রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও লুডু খেলতে আসেননি

৩৬৯ পঠিত ... ১৭:৪৭, নভেম্বর ০৮, ২০২১

 

Rabindranath-ludo

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ১৯৩৬ সালে ডি লিট উপাধি প্রদান করলেও সেবার তিনি আসেননি। ১৯২৬ সালে, মোটের ওপর একবারই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় কর্মসূচিতে থাকার পরও জগন্নাথ হলে সশরীরে আসা হয়নি রবীন্দ্রনাথের। তবে জগন্নাথ হলের বার্ষিকী বাসন্তিকার জন্য তাঁর ‘এই কথাটি মনে রেখো’ (পরে গান হিসেবে যা জনপ্রিয় হয়) কবিতাটি লিখে দেন।

সুতরাং, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ জগন্নাথ হলে কখনও লুডু খেলতে আসেননি। ঘটনা সেটা না, ঘটনা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে হুটহাট যেমন মিডটার্মের তারিখ ঘোষণার রেকর্ড আছে, তেমনি হুটহাট পরীক্ষা বাতিল হওয়ারও রেকর্ড আছে। মিডের আগের রাতে সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছাত্রটিও পড়তে বসে। বসে না বলে বাধ্য হয়ে বসতে হয় বললে আরও সুন্দর শোনায়। আমাদের তো আর স্কুল ফাঁকি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ হওয়ার সুযোগ নাই! 

পরীক্ষার আগের দিন রিডিংরুমে 'কোপায়ে' পড়াশোনার মাঝে হুট করে মিড স্থগিতের ঘোষণা এলে মাথা খালি খালি লাগে। কী করব বুঝে উঠতে পারি না। আমরা তো আর রবীন্দ্রনাথ না যে পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, এই উপলক্ষে দাড়িতে শান দিতে দিতে খাতা কলম নিয়ে কবিতা লিখতে বসব। পরে সে কবিতা গান হিসেবে জনপ্রিয় হবে। আমরা গরীব মানুষ। হাতের লেখা খারাপ। তাই, ওরকম এক ‘না বুঝে ওঠার’ রাতে বন্ধুরা মিলে লুডু খেলতে বসলাম। মোবাইলে না। আসল লুডুতে। বলে রাখা ভালো, আমরা চারজন চার এলাকার। প্রাসঙ্গিক কারণে এলাকার নাম গোপন রাখা হলো!

শুরু হলো খেলা। আইল আজি প্রাণসখা, দেখো রে নিখিলজন। ভেন্যু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। রুম নাম্বার ৬০২৬। ভুবন রথিনের একটা গুটি খেয়ে ফেলল। সমস্যার শুরু সেখানে এবং খেলা শেষও সেখানেই! ভাববেন না রথিন ছোটবেলার মতো বলল, তুই আমার গুটি কাটলি কেন? তুই তো ওই গুটিটা চালতে পারতি। ওইটা তোর পাকা গুটি। সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। ভুবন গুটি কাটার বোনাস চাল দিতে যাবে এমন সময় রথিন বলল, কিরে, তুই আবার চালিস কেন?

ভুবন অবাক হয়ে বলল, কেন? তোর একটা গুটি কাটলাম না? সেটার বোনাস চাল।

রথিন তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, দূর হালা! তোদের এলাকায় এই নিয়মে খেলে? তোরা তো মানুষ ভালো না! একটা গুটি কাটলি। শোকের ব্যাপার। শোককে তোমরা বোনাস চাল দিয়ে সেলিব্রেট কর। তোমরা তো শালা মানুষ ভালো না!

ভুবনকে এবার পায় কে! আরেহ শালা, শোক তোর। আমি যে গুটি কেটে একটা কৃতিত্ব দেখাইলাম, তার কোনো স্বীকৃতি নাই? স্বীকৃতি হইলো বোনাস চাল।

রথিন খাঁটি সরিষার তেল আর গোল গোল বেগুনে জ্বলে উঠল। ভুবন, তোরা তো শালা আসলেই মানুষ ভালো না। প্রতিপক্ষ দলে আছি বলেই কি আমি শত্রু হয়ে গেলাম? এই চর্চা চলে তোমাদের এলাকায়? আমার শোক মানে তোর শোক না? প্রতিপক্ষ দলে আছি বলে কি যেকোনো উপায়ে আমাকে নির্মূল করে দিবি? তোরা শালা চরম খারাপ মানুষ।

ভুবন এবার রথিনকে মানুষ থেকে গরুর পর্যায়ে নামিয়ে বলল, আরেহ বলদ, তোর শোক যদি আমার শোক হয়, তাহলে আমার সেলিব্রেশন তোর সেলিব্রেশন না? গাঁজা খেয়ে খেলতে বসছ?

আমি দেখলাম, অবস্থা সুবিধার না। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সমাধান হবে না জানি। তবু হালকা একটা বিবৃতি মেরে দেই। আচ্ছা শোন। এই খেলা বাদ। আবার নতুন করে খেলা শুরু হোক। তার আগে যে যার এলাকার নিয়মগুলো বলি। তারপর একটা সার্বজনীন নিয়ম বানিয়ে খেলা চলবে। এখন দয়া করে স্ব স্ব এলাকার লুডু খেলার নিয়মকানুন বলুন প্লিজ!  

এতক্ষণ রিপন চুপ ছিল। গোপাল ভাড়ের মতো ভুঁড়িটা দুলিয়ে সে বলল, আমাদের এলাকায় কিন্তু লুডুতে আটটা স্টপেজ। এই চারটা। আর এই যে ঘরে ঢোকার তীর চিহ্ন দেওয়া মানে ছক্কা তিন পড়লে যে ঘরে গুটি বসে আরকি, ওইটাও স্টপেজ। ওখানেও গুটি কাটা যাবে না।

এবার ভুবনের গলায় তাচ্ছিল্যের সুর। কিরে তোরা এত ভীতুর ডিম কেন? চারটা স্টপেজ থাকলে কি তোদের ঘরের চাবি কে ভেঙে নিয়ে যায়? অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের মানুষ পর্যন্ত জানে লুডুতে স্টপেজ চারটা। এই ফইন্নি কয় আটটা।  

রিপন আবার ভুঁড়ি দুলিয়ে বলে উঠল, আর তোমার এলাকায় যে ঘরে থাকা পাকা গুটিও কাটা যায়, সে কথা কে বলবে শুনি।

রিপনকে শেষ না করতে দিয়ে রথিন শুরু করল। কিরে ভুবইন্যা, তোরা তো শালা ডাকাতরে। গুটিটা দশ মাস দশ দিন চাল দিয়ে কত কষ্ট করে ঘরে ঢুকাব, সেটাও কেটে ফেলবি? তোরা তো শালা ডাকাতের গুষ্টি। তোদের এলাকার মানুষের ঘরে কি দরজা-জানালা আছে, নাকি নিরাপত্তার স্বার্থে সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকোস, সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হস?  

ভুবন নিজ এলাকার ব্র্যান্ডিং করতে নেমে গেল। হ, তোমরা তো খালি এগুলাই দেখবা। আমাদের এলাকায় যে গুটি পাকাইলেও বোনাস চাল আছে, সেই গর্বে কে বুক ফুলাইবে শুনি। গর্ব করে নিই নে ও নাম, জানে অন্তর্যামী।   

বুক না ফুলালেও ভুঁড়ি দুলিয়ে রিপন বলে উঠল, কিরে ভুবইন্যা, তোরা কারা রে? খালি বোনাস আর বোনাস। তোদের এলাকার মানুষকে চাকরি দিলে তো বিরাট ক্যাচাল হবে রে। প্রতি মাসে মাসে বেতনের সাথে বোনাস খুঁজবি। তোরা শালা বোনাস ছাড়া কিছু বুঝিস না দেখতেছি। তোমরা শালা মানুষ না বোনাস?  

ঝামেলা বাঁধল যৌথ গুটি চালানো নিয়েও। রথিন বলল, টিমে খেললেও একজন তার সব গুটি না পাকানো পর্যন্ত তার টিমের অন্য সদস্যের গুটি চালতে পারবে না। যার গুটি সে চালবে। একজনের চাল অন্যজন দিতে পারবে না। যেমন, আমি আর সঞ্জয় এক টিমে। সঞ্জয় ওর সব গুটি পাকানোর পর আমার গুটি চালতে পারবে। এর আগে না।

ভুবন যেন এই সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ওরে শালা, এতক্ষণ বয়ান দিলা এই কারণে? এই ছিল তোমার মনে? একজনের গুটি আরেকজন চালতে পারবে না, তাহলে আর টিমের অর্থ কী থাকল। এই কারণে তোমার এলাকার গরীবী হাল। তোমরা তো শালা এখনো টিমওয়ার্ক বোঝ না। আবার আমারে কয় মানুষ ভালো না! তোরে পানি ছাড়া কাঁচা গিলে ফেলতে ইচ্ছা করছে।

কাঁচা গিলে ফেলার কথায় মনে পড়ল এখনও রাতের খাওয়া হয়নি। সময় এখন রাত দুইটা। খেলা নিয়মের বেড়াজালে আটকে আছে। চার ঘণ্টা হয়ে গেল, তবু খেলা শুরু করা যাচ্ছে না। এদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। ভুবন নাকি রথিনকে কাঁচা গিলে ফেলবে! আমি লুডুটা নিয়ে সুন্দর করে সমান চারভাগে ছিঁড়ে ফেললাম।  তিনজনই সমস্বরে বলে উঠল, এটা কী হলো?

আমি লুডুর এক অংশ রিপনকে দিতে দিতে বললাম, কিছু না ভাই। আমাদের এলাকা খুব গরীব তো। একটা লুডু কিনে এরকম চার ভাগ করে ছিঁড়ে চারজনে খেলে!

বি.দ্র. ১ : ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ জগন্নাথ হলে লুডু খেলতে আসেননি। এলে কয়টায় খেলতে বসেছিলেন, খেলা কয়টায় শেষ হয়েছিল, খেলার সঙ্গী কে ছিলেন, লুডুর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কত ছিল, খেলায় প্রথম ছক্কা কে তুলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের গুটি মোট কয়বার কাটা হয়েছিল, তিনি কয়টা গুটি কেটেছিলেন-এসব মুখস্থ করতে করতে ছেলেপেলে পাগল হয়ে যেত! আর রবিবাবু সেই খেলায় মুগ্ধ হয়ে যদি একখানা গান বা কবিতা লিখতেন, তাহলে তো আরও কম্মসারা!

বি.দ্র. ২ : আমাদের খেলায় ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার কেউ ছিল না। থাকলে কী হতো ভেবে শিহরিত হন!

৩৬৯ পঠিত ... ১৭:৪৭, নভেম্বর ০৮, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top