খাদ্যরসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাঁড়ির খবর

৭০৪ পঠিত ... ১০:৫০, মে ০৭, ২০২০

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন খাদ্যরসিক ছিলেন? তাঁর বাবা, অর্থাৎ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের খাবার ধরন থেকেই কিছুটা ধারণা নেয়া যাক। যৌবনে তিনি গিয়েছিলেন দুর্ভেদ্য মরী পর্বতে। সেসময় তাঁর খাদ্য তালিকায় অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে ছিলো প্রতিদিন বারো সের গরুর দুধ!

সম্ভবত এই বর্ণনা থেকে খাদ্যরসিকের প্রমাণ পাওয়া যায় না। খাদ্যবীর বলা যেতে পারে তাঁকে। খাদ্য রসিক বরং বলা যেতে পারে দেবেন্দ্রনাথের বড় ছেলে, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। পাঁঠার হাড়ের অম্বলের নাম শুনেছেন? এ জিনিসই ছিলো তাঁর প্রিয় খাদ্য! তাঁর ‘গুম্ফ আক্রমণ’ কাব্যে উল্লেখ আছে-

বৃহৎ রূপার থালে পাচক ব্রাহ্মণ ঢালে
মাংস পোলাও গাদা গাদা
কি গুণ পাঁঠার হাড়ে অম্বলের তার বাড়ে
কে বুঝিবে ইহার মর্যাদা। 

এই পরিবারের সন্তান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে খাদ্যরসিক হবেন, এ আর আশ্চর্য কী? কবি ছোটবেলাতেই প্রাতরাশ নিয়ে এক কবিতা লেখে মাত করে দিয়েছিলেন-

আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতেই কদলী দলি।

সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতেই হাপুস-হুপুস শব্দ।

চারিদিক নিঃশব্দ। পিঁপড়ে কান্দিয়া যায় পাতে।

 রবীন্দ্রনাথের আহারে কিছু পরিবর্তন এল ‘নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী ঠাকুর-পরিবারে বধূ হয়ে আসার পর। রবী ঠাকুরের উদ্ধৃতিই তুলে ধরা যাক– ‘বউঠাকুরণের জায়গা হল বাড়ির ভিতরের ছাদের লাগোয়া ঘরে। সেই ছাদে তাঁরই হল পুরো দখল। পুতুলের বিয়েতে ভোজের পাত পড়ত সেইখানে। নেমন্তন্নের দিনে প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠত এই ছেলেমানুষ। বউঠাকুরণ রাঁধতে পারতেন ভালো। খাওয়াতে ভালোবাসতেন, এই খাওয়াবার শখ মেটাতে আমাকে হাজির পেতেন। ইস্কুল থেকে ফিরে এলেই তৈরি থাকত তাঁর আপন হাতের প্রসাদ। চিংড়িমাছের চচ্চড়ির সঙ্গে পান্তাভাত যেদিন মেখে দিতেন অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে, সেদিন আর কথা ছিল না।‘

 পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ সারাদিনে বেশ কয়েকবার খেতেন। তিনি ভোরবেলায় খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়তেন। দিনের শুরুটা হতো এক কাপ চা অথবা কফি খেয়ে। একটু বেলা হয়ে প্রাতরাশে ভেজা বাদাম, মধু সহযোগে টোস্ট এবং এক কাপ দুধ। আবার মাঝে মাঝে তার ছোটবেলার প্রিয় খাবার সন্দেশ আর কলা দুধে মেখে খেতেন। এর  পর সকাল দশটা নাগাদ তিনি লেবুর রস খেতেন। মধ্যাহ্ন ভোজনে রবীন্দ্রনাথ ভাত খেতেন, তবে তিনি ভাত খুব অল্প পরিমাণে খেতেন। বিকেলে কবির জন্য বরাদ্দ ছিল মুড়ি ও চা। কবির রাতের খাবারে থাকত সব্জির স্যুপ কয়েকটি লুচি ও তরকারী। রবীন্দ্রনাথ দুপুরের খাবার পরিবারের সবাই মিলে ঘরের মেঝেতে বসে খেতেন। কিন্তু রাতের বেলায় তিনি খেতেন ডায়নিং টেবিলে বসে।

আমিষ ও নিরামিষ সব ধরনের খাবারই রবীন্দ্রনাথের পছন্দের তালিকায় ছিল। দেশী বিদেশী কোন খাবারেই তার অরুচি ছিল না। তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল ব্রিটিশ পদ, আপেল দিয়ে রান্না খাসীর মাংস, তুর্কী কাবাব।

বিদেশে গিয়ে যে সব খাবার খেতেন সেগুলির রান্না পদ্ধতি জেনে ঠাকুর বাড়ির রান্নাঘরে সেগুলি করার অনুরোধ করতেন। ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা রান্না নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালাতেন, নিত্য নতুন খাবারের পদ তৈরিতে তারা সব সময় ব্যস্ত থাকতেন। তারা অতি সাধারণ উপাদান যেমন পটল ও আলুর খোসা দিয়েও সুস্বাদু পদ তৈরি করতেন। রবীন্দ্রনাথের একটি স্বভাব ছিল তিনি দেশে বিদেশে যেখানেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতেন সেখানকার মেনুকার্ড তিনি সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলি তিনি সংরক্ষণ করে রাখতেন এই ঘটনা থেকেই রবীন্দ্রনাথের ভোজন রসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

দেশীয় খাবারের মধ্যে, কৈ মাছের তরকারী, চিতল মাছের পেটি ভাজা, এছাড়া ভাপা ইলিশ, ফুলকপি দিয়ে তৈরি নানান পদ ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয়। এছাড়া মিষ্টি খাবারের মধ্যে পায়েস, চন্দ্রপুলি, ক্ষীর, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি, দই এর মালপোয়া, চিঁড়ের পুলি,মানকচুর জিলিপি, আমসত্ত্ব এগুলি খেতে খুব ভালবাসতেন তিনি। তবে পায়েস ও পিঠে পুলির প্রতি কবির টান ছিল বেশি।

রবীন্দ্রনাথের ফলের প্রতিও একটা আকর্ষণ ছিল। তিনি দুপুরের খাওয়ার আগে ফল খেতেন। যেমন পাকা পেঁপে, কলা, বাতাবি লেবু আমের সময় আম। তবে আম ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় ফল। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ  মাস এলে রবীন্দ্রনাথের ভীষণ খুশী হতেন। কবি আম কেটে খেতে পছন্দ করতেন না। আম চুষে খেতেন। টমি ওয়াডা নামে রবীন্দ্র অনুরাগী এক জাপানী ভদ্র মহিলার আমন্ত্রণে দ্বিতীয়বার কবি জাপানে যাওয়ার কথা ভাবতে থাকেন, কিন্তু সেটি ছিলো আমের সময়! রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমের ভক্ত। ফলে পাকা আমের লোভ তার জাপান যাওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। অবশেষে ঠিক হয় বড় বড় বরফ বক্সে করে আমও কবির সাথে জাপান যাবে।     

১৯১৩ কবি নোবেল পুরস্কার পেলেন। এর আগের বছর ১৯১২ সালে লন্ডনে ‘গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ওই দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল ইন্ডিয়ান সোসাইটি, লন্ডন। সেদিনের খাদ্য তালিকা হয়েছিল কবির পছন্দে।

এই খাবারের তালিকায় ছিলো: গ্রিন ভেজিটেবল স্যুপ, ক্রিম অব টমেটো স্যুপ, স্যামন ইন হল্যান্ডেন সস  অ্যান্ড কিউকামবার, প্রি সলটেড ল্যাম্ব উইথ গ্রিন ভেজিটেবল, রোস্ট চিকেন, ফেঞ্চ ফ্রাই, গ্রিন স্যালাড ও আইসক্রিম।  

বাইরে এই ধরনের খাবার খেলেও বাড়িতে তিনি কম তেল-মশলাযুক্ত খাবার খেতেন। ঠাকুরবাড়ির রান্নায় বেশি করে মিষ্টি দেওয়ার প্রচলন ছিল। গরম মশলা, লবঙ্গ, দারুচিনি বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত হতো। রান্নার তালিকায় প্রতিদিনই দীর্ঘ পদ থাকত। আর তাতে নিয়মিত অবশ্যই থাকত সুক্তো আর দইমাছ।

রবীন্দ্রনাথের আহার সম্পর্কে একটু বনফুল থেকে শোনা যাক-

‘ভৃত্য নীলমণি বেশ বড়ো একটা কাঁসার থালা এনে রবীন্দ্রনাথের সামনে রাখল। থালার ঠিক মাঝখানে একটা রুপোর বাটি উপুড় করা। আর তার চার পাশে নানা রকমের কাটা ফল গোল করে সাজানো। কাটা ফলের ফাঁকে ফাঁকে গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব ছড়ানো। প্রাতরাশের এই অদ্ভুত সজ্জা দেখে আমি তো অবাক। বিস্ময়ের মাত্রা আরও বেড়ে গেল যখন রবীন্দ্রনাথ আস্তে করে রুপোর বাটিটা তুলে ফেললেন আর তার ভেতর থেকে ওই বাটির মাপের সাদা জমানো একটা জিনিস বেরিয়ে পড়ল। জিনিসটা কী জানতে চাইতেই রবীন্দ্রনাথ বললেন, ক্রিম। আর এগুলো নানা রকমের ফল, বাদাম, ডাল ভেজানো, খাবে তুমি? আমি খাইনি। তবে লক্ষ করেছিলাম তাঁর দীর্ঘ প্রাতরাশ।‘ 

কবির বৈকালিক আহার কেমন ছিল? তারও একটা নমুনা মেলে প্রমথনাথ বিশীর স্মৃতিকথায়-

‘তখন তিনি বৈকালিক জলযোগে বসিয়াছেন - সময় নির্বাচনটা হয়তো একেবারে আকস্মিক ছিল না।  কবিতাটি লইয়া গিয়া তাঁহার হাতে দিলাম। তিনি এক পলকে পড়িয়া লইয়া হাসিলেন। তারপর এক প্লেট 'পুডিং' আমার হাতে তুলিয়া দিলেন। 'পুডিং' অতি উপাদেয় খাদ্য সন্দেহ নাই; কিন্তু হায়, আমি কি ইহার জন্য আসিয়াছি? আমি কি ইহার জন্যই সর্পসংকুল বল্মীকস্তূপের পাশে বসিয়া দুপুর রোদে ঘামিতে ঘামিতে কবিতা লিখিয়াছি। পুডিং শেষ করিলাম। কিন্তু কই, প্রশংসা তো করিলেন না। আমি উসখুস করিতেছি দেখিয়া আরো রসপিপাসু মনে করিয়া এক প্লেট আনারস দিলেন।‘  

সত্তর বছর বয়সে পারস্য ভ্রমণে বেরিয়ে একজন বেদুইন দলপতির তাঁবুতে কবির নিমন্ত্রণ ছিল। প্রথমে ভেবেছিলেন, ‘শরীরের প্রতি করুণা করে না যাওয়াই ভালো।‘ পরে ভাবলেন, তিরিশ বছর বয়সে আস্ফালন করে লিখেছিলেন, ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন। কবিতাটিকে কিছু পরিমাণে পরখ না করলে পরিতাপ থাকবে।‘ গাড়ি চলল মরুভুমির উপর দিয়ে, তবে বালুময় নয়, শক্ত মাটি। অনেক দূর পেরিয়ে  এদের ক্যাম্পে পৌঁছোলেন। মস্ত মাটির ঘরে বসার ব্যবস্থা। বেশ ঠাণ্ডা। মেঝেতে কার্পেট, এক প্রান্তে তক্তপোশের উপর গদি পাতা। শুরু হল আপ্যায়ন– ‘ছোটো আয়তনের পেয়ালা আমাদের হাতে দিয়ে অল্প একটু করে কফি ঢাললে, ঘন কফি, কালো তেতো। দলপতি জিজ্ঞাসা করলেন, আহার ইচ্ছা করি কি না। ‘না’ বললে আনবার রীতি নয়। ইচ্ছে করলেম, অন্তরে তাগিদও ছিল।… অবশেষে চিলিম্‌চি ও জলপাত্র এল। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে প্রস্তুত হয়ে বসলুম। মেঝের উপর জাজিম পেতে দিল। পূর্ণচন্দ্রের ডবল আকারের মোটা মোটা রুটি, হাতওয়ালা অতি প্রচণ্ড পিতলের থালায় ভাতের পর্বত আর তার উপর মস্ত ও আস্ত একটা সিদ্ধ ভেড়া।… আহারার্থীরা সব বসল থালা ঘিরে। সেই এক থালা থেকে হাতে করে মুঠো মুঠো ভাত প্লেটে তুলে নিয়ে আর মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল। ঘোল দিয়ে গেল পানীয় রূপে।‘  

আসলে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের কথামতো ভোজনবিলাসী, ভোজনরসিক। নানা রকমের খাবার খেতে, খাবার খাওয়াতে এবং খাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন। নানা জনের স্মৃতিকথা থেকে এ সংক্রান্ত নানা তথ্য পাওয়া যায়। পরীক্ষানিরীক্ষার একটি নজির দিয়েই আজকের দীর্ঘ আলোচনা শেষ করা যাক – মার্মালেড দিয়ে ছাতু। মার্মালেড, গোল্ডেন সিরাপ, আদার রস, দুধ, কলা, মাখন ইত্যাদি দিয়ে আধ ঘণ্টা ধরে ছাতু মাখতেন, নিজে খেতেন, অন্যকে খাওয়াতেন। বেশ গর্ব করেই মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ‘এক সময় ভালো ছাতুমাখিয়ে বলে আমার নাম ছিল। মেজদার টেবিলে ছাতু মাখতুম মার্মালেড দিয়ে।‘

প্রিয় কবি বেঁচে থাকুক তাঁর অমর কর্মে। তাঁর রসনা বেঁচে থাকুক খাদ্যরসিক বাঙালীর পাতে পাতে। 

৭০৪ পঠিত ... ১০:৫০, মে ০৭, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top