যুগে যুগে বাঙালির 'ঘুরতে যাওয়া'র বিবর্তন : ফ্রম কক্সবাজার টু বিসিএস ট্রাভেলিং

৬৬৫ পঠিত ... ২০:৩৮, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

আমাদের ছোটবেলায় 'ঘুরতে যাওয়া' মানে ছিলো কক্সবাজার।

বউয়ের কান্ধে হাত দিয়া, সমুদ্রে পা ডুবানো সানগ্লাস পরা স্বামীরা একটি যুগল ছবি তুইলা ড্রয়িংরুমে বাঁধাই কইরা রাখতেন। জাফলং নামটা শোনা যাইতো কালেভদ্রে, তবে কক্সবাজার ছিলো আরিফ আর হোসেন আর জাফলং ছিলো আরিফ জেবতিক।

এরপর আইলো ইন্ডিয়া ঘোরা। ইন্ডিয়া মানে ওই কলকাতা-দার্জিলিং, এর বাইরে না। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে আইসা কলকাতা শেষ হইয়া গেলো, মান্না দে কফি হাউজ থেইকা বাইর হইতে পারলেন না।

আমাদের ছোটবেলার টেকা-পয়সাওয়ালারা ব্যাংকক, মালয়েশিয়া- এইসব কইরা বেড়াইতো। আমরা তাজ্জব হইয়া দেখতাম, ওগো কতো টেকা! বাবারে বাবা, ব্যাংকক যায়! থাইল্যান্ড আর ব্যাংকক- এই দুইটা আলাদা দেশের মধ্যে কোনটা কোথায়, এইটা জানার মতো গুগল ম্যাপ আমাদের ছিল না।

এরপর আবিষ্কৃত হইলো যে, দেশের মধ্যেই ম্যালা ঘোরার জায়গা আছে, সিলেট আর বান্দরবানের দিকে। শুরু হইলো থানচি আলীকদম কেওক্রাডং। চে গুয়েভারা গেঞ্জির লগে মাথায় গামছা বাইন্ধা বিপ্লব করতে করতে হাতে বাঁশ নিয়া ট্রেকার হইয়া গেলো সবাই।

আস্তে আস্তে রাতারগুল, বিছানাকান্দি, পাংথুমাই, নাফাখুম, অমিয়াখুম, অমুক ঝিরি, তমুক পাড়া, সাকা হাফং, হামহাম ঝর্ণা- এই চললো কয়দিন খুব। খুব চললো।

কম পয়সার ট্রাভেলিং সহ্য হইলো না সবার। ফ্যামিলি নিয়া বিরিয়ানি খাইতে তো আর হাতে বাঁশ নিয়া পাহাড় ট্রেকিং করা যায় না। অতএব, পাহাড়ের আদিবাসীদের খেদাইয়া প্যারালালি তৈরি হইলো নীলগিরি, নীলাচল, সাজেক।

সিলেট-বান্দরবান হইয়া উঠতে লাগলো রিসোর্টের নগরী। এককালে কক্সবাজারের হোটেল সি-গালের বান্ধা কাস্টমার লাটসাহেবের বেটা-বেটিরা গ্র‍্যান্ড সুলতানে যাওয়া শুরু করলো, মধ্যবিত্তের সামর্থ্য সাজেকে গিয়া আটকায়ে গেলো।

কেউ কেউ সাইকেলে কইরা চৌষট্টি জেলা, তথা বিশ্বভ্রমণে বাইর হইতো, এদের খবর পরে আর পাওয়া যাইতো না বিশেষ।
অমুক লোক খুব ঘোরাঘুরি করে, এইটা আমরা জানতাম। কেমনে করে, এইটা আমরা জানতাম না। টাকা পায় কই, চলে কেমনে, তার বাপে অঢেল সম্পত্তি রাইখা গেছে, এইসব জল্পনা-কল্পনা ইনবক্সে ইনবক্সে ঘুইরা বেড়াইছে।

আমরা বড়লোক হইয়া সারলাম না, তার আগেই বহু মানুষের বিদেশি ছবি চোখের সামনে চইলা আসা শুরু করলো। আগে বিদেশের ছবি মানে ছিলো বরফের মধ্যে কালো জ্যাকেট পরা ছবি, এখন হইছে মিউজিয়ামের সামনে হাফপ্যান্ট পরা সেলফি।

দুনিয়া আগায়া গেছেরে বন্ধু।

এর মইধ্যে আরেকদল শুটকি খাওয়া গরীব সিলেট দিয়া বর্ডার ক্রস কইরা মেঘালয় যাওয়া শুরু করলো। ট্রাভেলার্স কমিউনিটি হইয়া গেলো পয়সার হিসাব। এক দিনে পাঁচশো টাকায় অমুক ঘুরে আসুন, দুই দিনে তিনশো টাকায় গাজীপুর এইসব দেখা শুরু হইলো।

বাই দিস টাইম, সিকিম বর্ডার খুইলা গেলো। ইন্ডিয়ারে আর পায় কে? লাখে লাখে ট্রাভেলার কাতারে কাতার, শুমারি করিয়া দেখি সাড়ে তিন হাজার।

ট্রাভেলিং চলছে।

এই তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন হইলো, বিসিএস ট্রাভেলার। অমুক মন্ত্রণালয়ের তমুক সচিব, তমুক কর্মকর্তা, এডিশনাল জয়েন্ট সেক্রেটারি- একবার খাল খনন শিখতে আমেরিকা যায়, আরেকবার পরমাণু কেন্দ্র দেখতে রাশিয়া যায়। টেকা-টুকা, খাওয়া পড়া সব নাকি সরকারই দেয়।

আহারে, মায়ের কথাটা শুইনা আজকে বিসিএস দিলে ইতিহাসের পাতায় বাংলার ইবনে বতুতা হিসাবে আমার নামটাও থাকতো।

কেন যে বিসিএস দিলাম না!

লেখা: শুভজিৎ ভৌমিক

৬৬৫ পঠিত ... ২০:৩৮, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top