চোখ বন্ধ করলেই যে লোকটা ফ্যান্টাসির জগতে চলে যায়

১৮৯ পঠিত ... ১৮:১৪, জুন ২৫, ২০২০

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার 

একটা লোকরে আমি চিনি যে সারাক্ষণ ফ্যান্টাসির মধ্যে থাকে। মানে, এই লোক এমনকি রাস্তায় চোখ বন্ধ কইরা হাটে। একদিন আমি তার গাড়ির যাত্রী সিটে বইসা আছি। বামে তাকায়ে দেখি স্টিয়ারিং হুইলে তার দুই হাত আর চোখজোড়া বন্ধ। সত্যি বলতেছি, ঠিক এইভাবেই মেইনরোডে সে গাড়ি চালাইতেছিলো। 

'হাগাই', আমি বলি, 'এইটা কিন্তু ভালো আইডিয়া না। হাগাই, চোখ খুলো।' অথচ সবকিছু অত্যন্ত স্বাভাবিক- এমন ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ রাইখাই সে গাড়ি চালাইতে থাকলো।  

'আমি এখন কোথায় জানো?' সে আমারে বললো। 

'চোখ খুলো', আমি আবার বলি, 'প্লিজ, ভয়ে আমার শরীর কাঁপতেছে।' অলৌকিক ব্যাপার হইলো, রাস্তায় একটা গাড়ির সাথে সংঘর্ষ হইতে হইতেও হইলো না।  

অন্যের বাড়ি নিয়া লোকটার ফ্যান্টাসি ছিল যে ওই বাড়িঘর তার। ফ্যান্টাসি ছিল লোকেদের গাড়ি নিয়া, তাদের চাকরি নিয়া, তা সে চাকরি যেমনই হোক। লোকের স্ত্রীদের নিয়াও তার ফ্যান্টাসি ছিলো। সে কল্পনা করতো ওই নারীরা তার ওয়াইফ। এবং শিশুদের নিয়াও। পার্কে বা রাস্তায় দেখা শিশুদের কিংবা টিভিতে ধারাবাহিকের কোনো শিশুচরিত্রকে সে নিজের সন্তান ভাবতো। ঘন্টার পর ঘন্টা সে এই ধরনের কল্পনায় ডুবে থাকতো। 

'হাগাই' আমি তাকে বলি, 'হাগাই, তুমি জাগো। নিজের জীবনে ফিরে আসো। চমৎকার একটা জীবন তোমার আছে৷ দারুণ স্ত্রী। প্রাণচঞ্চল শিশু। জেগে ওঠো।'

'থামো তো' কিছুটা বিরক্ত হয়ে সে বলে। 'পিনিকটা নষ্ট  কইরো না। আমি এখন কার সাথে আছি,  জানো? ইয়োতাম রাতসাবি, আমার পুরানা আর্মি বন্ধু। ইয়োতাম রাতসাবির সাথে জিপ গাড়িতে কইরা একটা ট্যুরে যাইতেছি আমরা। খালি আমি, ইয়োতি আর ছোট্ট এভিয়াতার মেন্ডেলসন। সে ছিলো 'অমিত'স' কিন্ডারগার্টেনের সবচাইতে মেধাবী ছাত্র। আর এভিয়াতার, ছোট্ট বিচ্ছুটা আমারে বলতেছে, 'আব্বু, আমার তৃষ্ণা লাগছে। একটা বিয়ার খাই?' ভাবতে পারো! ছেলেটার বয়স এখনও সাত হয় নাই আর সে বিয়ার চায়। আমি বলি, কোনো বিয়ার না, এভি। তুমি জানো, আম্মু বলেছে এইটা খাওয়া নিষেধ।' ওর আম্মু মানে আমার এক্স৷ আমাদের স্কুলের রোনা ইয়েদিদিয়া। মডেলের মতো সুন্দরী কিন্তু লৌহকঠিন তার মেজাজ৷ 

'হাগাই'  আমি বলি, 'ও তোমার ছেলে না আর সেও তোমার ওয়াইফ না। তোমার ডিভোর্স হয় নাই, ভাই। তোমার বিয়ে সুখের। চোখ খোলো, হাগাই। জাগো।' 

`যখন ছেলেটাকে আমি বাসায় তার কাছে নিয়া আসি আমার জিনিসটা খাড়ায়ে যায়' সে এমনভাবে বলে যে আমার কথা সে শুনতেছেই না।' একদম জাহাজের মাস্তুলের মতো খাড়ায়ে যায়। সে সুন্দরী, আমার এক্স, সুন্দরী কিন্তু কঠিন। আর ওই কঠিনতা দেখেই আমার খাড়ায়ে যায়।' 

'সে তোমার এক্স না।' আমি বলি, ‘তোমার কিছু খাড়ায় নাই।’ আমি জানি কী নিয়া কথা বলতেছি। আমার থিকা এক মিটার দূরে বসা সে। কিছুই খাড়ায় নাই। 

'আমাদের আলাদা হয়ে যাইতে হইছে' সে বলে, 'তার সাথে থাকাটা সহ্য করতে পারতাম না। সেও আমারে সহ্য করতে পারতো না।'

'হাগাই,' আমি অনুনয়ের সুরে বলি, 'তোমার ওয়াইফের নাম কার্নি। হ্যাঁ সে সুন্দরী। কিন্তু সে কঠিন মেজাজের না। অন্তত তোমার সাথে না।'

হাগাইয়ের ওয়াইফ আসলেই নরম স্বভাবের। পাখির মতো আত্মা তার, উদার হৃদয়; সবার জন্যেই তার মমতা। আমরা নয়মাস ধরে একসাথে আছি। হাগাই স্কুল শুরু করে খুব ভোরে, আমি তাই আটটা ত্রিশে তারে দেখতে যাই। সে তার বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আসার পরপরই।

'রোনা আর আমার পরিচয় স্কুলে।' হাগাই বলতে থাকে।' সে ছিলো আমার প্রথম পছন্দ, আমিও তার। ডিভোর্সের পরে অনেক নারীর সাথে আমি সেক্স করছি। অথচ একজনও রোনার ধারেকাছেও না। আর তুমি জানো, দূর থেকে অন্তত, মনে হয় সে এখনও একাকী। আমি যদি দেখতাম সে কোনো ব্যাটার সাথে আছে, মন ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাইতো, যদিও আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। টুকরা টুকরা হয়ে যাইতো। আমি সহ্য করতে পারতাম না। অন্য কোনো নারী আমার কাছে কিছু না। শুধু সে।  হৃদয়ের গভীরে যার জন্যে সবসময়ই বিশেষ জায়গা বরাদ্দ থাকে।' 

'হাগাই,' আমি বলি, 'তার নাম কার্নি। সে অন্য কারও সাথে নাই। তুমি এখনও বিবাহিত।' 

'রোনার সাথেও কেউ নাই।' সে বলে আর জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোট চাটে, 'কেউ না। কেউ থাকলে তারে আমি নিজে খুন করতাম।' 

কার্নি ফ্লাটে আসে। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। আমার দিকে তাকায়ে এক্কটা সাদামাটা 'হাই' ছুড়ে দেয়। যেহেতু আমরা একসময় একসাথে থাকতাম, অন্য লোকের সামনে সে একটু দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। সে হাগাইরে হাই পর্যন্ত বলে না; সে ভালো কইরাই জানে হাগাইয়ের চোখ যখন বন্ধ, তার সাথে কথা বলার কোন মানে হয় না৷ 

'আমার বাড়ি', হাগাই বলে, 'তেল আবিবের একদম প্রাণকেন্দ্রে। সুন্দর। জানলার ঠিক পাশে একটা মালবেরি গাছ। কিন্তু গাছটা ছোট,  খুবই ছোট। আমার আরেকটা রুম দরকার। ছুটির দিনে, বাচ্চারা থাকে বলে, আমারে সোফা-বেড থিকা উঠতে হবে৷ মেজাজ খারাপ করা একটা কাজ। গ্রীষ্মের আগে এর যদি কোনো সমাধান না হয় আমি অবশ্যই একটা কিছু কইরা বসবো।'

[এটগার কেরেট: ইসরায়েলী লেখক। চমকপ্রদ, উদ্ভট, ম্যাজিক্যাল,,সুক্ষ্মরস ও গভীর জীবনবোধের গল্প লেখক হিসবে বিখ্যাত]

১৮৯ পঠিত ... ১৮:১৪, জুন ২৫, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top