আল্লাহু আকবর

৪৮২ পঠিত ... ১০:৫৩, মে ০২, ২০২২

Allahu-akbar

মাগরিবের আজানটা দেয়ার সাথে সাথেই কারেন্ট চলে গেলো।

মাওলানা এরাজউদ্দীন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। মিম্বরের পাশে কাঠের বাকসে মোমবাতি আছে, উঠে গিয়ে ধরাতে ইচ্ছে করছে না। এমনিতেই লোকজন খুব একটা আসে না, আজকে বিকেল থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে। মানুষ আদৌ আর হবে কিনা কে জানে। নামাজ শুরু করে দেয়া উচিৎ, মাগরিবের ওয়াক্ত খুব বেশিক্ষণ থাকে না। আরেকটা মানুষ আসলে তবু আকামতটা দেয়া যায়, এরাজউদ্দীন তাই অপেক্ষা করছেন।

দূরের রাস্তায় একটা টর্চলাইটের আলো দেখা গেলো। তার মানে একাব্বর হাজী আসছে। উঠে গিয়ে মোমবাতিটা জ্বালালেন এরাজউদ্দীন। একাব্বর হাজীর হাঁপানীর ধাত আছে, আস্তে আস্তে টুকটুক করে হাঁটে। এইটুকুন আসতেই তার মিনিট পাঁচেক লাগবে। এরাজউদ্দীন মোমবাতিটা ক্যালেন্ডারের পাতার সামনে ধরলেন। এখন নভেম্বর মাস, কিন্তু ইচ্ছা করেই এপ্রিল মাসের পর আর পাতা উল্টাননি। ঐ পাতাটায় কাবা শরীফের ছবি আছে। একটু সময় পেলেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। চেয়ারম্যান সাহেব সামনের বছর হজ্জ্বে যাবেন। এই উপলক্ষে মাসে এক:দুইবার তার বাড়িতে জিকিরের আয়োজন করা হয়। মাওলানা এরাজউদ্দীনের দাওয়াত পড়ে। গত সপ্তাহে জিকিরের আগে আগে জলিল মিয়া ধরেছিলো নজরুলের সেই গজল, মনে বড় আশা ছিলো যাবো মদিনায়... সালাম আমি করবো গিয়ে, নবীজির রওজায়...

আহ, গানটা একেবারে কলিজার মধ্যে গেঁথে গেছে! এরাজউদ্দীন বিড়বিড় করলেন, ‘আমার আশা আছে সম্বলও নাই, করি কী উপায়...’

একাব্বর হাজীর ঠুকঠুকানী কাছে চলে এসেছে। এরাজউদ্দীন গজল বন্ধ করলেন। এইসব ভাবালুতা অন্যের সামনে দেখানো ঠিক না। দুইজনে মিলে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন।

একাব্বর হাজী নামাজী মানুষ। কাজেই লম্বা সূরাই ধরতে পারবেন ইরাজউদ্দীন। তার পছন্দের সূরা আল ক্কিয়ামাহ। এই সূরার শেষের দিক যখন আসলো, ‘অতঃপর সে ছিল রক্তপিণ্ড, অতঃপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল নর ও নারী। তবুও কি সেই আল্লাহ মৃতদেরকে জীবিত করতে সক্ষম নন?’

এরাজউদ্দীন শিউরে শিউরে উঠলেন। কী মহিমা আল্লাহর, হাজার বছর ধরে পঁচে:গলে হাওয়ায় মিশে যাওয়া মানুষ আবার আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে দাঁড়াবে!

পেছনে খুকখুক কাশির আওয়াজ পাওয়া গেলো। নকল কাশি। নামাজ কি বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে? এরাজউদ্দীন শেষ করলেন। সালাম ফিরিয়ে দেখলেন দরজার সামনে মোনাজাত মিয়া বসে আছে।

এরাজউদ্দীন বিরক্ত হলেন। মোনাজাত মিয়া নামাজের মাঝখানে এসেছে, অথচ নামাজটা পড়ে নাই। সে অপেক্ষা করছে ইরাজউদ্দীনের নামাজ শেষ হওয়ার জন্য।

: কী ব্যাপার মোনাজাত মিয়া?

: হুজুর, মাইকটা একটু ছাড়ন লাগে। জরুরী ঘোষণা আছে।

: কী সংবাদ? কেউ মারা গেছে?

: শুনেন নাই আপনে? মালুপাড়ার শ্যামলে তো ফেসবুকে ছবি দিছে। কাবা শরীফের উপ্রে কালীর মূর্তি!

এজাজউদ্দীন বিড়বিড় করে পড়লেন, ‘নাউজুবিল্লাহ মিন জালেক। তার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। ক্যান মানুষে এইসব করে? কী শান্তি পায়?’

তারপর বললেন: জঘন্য কাম। কিন্তু মাইক দিয়া কী হইবো?

: এইডা মানুষরে জানাইতে হইবো না? আইজকা এইডার একটা বিহিত হইবো। মুন্সীর চায়ের দোকানে মানুষজন জমছে। মাইকে একটা ডাক দিয়া সবাইরে নিয়া যাইতে হবে মালুপাড়ায়।

: ঐ ব্যাটা, মালুপাড়া আবার কী? নিখিলগঞ্জ না নাম?

: ঐত্তো আরকি। মালুরা থাকে যেই পাড়ায় হেইডারে মালু পাড়াই কয়। অখন মাইকটা চালু করেন।

: কামডা খুবই খারাপ হইছে। কিন্তু কিছুদিন আগে না ঐ গেরামেই মূর্তি ভাংছে দূর্গাপূজার সময়?

: হ ভাংছে তো। বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করছিলো ওরা ঢাকঢোল বাজাইয়া এইবার।

: তাইলে ঐডাও তো খুব খারাপ কাম হইছে। ঐসময় তোরা কই আছিলি?

: হুজুর, মাইনষে কিন্তু খুব তাতাইয়া আছে অখন। আপনে মাইকটা ছাড়বেন?

: না, এই কামে আমি মাইক ছাড়ুম না। আর অখন কারেন্ট নাই। দ্যাহোস না?

উত্তেজনায় এতোক্ষণ মোনাজাতের খেয়ালই ছিলো না যে কারেন্ট নেই। সে একবার মোমবাতির দিকে তাকিয়ে পিচিক করে থুতু ফেললো বারান্দায়। তারপর টর্চটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।

একটু পরে একাব্বর মিয়াও বেরিয়ে গেলে এরাজউদ্দীন মোমবাতি নিভিয়ে দিলেন। একটু পরেই খাবার আসবে। এই সময়টায় তার চিন্তা করতে ভালো লাগে। আজকে বৃষ্টি হচ্ছে খুব। টিনের চালায় ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। ইদানিং চুরিও হচ্ছে আশেপাশে খুব, এরাজউদ্দীন একটা লাঠি রেখেছেন মসজিদে। চোরের তো ঈমান নাই!

ঈমান কার আছে আসলে? ভেবেই অনুতপ্ত হলেন এরাজউদ্দীন। এই জিনিস বিচার করার দায়িত্ব আল্লাহপাক তাকে দেননি। আল্লাহপাক মানুষকে দায়িত্ব দিয়েছেন যেন নিজের ঈমান ঠিক রাখে, আরেকজনের ঈমান যেন তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। 

মোবাইলে ভাইব্রেশন হচ্ছে। এই জিনিসটাই এরাজউদ্দীনের শখের। টিপ বোতামের ফোন। মসজিদের মধ্যেই সবসময় থাকেন দেখে গঞ্জের দোকান থেকে এক্কেবারে সব ধরনের রিং বন্ধ করিয়ে এনেছেন। মেয়ে মেসেজ দিয়েছে। এরাজউদ্দীন চশমাটা লাগিয়ে বিড়বিড় করে পড়া শুরু করলেন, আব্বাজান সালাম নিবেন। আপনে এই সময়ে নামাজ কালামে ব্যস্ত থাকতে পারেন, তাই ফোন দেই নাই। রাত্রে ফোন দিবো। আব্বা, আপনের জামাই এইবার হজ্জ্বে যাবে চিন্তা করছে। তার খুব শখ, তার আব্বা-আম্মা আর শ্বশুরকে নিয়ে হজ্জ্বে যাবে। আপনে যাবেন আব্বা? আপনে বিদেশ বাড়িতে একা একা থাকেন, আমার খুব চিন্তা লাগে। আপনে সারাজীবনই তো বাইরে বাইরে থাকলেন, ইমামতি করলেন। এইবার সব বাদ দিয়ে আমার এইখানে থাকবেন।

মেয়ে একেবারে চিঠিই লিখে ফেলেছে। এই মেয়ে কম কিছু বলতে পারে না, লিখতেও পারে না। আরও কী কী লিখেছে, এরাজউদ্দীনের চোখে পানি এসে যাওয়ায় আর পড়া সম্ভব হলো না। আগে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করতে হবে।

মোনাজাতে অনেকক্ষণ কাঁদলেন, পাক-পরদেগওয়ার, তুমি চাইলে কী না সম্ভব! আল্লাহর ঘর দেখার প্রার্থনা মঞ্জুর করছো তুমি, ক্যামনে শুকরিয়া জানাই তোমারে?

খাবার নিয়ে এসেছে এক তালেবুল এলেম। মাদ্রাসার ছাত্র। একেক সপ্তাহ একেক বাড়ি থেকে খাবার আসে তার জন্য। এই সপ্তাহের যার বাড়ি থেকে আসছে, দরিদ্র কৃষক। খাবার অবস্থাও সুবিধার থাকে না। আজকে বৃষ্টি দেখে একেবারে পুঁটলি বেঁধে দেয়া হয়েছে। এরাজউদ্দীন মোমবাতি জ্বালালেন। পাটশাকের ভাজি, ডাল আর ভাত। একটু কি মন খারাপ হলো? এমন সুখবরের দিনে একটু গরুর গোশত হলে মন্দ হতো না। বা আমেনার মা বেঁচে থাকলে হয়তো খিচুড়ি করতে বলতেন।

এসব কী ভাবছেন তিনি? এরাজউদ্দীন নিজেকে সামলালেন। মহানবী (সা) সবসময় যে পেয়েছেন তাই খেয়ে শুকুর করেছেন। তারও সেটাই করা উচিৎ। তালেবুল এলেমকে নিয়ে তিনি হাত তুললেন, ‘হে আল্লাহ, যারা কষ্ট করে এই খাবার পাঠিয়েছে তুমি তাদের নেয়ামত দান করো।'

একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমার ভুল হয়েছে। খাবার পেয়ে দোয়া করলে বদলাবদলি মনে হয়। আল্লাহ, তুমি সবাইকেই তোমার নেয়ামত দান করো।‘

পাটশাক মাখিয়ে এরাজউদ্দীন ভাত মুখে দিলেন। আঙ্গুলের ডগায় একটু নুনের ছোঁয়া দিলেন। কাঁচামরিচে দিলেন একটা কামড়। অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ!’

দূরে কীসের যেন ডাক শোনা যাচ্ছে। এতো মানুষের হল্লা কীসের? এরাজউদ্দীন কান পাতলেন। এ তো তার সারাজীবনের চেনা ডাক, ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার!’ কিন্তু এই ডাক এতো অন্যরকম লাগছে কেন?

বৃষ্টি এর মাঝেই থেমে গেছে কখন যেন। হল্লাটাকে দেখা যাচ্ছে। বড় রাস্তার উপরে। জনা চল্লিশেক হবে। অন্ধকারে অনেকের হাতেই মশাল। মশালের আলোতে দা-শাবলও দেখা যাচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা আলোয় মিছিলটা দেখতেই ভীতিকর লাগছে!

এইবার এরাজউদ্দীন বুঝতে পারলেন, এই তাকবীর তিনি কেন চেনেন না। এই তাকবীর কোন মানুষ দিচ্ছে না। অমানুষরা দিচ্ছে। কী হবে আজকে? আগের মতো প্রতিমা ভাংচুর? নাকি আরও খারাপ কিছু? বাড়িতে আগুন? লুটপাট? মানুষ খুন?

এরাজউদ্দীন খাওয়া থুয়েই উঠে দাঁড়ালেন। খাবার তদারকি করা দাঁড়ানো ছেলেটা জজ্ঞেস করলো, ‘হুজুর কই যান?’

এরাজউদ্দীন জবাব দিলেন না। থমথমে লাঠিটা হাতে নিলেন। কী করবেন তিনি? এতোগুলা লোককে বাঁধা দিয়ে পারবেন? বা তিনিই তো মারা পড়তে পারেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার বেলায় যাদের দেখা নাই, ঈমানী জোশের প্রশ্ন উঠলে এদেরই দেখা যায় সবার সামনে। ইরাজউদ্দীনের মনে আবার প্রশ্ন আসলো, ‘খোদা, ঈমান আসলে কার আছে?’

মরে গেলে কী হবে? মেয়েটাই তো আছে আপনজন। আর তো কষ্ট পাওয়ার মতো কেউ নাই! হজ্জ্বে যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিলো। অসুবিধা নাই। মরে গেলে খোদার কাছে বলা যাবে, ’পরওয়ারদেগার, হিন্দু হোক, মুসলিম হোক আপনার সৃষ্টিরে বাঁচাইতে গিয়েই প্রাণ দিছি।‘

মাওলানা মোহাম্মদ ইরাজউদ্দীন লাঠিটা শক্ত করে ধরলেন। তারপর অন্ধকারে ছুটে গেলেন। বুক থেকে প্রবল গর্জনে বেরিয়ে আসলো, ‘আল্লাহু আকবার!! আল্লাহু আকবার!!’

৪৮২ পঠিত ... ১০:৫৩, মে ০২, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top