দেশের মহাসড়কগুলোতে এবারের ঈদযাত্রা কেবল আনন্দযাত্রা নয়, বরং এক অনন্য পারস্পরিক সমঝোতার মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি নিয়ে যখন চারদিকে শোকের মাতম, তখন সংশ্লিষ্ট মহলের ব্যাখ্যা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে—জীবন আসলে কী? জীবন কি স্রেফ স্পন্দন, নাকি শুধুই কিছু কোল্যাটারাল ড্যামেজ?
ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলনের রেশ কাটতে না কাটতেই যেন তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল এবারের ঈদে। সেই যে বলা হয়েছিল, মালিক-শ্রমিক মিলে সমঝোতা করে টাকা নিলে সেটা চাঁদাবাজি নয়—সেই সূত্র ধরেই সম্ভবত এবারের দুর্ঘটনাগুলোকেও দুর্ঘটনা বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যখন বাস আর ট্রাকের মধ্যে একটা মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা সমঝোতা হয় যে কেউ কাউকে জায়গা ছাড়বে না, ঠিক তখনই সেখানে একটি সুন্দর মিলনমেলা (যাকে সাধারণ মানুষ সংঘর্ষ বলে ভুল করে) ঘটে যায়।
একজন পরিবহন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভাই, রাস্তায় চাঁদাবাজি নাই, সব সমঝোতা। এখন অ্যাক্সিডেন্টগুলাও তো সমঝোতার অংশ। ব্রেক ফেল করা বাস আর গর্তে ভরা রাস্তা যখন একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়, তখন সেখানে কিছু কোল্যাটারাল ড্যামেজ তো হবেই। এটা নিয়ে চিল্লাইয়া কী লাভ?
মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মহলের নীতি এখন আরও স্পষ্ট। পরিসংখ্যান বলছে, ১০ দিনে ২৭৪ জন নিহত হওয়া কোনো সংখ্যা নয়, বরং এটি উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার পথে সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এই মৃত্যুগুলোকে কোল্যাটারাল ড্যামেজ হিসেবে দেখলে মনের কষ্ট অনেকটা কমে যায়।
সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাল্পনিক ভাষ্য মতে,দেখুন, আমরা তো সবাইকে ঘরে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। এখন পথে কেউ যদি পরপারে পৌঁছে যায়, সেটা তো আর আমাদের হাতে নেই। এটা একটা সিস্টেম লস। আপনি যখন ডিম ভাজবেন, দুই-একটা খোসা তো ভাঙবেই। তেমনি দেশ যখন সিঙ্গাপুর হচ্ছে, তখন দুই-চারশ মানুষ একটু আধটু কোল্যাটারাল ড্যামেজ হবে—এটাই স্বাভাবিক।
বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে ২৭৪, আর সরকারি খাতা বলছে ১০০-এর নিচে। এই যে গাণিতিক সমঝোতা, এটাও কি এক প্রকারের শিল্প নয়? মন্ত্রীর সেই কালজয়ী সমঝোতা' তত্ত্ব এখানেও দারুণ কার্যকর। সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের মধ্যে যে একটা সমঝোতা নেই, সেটাই বরং দুঃখজনক। তবে আগামী ২৯ মার্চের সভায় হয়তো সিদ্ধান্ত হবে যে, মৃত্যুর সংখ্যাও যেন সবাই মিলে সমঝোতার ভিত্তিতে'একটি সম্মানজনক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়।
ঈদের ছুটিতে রাস্তাঘাটে এই যে বিশৃঙ্খলা, বেপরোয়া গতি আর ফিটনেসবিহীন গাড়ির দাপট—এগুলো আসলে আমাদের সহনশীলতার পরীক্ষা। ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো আসলে অ্যান্টিক পিস, যা আমাদের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা? ওটা তো তারুণ্যের জয়গান, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝে কোনো দেয়াল নেই, আছে শুধু সমঝোতা।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে—রাস্তায় যখন বের হবেন, তখন স্টিয়ারিং হুইলের চেয়ে সমঝোতা বেশি জরুরি। কারণ, সমঝোতা থাকলে চাঁদাবাজি থাকে না, আর কোল্যাটারাল ড্যামেজ হিসেবে গণ্য হলে মৃত্যুও আর গুরত্বপূর্ণ থাকে না।
নিরাপদ হোক আপনার পরবর্তী সমঝোতা যাত্রা!


