনা রাতে সবাই কেন আলতা মাথায় চোখে?
ওস্তাদেরা লেপ মুড়ি দেয় কেন মাথায় ঘাড়ে?
টাকের পরে পণ্ডিতেরা ডাকের টিকিট মারে।
রাত্রে কেন ট্যাঁক্ঘড়িটা ডুবিয়ে রাখে ঘিয়ে?
কেন রাজার বিছানা পাতে শিরীষ কাগজ দিয়ে?
সভায় কেন চেঁচায় রাজা “হুক্কা হুয়া” বলে?
মন্ত্রী কেন কলসী বাজায় বসে রাজার কোলে?
সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি?
কুমড়ো নিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসী?
রাজার খুড়ো নাচেন কেন হুঁকোর মালা পরে?
এমন কেন ঘটছে তা কেউ বলতে পার মোরে?
প্যাঁচা আর প্যাঁচানি
প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি,
খাসা তোর চ্যাঁচানি!
শুনে শুনে আনমন
নাচে মোর প্রাণমন!
মাজা-গলা চাঁচা সুর
আহাদে ভরপুর!
গলা-চেরা গমকে
গাছপালা চমকে,
সুরে সুরে কত প্যাঁচ
গিট্কিরি ক্যাঁচ্ ক্যাঁচ্!
যত ভয় যত দুখ
দুরু দুরু ধুক্ ধুক্,
তোর গানে পেঁচি রে
সব ভুলে গেছি রে—
চাঁদ মুখে মিঠে গান
শুনে ঝরে দু’নয়ান।
ভয় পেয়ো না
ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না—
সত্যি বলছি কুস্তি ক’রে তোমার সঙ্গে পারব না।
মনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই,
তোমায় আমি চিবিয়ে খাব এমন আমার সাধ্যি নেই!
মাথায় আমার শিং দেখে ভাই ভয় পেয়েছ কতই না—
জানো না মোর মাথার ব্যারাম, কাউকে আমি গুঁতোই না?
এস এস গর্তে এস, বাস ক’রে যাও চারটি দিন,
আদর ক’রে শিকেয় তুলে রাখব তোমায় রাত্রিদিন।
হাতে আমার মুগুর আছে তাই কি হেথায় থাকবে না?
মুগুর আমার হাল্কা, এমন মারলে তোমায় লাগবে না।
অভয় দিচ্ছি, শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?
বসলে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা!
আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে—
সবাই মিলে কামড়ে দেব, মিথ্যে অমন ভয় পেলে।
বাবুরাম সাপুড়ে
বাবুরাম সাপুড়ে,
কোথা যাস্ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা,
দুটো সাপ রেখে যা!
যে সাপের চোখ্ নেই,
শিং নেই, নোখ্ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস্ ফোঁস্,
মারে নাকো ঢুঁশ ঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত,
খায় শুধু দুধ ভাত—
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আনত?
তেড়ে মেরে ডান্ডা
করে দিই ঠান্ডা।
দাঁড়ের কবিতা
চুপ কর, শোন্ শোন্, বেয়াকুল হোস্নে—
ঠেকে গেছি বাপ্রে কী ভয়ানক প্রশ্নে!
ভেবে ভেবে লিখে লিখে বসে বসে দাঁড়েতে
ঝিম্ঝিম্ টন্টন্ ব্যথা করে হাড়েতে।
এক ছিল দাঁড়িমাঝি—দাড়ি তার মস্ত,
দাড়ি দিয়ে দাঁড়ি তার দাঁড়ে খালি ঘষ্ত।
সেই দাঁড়ে একদিন দাঁড়কাক দাঁড়াল,
কাঁকড়ার দাঁড়া দিয়ে দাড়ি তারে তাড়াল।
কাক বলে রেগেমেগে, “বাড়াবাড়ি ঐ তো!
না দাঁড়াই দাঁড়ে তবু দাঁড়কাক হই তো?
ভারি তোর দাঁড়িগিরি, শোন্ বলি তবে রে—
দাঁড় বিনা তুই ব্যাটা দাঁড়ি হোস্ কবে রে?
পাখা হলে পাখি হয় ব্যাকরণ বিশেষে—
কাঁকড়ার ‘দাঁড়া’ আছে, দাঁড়ি নয় কিসে সে?
দূর দূর! ছাই দাঁড়ি! দাড়ি নিয়ে পাড়ি দে!”
দাঁড়ি বলে, “ব্যাস্ ব্যাস্! ঐখেনে দাঁড়ি দে।”
বোনাস
হনহন পনপন
চলে হন্ হন্ ছোটে পন্ পন্
ঘোরে বন্ বন্ কাজে ঠন্ ঠন্
বায়ু শন্ শন্ শীতে কন্ কন্
কাশি খন্ খন্ ফোঁড়া টন্ টন্
মাছি ভন্ ভন্ থালা ঝন্ ঝন্







পাঠকের মন্তব্য