তসলিমার আয়নায় সমাজ

২৪৯৪ পঠিত ... ১৭:০৭, মে ২৬, ২০২২

Taslima-nasrin

তসলিমা নাসরিন সমাজের আয়না। আয়নার যেমন কোন লুকোছাপা নেই; তসলিমা নাসরিনেরও তাই।

আমরা সতত আয়নাকে ভয় পাই; নিজেকে নিয়ে নিজের সমাজকে নিয়ে যে ইলিউশান আমাদের মনের মধ্যে রয়েছে; তসলিমা তা ভেঙে দেন। আমরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি।

প্রথম উনি আমাদের ধর্মচিলদের হিপোক্রেসি নিয়ে লিখেন; আয়না মেলে ধরলে মোল্লারা তাকে ক্ষিপ্ত হয়ে দেশ থেকে বের করে দেয়। মোল্লা যে অশিক্ষিত, বর্বর, লালসার লালামাখা, জাঢ্য-জরদগব অনুভূতি ব্যবসায়ী; এই কথাটা তসলিমাই খুব স্পষ্ট করে বলেছেন। ফলে ভারতেও মোল্লারা তাকে হামলা করেছে।

তসলিমা নাসরিন আমাদের শিল্প-সাহিত্য জগতের আয়না। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের যে লোকগুলো নক্সী পাঞ্জাবি পরে পোগোতিচিল সেজে ঘুরে; তারুণ্যের আইকন হয়ে অটোগ্রাফ দেয়; তসলিমা হ্যাঁচকা টানে খুলে দিয়েছেন তাদের মুখোশ। একইসঙ্গে ধর্মচিল ও পোগোতিচিলের কুরুচি, আত্মম্ভরিতা, ভণ্ডামী, অসারতা, অপ্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতাহীনতা উন্মোচিত হয়েছে তসলিমা নাসরিন নামের সামাজিক সিসিটিভিতে।

তসলিমা আসলে একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। তিনি স্টিং অপারেশান করেও সমাজের বিভিন্ন অযোগ্য অভুক্ত অশালীন অতৃপ্ত আত্মার এক্সরে রিপোর্ট হাজির করেন আমাদের সামনে।

উনি যে সময়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন; সে সময়ে দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ওখানে পড়তো। বিজ্ঞানের ছাত্রীর সত্যানুসন্ধানের শক্তি অন্য যে কোন বিষয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে বেশি হবার কথা; যদি সমাজ বিজ্ঞানটা তার পড়া থাকে। তসলিমা সমাজবিজ্ঞানকে আত্মস্থ করেছেন বলেই, সমাজকে এতো অপ্রস্তুত অবস্থায়, অনৈতিক অবস্থায় হাতে-নাতে ধরতে পেরেছেন তিনি।

এবার তিনি খুব সম্ভব সেলফি সমাজের ইলিউশান ভেঙে দিচ্ছেন। এই যে আমরা যারা বিউটি এপ ব্যবহার করে নিজেকে কিউপিড কিংবা সাইকির মতো সুন্দর করে ফেসবুকে তুলে ধরি; সহমত ভাইয়েরা এসে কল্পনার বেলুনে হাওয়া দেয়; মনে মনে একজন জর্জ ক্লুনি কিংবা অড্রে হেপবার্ন হয়ে উঠি; এই যে ম্যাগালোম্যানিয়ার মড়ক; তসলিমা সেখানে বন্ধুর মতো করে বললেন, তোমার ‘বপু বেড়েছে; আঁটোসাটো পার্টি শার্টে কুচ্ছিত’ দেখাচ্ছে। এমন বন্ধুর মতো কাজ কেবল করতে পারেন, স্ট্রেইটকার্ট তসলিমা আপা। 

প্রত্যেক পরিবারেই কিন্তু এমন ঠোঁট কাটা মানুষ থাকে; যে পরিবারের আয়না হয়ে ওঠে। এমন মানুষ ছিলেন, হুমায়ূন আজাদ; হিংস্র সমাজ তাকে তিলে তিলে হত্যার চেষ্টা করেছে। তসলিমা নাসরিনকে দেশ থেকে বের করে দিয়ে ক্ষান্ত নয় এ মিথ্যাবাদী রাখালের সমাজ; এখন ফেসবুক স্টেটাস নিয়ে ধর্ম মোল্লা ও পোগোতিমোল্লার একই হিংস্র সুরে কথা বলতে দেখে; বুঝতে পারি এরা কতটা আইডেন্টিক্যাল টুইন।

কেউ কেউ হুমায়ূন আজাদকে কপি করে করে ক্লান্ত হয়; কেউ কেউ তসলিমাকে। আসলে সব কথা সবার মুখে মানায় না; সব পোশাকও।

তসলিমা নাসরিন সম্প্রতি পোশাকে নন্দনতত্ব নিয়ে একটি বিশ্লেষণ হাজির করেছেন।

এই বিষয়টা ফিল্ম ও ফ্যাশান জগতের পাঠ্য। কীরকম ফিগারের মানুষকে কোন আউটফিটে মানাবে; এটা জানে বলেই হলিউড গ্ল্যামারের জগতের সেরা ইলিউশান তৈরি করতে পারে।

একটা পোশাক কেইট উইন্সলেটকে মানিয়েছে বলেই কুররাতুল আইন আপাকে মানাবে এমন কথা নেই। প্রতিটি এলাকার পোষাক ঐ এলাকার ভূ-বৈশিষ্ট্য ও শারীর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ঠাণ্ডার দেশের লোক স্যুট-টাই পরেন বলেই গরমের দেশে যোগেশ পালকে ওটা পরে এসিতে বসে ঘামতে হবে; এমন পরাবাস্তব দিব্যি কেউ দেয়নি।

সৌদি আরবের প্রখর রৌদ্র আর দাবদাহ থেকে বাঁচতে যে আলখাল্লা ও হিজাব প্রচলিত আছে; সেইটা দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমী জলবায়ু এলাকায় আব্দুল ও জরিনা পরলে, বেমানান তো লাগবেই।

দক্ষিণ এশিয়ার ফ্যাশানেবল পোষাক হচ্ছে গান্ধীজীর কস্টিউম আর জিনাত আমানের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ মুভির কস্টিউম। কিন্তু সেটা একহারা ফিগারের লোকের জন্য। শো বিজের কস্টিউম তাই বাস্তব জীবনের পোশাক হওয়া খুব কঠিন।

 আমি নিজেই এতো অক্সিডেন্টাল আউটফিট পরে বড় হলাম; কিন্তু প্রাক বৃদ্ধকালে ডিএনএ-র প্রভাবে পৃথুল হয়ে যাওয়ায়; এখন বুঝতে পারি, কেন আমার দাদা ঢিলে ঢালা ফতোয়া পরতেন।

আমি কিন্তু তড়াক করে ক্ষেপে গিয়ে বলছি না, তসলিমা আপা বডি শেমিং করেছেন। বডি শেমিং, মিসোজিনিস্ট শব্দগুলো নতুন শিখেছি বলেই যত্রযত্র ব্যবহার করবো তা তো নয়। আমি তো বরং কৃতজ্ঞ তসলিমা আপা আমাকে সচেতন করে দেয়ার জন্য।

আমাদের সমাজ ডিনাইয়ালের রোগী, এক্সেপ্টেন্স ও একচুয়ালাইজেশানের ক্ষমতা প্রায় জিরো। এইজন্য আমরা পট করে রেগে উঠি। অথবা অশিক্ষিতদের শেষ আশ্রয় হচ্ছে সত্যান্বেষীকে নিয়ে হাসাহাসি।

চিত্রনায়িকা শাবানা জানতেন, তার হাতগুলো স্লিভলেস পোশাক পরার উপযুক্ত নয়; তাই লম্বা হাতার ব্লাউজ পরতেন। অনিন্দ্য সুন্দরী এই নায়িকা বেশী বয়েসে এসে একটু পর্দা করলে; দুইদিনের পোগোতিচিল এসে তাকে আধুনিকতার জ্ঞান দেয়। শাবানাকে আধুনিকতা শিক্ষা দেয়ার মতো মেয়ে দক্ষিণ এশিয়াতেই জন্মায়নি। টপ হিরোইনের পক্ষে বার্ধক্যবরণ ট্রমার ব্যাপার। সুচিত্রা সেন যে কারণে অবরোধবাসিনী ছিলেন। শাবানা সেটা না করে; চলন্ত অবরোধের পোশাক বেছে নিয়েছেন। এটা তার ফ্রিডম অফ চয়েস।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিবেশটা বন্ধুত্বের ও বিতর্কের হওয়া দরকার। সবাই তো কলতলার কালচারে অভ্যস্ত নয়। আমরা সারাজীবন পাবলিক প্লেসে আড্ডা দেয়া লোক; তিক্ততা ছাড়া আমরা বিতর্ক ও বন্ধুত্ব করতে জানি।

কিন্তু প্রতিদিন কাকের মাংস খেয়ে ফেসবুকে ঝগড়া করতে আসেন কিছু লোক। রাইসু কোন বাঁকা কথা বললে তাকে গালি, তসলিমা কোন সত্য উন্মোচন করলে তাকে গালি। আগে যে ছেলেরা কলেজ ইউনির টয়লেটের দেয়ালে খিস্তি লিখতো; এখন তারা ফেসবুকে ওসব লেখে। জীবন তাদের চলমান এক বাইতুল খিলাহ।

জাজমেন্টাল না হলে আর গালাগাল না করলে; জীবনে সুখী হওয়া যায়। আপনি একটা কথা কইয়া দিলেই তো তা গুরুত্ব পাবে না। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে রাইসু-তসলিমা ফুল টাইমার। এইখানে তাদের তিন দশকের শেকড় আছে। আপনি এই ফেসবুকে এসে লেট ইয়ুথে শিল্প-সাহিত্যের টবের বনসাই; রাইসু কিংবা তসলিমাকে পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে ব্যবহার হয়ে কিলবিদ হিসেবে খ্যাতিমান হবেন; এই ধারণা ভুল। আপনার গালাগাল পোস্টের নীচে কতগুলো অসুখী মানুষ এসে কলতলার কাসুন্দি করলে; তাতে আপনি সেলিব্রেটি হয়ে যান না; আপনি আপনার মনের কলতলাই যে আসল কলতলা তার এক্সরে রিপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন আসলে।

জুকারবার্গ খুড়োর কল আসলে সমাজমনস্তত্ব রেকর্ড করার কল।

ধরা যাক দু-একটি ইঁদুর এবার।

২৪৯৪ পঠিত ... ১৭:০৭, মে ২৬, ২০২২

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top